শওকত জঙ্গ


শওকত জঙ্গ  নবাব আলীবর্দী খানের অধীনে পুর্নিয়ার নায়েব নাযিম এবং মুর্শিদাবাদ নিযামত লাভে সিরাজউদ্দৌলার প্রতিদ্বন্দ্বী।  আলীবর্দী খানের ভ্রাতুষ্পুত্র ও পুর্নিয়ার নায়েব নাযিম সৈয়দ আহমদ খান সওলত জং এর মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র শওকত জঙ্গ ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দের ২৭ মার্চ পুর্নিয়ার নায়েব নাযিম নিযুক্ত হন। আলীবর্দীর মৃত্যুর প্রাক্কালে সেনাপতি মীরজাফর আলী খান ও ঘসেটি বেগমসহ সিরাজউদ্দৌলার বিরোধীরা গোপনে সুবাহ বাংলার নিযামতে শওকত জঙ্গের দাবির প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেন। আলীবর্দীর মৃত্যুর (১০ এপ্রিল ১৭৫৬) পর মুর্শিদাবাদ নিযামতে সিরাজউদ্দৌলার অধিষ্ঠানের অব্যবহিত পরেই শওকত জঙ্গ মীরজাফরের নিকট থেকে একটি গোপন পত্র পান। ওই পত্রে তিনি শওকত জঙ্গকে বাংলা আক্রমণের অনুরোধ করেন এবং এই অভিযানে মুর্শিদাবাদের কতিপয় সেনাপতিসহ তাঁর নিজের সমর্থন দানের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। কিন্তু পুর্নিয়ার নবাব তাঁর বল্গাহীন উচ্চাভিলাষে দিল্লির সম্রাটের দরবারে ষড়যন্ত্র শুরু করেন তিনটি পূর্বাঞ্চলীয় সুবাহর নিযামত মঞ্জুর করে ফরমান লাভের জন্য।

এই ষড়যন্ত্রের সংবাদ পেয়ে সিরাজউদ্দৌলা পুর্নিয়া জয়ের জন্য ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে এক অভিযান পরিচালনা করেন। পথে রাজমহলে পৌঁছে তিনি শওকত জঙ্গের নিকট থেকে আনুগত্যের বার্তা লাভ করেন। তখন তিনি শওকত জং এর বিরুদ্ধে প্রেরিত সেনাবাহিনী ফিরিয়ে আনেন। অবশ্য বাহিনী ফিরিয়ে আনার পেছনে তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল কলকাতায় ইংরেজ বেনিয়াদের বিদ্রোহের মোকাবেলা করা যাতে করে বাইরে অভিযানকালে তাঁর পশ্চাৎভাগ নিরাপদ থাকে। কলকাতা বিজয়ের পর নবাব ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর মাসে পুর্নিয়া অভিমুখে সসৈন্যে অগ্রসর হন।

ইত্যবসরে শওকত জঙ্গ দিল্লির সম্রাট দ্বিতীয় আলমগীরের নিকট থেকে বাংলা বিহার ও উড়িষ্যার নিযামতের ফরমান লাভ করেন। সম্রাটের উজির গাজিউদ্দিন ইমাদুল-মুলককে এক কোটি টাকা প্রদানের বিনিময়ে তিনি এ ফরমান সংগ্রহ করেছিলেন। এ সময় শওকত জঙ্গ আলম পানাহ (দুনিয়ার রক্ষাকর্তা) উপাধি ধারণ করেন। অজ্ঞতাসূলভ নিছক অহঙ্কার, নিয়ন্ত্রণহীন প্রবৃত্তি এবং বাক্যালাপে সংযমের অভাব ছিল শওকত জঙ্গের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। অচিরেই তিনি তাঁর পরিবারের শুভানুধ্যায়ীদের অপমান করে দরবার থেকে তাড়িয়ে দেন। শওকত জঙ্গ বরাবরই কদর্য স্বভাবের চাটুকারদের দ্বারা পরিবেষ্টিত থাকতেন। এরাই ছিল তাঁর পরামর্শদাতা।

এদিকে সিরাজউদ্দৌলার প্রতিনিধি রায় রাসবিহারী সসৈন্যে রাজমহল অভিমুখে অগ্রসর হন। তিনি রাজমহলে পৌঁছে নবাবের একটি পত্র শওকত জঙ্গের নিকট প্রেরণ করেন। ওই পত্রে নবাব সিরাজউদ্দৌলা তাঁর প্রতিনিধি রায় রাসবিহারীর নিকট পুর্নিয়ার শাসনভার হস্তান্তরের জন্য শওকত জঙ্গকে নির্দেশ দেন। কিন্তু শওকত জং তাঁর সভাসদদের পরামর্শে পত্রের জবাবে সিরাজউদ্দৌলাকে মুর্শিদাবাদের মসনদ ত্যাগ করে ঢাকায় গিয়ে তাঁর নায়েব হিসেবে উক্ত এলাকা শাসন করার অথবা অবসর ভাতা গ্রহণ করার নির্দেশ দেন।

শওকত জঙ্গের পত্র পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সিরাজউদ্দৌলা পুর্নিয়া অধিকারের জন্য রাজা মোহনলালের অধীনে এক বাহিনী প্রেরণ করেন। পথে পাটনার নায়েব নাযিম রাজা রামনারায়ণ তাঁর বাহিনী নিয়ে মোহনলালের সঙ্গে যোগ দেন। বিহারের জমিদারদের সম্মিলিত বাহিনীও এ অভিযানে যুক্ত হয়। রাজা মোহনলালের নেতৃত্বে বাহিনীর অগ্রবর্তী অংশ রাজমহলের নিকটে গঙ্গানদী অতিক্রম করে। এরপর হায়াতপুর ও বসন্তপুর গোলার (পুরাতন কোশি নদীর পূর্ব তীরবর্তী) পথ ধরে দক্ষিণ পুর্নিয়ার মনিহারীতে পৌঁছে। বাংলার বাহিনীর অপর অংশ এবং রাজা রামনারায়ণের অধীনে বিহারের সেনাবাহিনী খানিকটা দূরে থেকে অগ্রবর্তী বাহিনীকে অনুসরণ করছিল।

শওকত জঙ্গ তাঁর বাহিনী নিয়ে শত্রু বাহিনীর মোকাবেলার জন্য অগ্রসর হন এবং মনিহারীর চার মাইল উত্তরে নওয়াবগঞ্জে পরিখা খনন করে অবস্থান নেন। সেনাপতি শ্যামসুন্দরকে তাঁর গোলন্দাজ বাহিনীর দায়িত্ব দেয়া হয়। সুচিন্তিত পরিকল্পনার অভাব এবং তাঁর নিছক দম্ভের কারণে শওকত জং তেমন কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারেন নি। ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দের ১৬ অক্টোবর মনিহারীতে উভয় পক্ষে এক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধে শওকত জঙ্গের বিপুল সংখ্যক সৈন্য নিহত এবং বহু সৈন্য আহত ও বন্দী হয়; অবশিষ্ট সৈন্য যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যায়। তাদের অনেকে অস্ত্রধারণ করার সুযোগ পর্যন্ত পায় নি। হস্তীপৃষ্ঠ থেকে সৈন্যদের পরিচালনা কালে অকস্মাৎ মাথায় শত্রুর গুলির আঘাতে শওকত জঙ্গ নিহত হন। মোহনলাল পুর্নিয়া দখল করে শওকত জঙ্গের ধনসম্পদসহ তাঁর পরিবার পরিজনকে বন্দী করে মুর্শিদাবাদে ফিরে আসেন।

শওকত জঙ্গ নিঃসন্দেহে ছিলেন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী সিরাজউদ্দৌলার চেয়ে অনেক বেশি সাহসী এবং প্রকাশ্য যুদ্ধে অবলীলায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর খেয়ালিপনা ও কান্ডজ্ঞানহীন একগুয়েমীর কারণে তাঁর কতিপয় অনুগত ও দক্ষ সেনানায়করাও তাঁর জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনতে পারেন নি। দিল্লির সম্রাটের নিকট থেকে সুবাহ বাংলার নিয়ামতের ফরমান লাভ করা সত্ত্বেও রাজকীয় গুণাবলির অভাবে তিনি তাঁর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হন।  [মুয়ায্‌যম হুসায়ন খান]