লোকভঙ্গিমা


লোকভঙ্গিমা লোকসমাজে প্রচলিত বিভিন্ন অর্থবোধক ভঙ্গিমা (Gesture)। এর সঙ্গে আঞ্চলিক জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের সম্পর্ক থাকে। ভঙ্গিমা শব্দটি সাধারণভাবে নাট্যাভিনয়ের সঙ্গে জড়িত, যার অর্থ অঙ্গভঙ্গি, ইশারা, অঙ্গদ্বারা সংকেত ইত্যাদি। তবে শিল্পের অন্য আঙ্গিক, যেমন  লোকনৃত্যলোকসঙ্গীত, লোকাচার ইত্যাদির মধ্যেও লোকভঙ্গিমার নানাবিধ রূপ ফুটে ওঠে। বহু প্রাচীনকাল থেকেই জনসাধারণের বিভিন্ন ক্রিয়াকর্মে এই লোকভঙ্গিমার প্রয়োগ চলে আসছে।

লোকভঙ্গিমার প্রকাশ ঘটে সাধারণত তিনভাবে বাক্য, ক্রিয়া ও ভাবের মাধ্যমে এবং এর ওপর ভিত্তি করেই লোকভঙ্গিমাকে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে: বাচিক, ক্রিয়াত্মক ও ভাবাত্মক। বাঙালি জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন লোকজ ক্রিয়াকলাপের মধ্যে আছে লাঙ্গলে জমিকর্ষণ, ফসল বপন ও আহরণ, কাঠ কাটা, মাটি কাটা, কুঁড়েঘর বানানো, মাছ ধরা, নৌকা বাওয়া, ঢেঁকি কোটা, দুধ দোওয়া,  নকশি কাঁথা সেলাই, কামারের কাজ, কুমারের কাজ, পালকি বহন, গরুর গাড়ি চালানো, মাকু চালানো ইত্যাদি। এছাড়া গ্রামীণ জীবনের খেলাধুলা যেমন  হাডুডু, দাড়িয়াবান্দা, লাঠিখেলা,  নৌকাবাইচ, কানামাছি, গুলতি দিয়ে পাখি শিকার, সাঁতার কাটা ইত্যাদির মধ্যে অঙ্গভঙ্গির অভিব্যক্তি এতই স্পষ্ট যে, সংলাপ বা ভাষা ব্যবহার ব্যতিরেকে সমস্ত কর্মকান্ডই অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে। গ্রামবাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে বিবাহানুষ্ঠানে বৈচিত্র্যপূর্ণ আচার, যেমন  গায়ে হলুদ, কনে সাজানো, বর অভ্যর্থনা, বধূবরণ ইত্যাদি সময়ে নাচ-গানের সমাহারে যে অঙ্গভঙ্গিমার প্রকাশ ঘটে, তা এদেশের  লোকসংস্কৃতির নিজস্ব রূপ ও বৈশিষ্ট্যকেই তুলে ধরে।

বাংলার লোকভঙ্গিমার সঙ্গে অন্যান্য দেশের লোকভঙ্গিমার সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্ণয় করা যায়। নৌকা চালনার ক্ষেত্রে যে ভঙ্গিমা প্রকাশ করা হয় তাতে এই পার্থক্য স্পষ্টভাবে বোঝা যায়। নৌকায় ব্যবহূত বিভিন্ন ধরণের বৈঠা যে ভঙ্গিমায় দুহাতে ধরে তার সাহায্যে পানি কেটে নৌকাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়, তা অন্য দেশের নৌকা চালনায় দৃষ্ট হয় না। দাঁড় টানার ক্ষেত্রেও বাঁশ বা কাঠের ছোট লাঠিতে যেভাবে দুহাত স্থাপন করে নদীর পাড় ঘেঁষে একাধিক মাল্লা হেঁটে হেঁটে নৌকা টেনে নিয়ে যায় সে দৃশ্য অন্যত্র বিরল। ধানক্ষেতে বীজ বা সার ছিটানোর সময় কোমরে ঝুড়ি রেখে বাম হাতে ধরে ডান হাতে বীজ বা সার ছড়িয়ে দিতে দিতে এগিয়ে যাওয়া, বা বাঁশের তৈরি পলো দিয়ে খাল-বিলের পানিতে মাছ ধরার চিত্র এক ব্যতিক্রমধর্মী ভঙ্গিমার জন্ম দেয়। এছাড়া বেহারারা পালকির সামনে-পেছনে গোলাকার মোটা কাঠ বা বাঁশের অংশ কাঁধের ওপর ফেলে দোলায়িত হাতের ভঙ্গিমায় গ্রামের পথ ধরে এগিয়ে যাওয়ার সময় যে চলনভঙ্গির সৃষ্টি করে, তা বাংলার লোকভঙ্গিমার শাশ্বত ও স্বকীয় রূপকেই তুলে ধরে। ডান হাতের আঙুল দিয়ে নরম কাদামাটিতে ধানের চারা রোপণ করা, মাথায় করে পাকা ধানের অাঁটি ঘরে নিয়ে যাওয়া, ঢেঁকির পেছনের অংশে পা দিয়ে চেপে ধরা ও হাতে বাঁশের খুঁটি ধরে ধান ভানা ইত্যাদির মধ্যেও বাংলার লোকভঙ্গিমা ফুটে ওঠে।

বাঙালির সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের মধ্যেও লোকভঙ্গিমার বিচিত্র প্রকাশ দেখা যায়।  যাত্রাগম্ভীরাআলকাপ, বাউলনাচ,  পুতুলনাচকবিগানজারিগান প্রভৃতি লোকভঙ্গিমাসমৃদ্ধ নাটক। আলকাপের প্রাণ হচ্ছে ছোকরানাচ ও অভিনয়। এতে নারীবেশী কোনো কিশোরকে নারীর চলন-বলন, ছলা-কলা ইত্যাদি বিষয়ে পারদর্শিতা প্রদর্শন করতে হয়। গম্ভীরা গানে নানা-নাতির অভিনয়ে অপূর্ব ভঙ্গিমার মাধ্যমে উত্তরবঙ্গের কৃষকজীবনের ছায়াপাত ঘটে। এভাবে বাংলার লোকজীবন, আচার ও সংস্কৃতিতে লোকভঙ্গিমার আবহমান ধারা প্রবাহিত হয়ে আসছে। [জিল্লুর রহমান জন]