লাহোর প্রস্তাব


লাহোর প্রস্তাব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়াতে এবং ভারতীয় নেতৃবৃন্দের মতামত না নিয়ে ভারত সরকারের যুদ্ধে যোগদানের কারণে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তা আলোচনা করতে এবং ১৯৩৭ সালের সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশসমূহে  মুসলিম লীগের পরাজয়ের কারণ বিশ্লেষণের জন্য মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ১৯৪০ সালে লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সাধারণ অধিবেশন আহবান করেন।

মুসলিম লীগের কর্মীদের একটি ক্ষুদ্র দল নিয়ে হোসেন শহীদ সোহ্‌রাওয়ার্দী ১৯৪০ সালের ১৯ মার্চ লাহোরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। অধিবেশনে যোগদানের জন্য বাংলার মুসলিম লীগ দলের নেতৃত্ব দেন .কে ফজলুল হক এবং তাঁরা ২২ মার্চ লাহোরে পৌঁছেন। বাংলার প্রতিনিধি দলকে বিপুল জয়ধ্বনি দিয়ে বরণ করা হয়।

জিন্নাহ তাঁর দুঘণ্টারও অধিক সময়ব্যাপী বক্তৃতায় কংগ্রেস ও জাতীয়তাবাদী মুসলমানদের সমালোচনা করেন এবং দ্বি-জাতি তত্ত্ব ও মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাসভূমি দাবি করার পেছনের যুক্তিসমূহ তুলে ধরেন। তাঁর যুক্তিসমূহ সাধারণ মুসলিম জনতার মন জয় করে।

পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী সিকান্দার হায়াত খান লাহোর প্রস্তাবের প্রারম্ভিক খসড়া তৈরি করেন, যা আলোচনা ও সংশোধনের জন্য নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সাবজেক্ট কমিটি সমীপে পেশ করা হয়। সাবজেক্ট কমিটি এ প্রস্তাবটিতে আমূল সংশোধন আনয়নের পর ২৩ মার্চ সাধারণ অধিবেশনে ফজলুল হক সেটি উত্থাপন করেন এবং চৌধুরী খালিকুজ্জামান ও অন্যান্য মুসলিম নেতৃবৃন্দ তা সমর্থন করেন। প্রস্তাবটি উপস্থাপনের সময় ফজলুল হক বক্তব্য রাখেন। লাহোর প্রস্তাবটি ছিল নিম্নরূপ:

ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও পূর্ব এলাকাসমূহের মতো যে সকল অঞ্চলে মুসলমানগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ, সে সব অঞ্চলে ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ’ (স্টেটস্) গঠন করতে হবে যার মধ্যে গঠনকারী এককগুলি হবে স্বায়ত্তশাসিত ও সার্বভৌম।

বাংলার মুসলমানগণ, যারা উনিশ ও বিশ শতকের প্রথম দিকে নিজেদের আত্মপরিচয় খুঁজে ফিরছিল, পরিশেষে লাহোর প্রস্তাবের মধ্যে তার সন্ধান পায়। লাহোর প্রস্তাব তাদেরকে একটি জাতীয় চেতনা প্রদান করে। তখন থেকে মুসলিম রাজনীতির প্রধান ধ্যানধারণা হিন্দুদের অবিচারের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানোর পরিবর্তে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক অস্তিত্ব অর্জনের দাবির রূপ পরিগ্রহ করে।

২৪ মার্চ প্রবল উৎসাহের মধ্য দিয়ে প্রস্তাবটি গৃহীত হয়। হিন্দু সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রসমূহ লাহোর প্রস্তাবকে ক্যামব্রিজে বসবাসরত দেশত্যাগী ভারতীয় মুসলমান রহমত আলী কর্তৃক উদ্ভাবিত নকশা অনুযায়ী ‘পাকিস্তানের জন্য দাবি’ হিসেবে আখ্যায়িত করে। ১৯৪০ সালের প্রস্তাবের কোথাও পাকিস্তানের উল্লেখ নেই এবং ‘স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহের’ দাবি জানাতে গিয়ে লীগের মুখপাত্রগণ কি চাচ্ছেন সে সম্পর্কে মোটেও দ্ব্যর্থহীন ছিলেন না। হিন্দু সংবাদপত্রসমূহ মুসলিম নেতৃত্বকে একটি সুসামঞ্জস্য স্লোগান সরবরাহ করে, যা অবিলম্বে তাঁদেরকে একটি রাষ্ট্রের ধারণা জ্ঞাপন করে। মুসলমান নেতাদের পক্ষে সাধারণ মুসলিম জনগণের নিকট লাহোর প্রস্তাবের ব্যাখ্যা প্রদান এবং এর প্রকৃত অর্থ ও গুরুত্ব হূদয়ঙ্গম করাতে দীর্ঘ সময় লেগে যেতে পারত। হিন্দু সংবাদপত্রসমূহ কর্তৃক প্রস্তাবটিকে ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ হিসেবে নামকরণ হওয়াতে সাধারণ জনগণের মাঝে এর পূর্ণ গুরুত্ব জনে জনে প্রচার করার ব্যাপারে মুসলমান নেতৃবৃন্দের অনেক বছরের পরিশ্রম কমিয়ে দেয়। পাকিস্তানের ধারণাটির প্রতি জোর দেওয়ার মাধ্যমে হিন্দু সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রসমূহ একজন আইনজীবীর অত্যধিক শব্দবহুল আচ্ছন্ন বর্ণনাকে উদাত্ত আহবানে পর্যবসিত করতে সাহায্য করে।

১৯৪১ সালের ১৫ এপ্রিল মাদ্রাজে অনুষ্ঠিত অধিবেশনে লাহোর প্রস্তাবকে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের গঠনতন্ত্রে একটি মৌল বিষয় হিসেবে সন্নিবেশ করা হয়। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের স্বাধীনতা পর্যন্ত এটি লীগের প্রধান বিষয় ছিল।

প্রকৃতপক্ষে, ১৯৪০ সালের পরবর্তী সময় থেকে ভারতীয় স্বাধীনতার বিতর্কের প্রধান প্রসঙ্গ ছিল পাকিস্তান। ভারতীয় নেতৃবৃন্দের সাথে পরামর্শ করতে এবং স্বশাসনকে সহজতর করার সাহায্য কল্পে ১৯৪৬ সালের মার্চ মাসে যখন মন্ত্রী মিশন ভারতে পৌঁছে, তখন ৭ এপ্রিল দিল্লিতে নিখিল ভারত মুসলিম লীগ তাদের ‘পাকিস্তান দাবি’র পুনরাবৃত্তি করতে মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইন পরিষদের সদস্যদের তিন-দিনব্যাপী এক সম্মেলন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেয়। সম্মেলনে উপস্থাপনের জন্য একটি খসড়া প্রস্তাব তৈরি করতে মুসলিম লীগের ওয়ার্কিং কমিটি চৌধুরী খালিকুজ্জামান, হাসান ইস্পাহানি ও অন্যান্যদের সমবায়ে একটি উপ-কমিটি নিয়োগ করে। চৌধুরী খালিকুজ্জামান প্রস্তাবের একটি খসড়া তৈরি করেন। অন্যান্য সদস্যদের সাথে খসড়াটি নিয়ে আলোচনা করা হয় এবং সামান্য পরিবর্তনের পর উপ-কমিটি এবং অতঃপর সাবজেক্ট কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত হয়। ‘স্টেটস’ (States) শব্দটিকে একবচন শব্দ ‘স্টেট’ (State)-এ পরিবর্তন করা হয়। এ পরিবর্তন মূল লাহোর প্রস্তাবের মৌলিক পরিবর্তন সাধন করে।

১৯৪৬ সালে মুসলমান আইন প্রণয়নকারীদের দিলি­ সম্মেলনে যে প্রস্তাবটি উপস্থাপন করা হয় তাতে নিম্নোক্ত মূলনীতিটি অন্তর্ভুক্ত ছিল:

ভারতের উত্তর-পূর্ব দিকে বাংলা ও আসাম সমবায়ে এবং উত্তর-পশ্চিম দিকে পাঞ্জাব, উত্তর পশ্চিম সীমান্তপ্রদেশ, সিন্ধু ও বেলুচিস্থান সমবায়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের নিয়ে যে অঞ্চলসমূহ গঠিত, সে অঞ্চলসমূহকে নিয়ে একটি সার্বভৌম স্বাধীন ‘রাষ্ট্র’ গঠন করা হোক এবং কোন রকম বিলম্ব ছাড়াই পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বাস্তবায়নের বিষয়ে একটি দ্ব্যর্থহীন অঙ্গীকার প্রদান করা হোক। কমিটি এ পরিবর্তনের ব্যাপারে কোন প্রশ্ন তোলে নি।

উন্মুক্ত অধিবেশনে প্রস্তাবটি উপস্থাপন করেন সোহরাওয়ার্দী এবং সমর্থন করেন চৌধুরী খালিকুজ্জামান। আবুল হাশিম দাবি করেন যে, আগের দিন জিন্নাহ যখন সাবজেক্ট কমিটি সমীপে এটি তোলেন তখন তিনি বৈধতার প্রশ্নে সেখানে প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। তিনি অভিমত পোষণ করেন যে, খসড়া প্রস্তাবটিকে লাহোর প্রস্তাবের সংশোধনের মতো মনে হচ্ছিল, যদিও এটা বলা হয়নি, অথবা এটাকে লাহোর প্রস্তাবের সংশোধনের আকারে উপস্থাপন করা হয়নি। তিনি এ ধরনের যুক্তি দেখিয়েছেন বলে দাবি করেন যে, লাহোর প্রস্তাবে ভারতের উত্তর-পূর্ব ও উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলসমূহে দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্রকে মনশ্চক্ষে দেখা হয়েছে এবং ১৯৪১ সালে মাদ্রাজে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের অধিবেশনে প্রস্তাবটিকে ঐ রাজনৈতিক দলটির মৌল বিষয় হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছিল। তিনি এ বিষয়টির ওপর জোর দিয়েছিলেন বলে দাবি করেন যে, মুসলিম লীগের আইন প্রণয়নকারীদের দিল্লি সম্মেলনে লাহোর প্রস্তাবের সারমর্ম পরিবর্তন করা অথবা এর  আকারে রূপান্তর আনয়ন করার ব্যাপারে আইনগত বৈধতা ছিল না।

জিন্নাহ প্রথমে লাহোর প্রস্তাবের বহুবচনবাচক ‘এস’ (S)-কে ‘সুস্পষ্ট মুদ্রণ ভ্রম’ হিসেবে অভিহিত করেন। কিন্তু যখন আবুল হাশিমের অনুরোধে সভার মূল কার্যবিবরণীর রেকর্ড পরীক্ষা করে দেখা হয় তখন জিন্নাহ তাঁর নিজের দস্তখতের নিচে বহুবচনবাচক ‘এস’ দেখতে পান। জিন্নাহকে তাঁর অভীষ্ট লক্ষ অর্জনে সহায়তা করতে গিয়ে আবুল হাশিম নিশ্চিতভাবে বলেন যে, তিনি (হাশিম) ‘ওয়ান’ শব্দটি ঘষে তুলে ফেলে তদ্স্থলে অনির্দিষ্টবাচক আর্টিকেল ‘এ’ বসানোর ইঙ্গিত দেন যাতে জিন্নাহর প্রস্তাব নিম্নোক্ত রূপ ধারণ করে:

আমাদের লক্ষ্য হলো ভারতের উত্তর-পশ্চিমে এবং বাংলা ও আসামকে অন্তর্ভুক্ত করে ভারতের উত্তর-পূর্বে পাকিস্তান রাষ্ট্র কায়েম করা।

এটা বলা হয়ে থাকে যে, জিন্নাহ আবুল হাশিমের উদ্ভাবিত উপায় যথাযথ বলে গ্রহণ করেন। হাশিমের মতানুসারে, জিন্নাহর উপদেশে সোহরাওয়ার্দী সম্মেলনের উন্মুক্ত অধিবেশনে প্রস্তাবটিকে রূপান্তরিত আকারে পেশ করেন। সুতরাং এটা প্রতীয়মান হয় যে, মুসলিম আইন প্রণয়নকারীদের দিল্লি সম্মেলনের পরও জিন্নাহ লাহোর প্রস্তাবের সংশোধনের পরিভাষা অনুসারে চিন্তা-ভাবনা করছিলেন না। জিন্নাহ যে সাবজেক্ট কমিটির সভাপতি ছিলেন সেটিও আপাতদৃষ্টিতে যতদূর মনে হয় এ গঠনতান্ত্রিক অবস্থান নেয় যে, মুসলিম আইন প্রণয়নকারীদের সম্মেলন লাহোর প্রস্তাবের সংশোধন আনয়নের ব্যাপারে আলাপ-আলোচনার বৈধ বা যোগ্য স্থান নয়। অথবা লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে দেশের সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়ার পর জিন্নাহও এটির সংশোধন করতে পারেন না। বাংলা থেকে মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দের একটি প্রতিনিধিদলকে বিশেষ ক্ষমতা প্রদানপূর্বক জিন্নাহর নিকট প্রেরণ করা হলে তাঁদের সাথে সাক্ষাতের সময় তিনি নেতৃবৃন্দকে আশ্বাস দেন যে, লাহোর প্রস্তাবটি সংশোধন করা হয়নি। ১৯৪৬ সালের ৩০ জুলাই তারিখে জিন্নাহ তাঁর মালবারি পাহাড়ে অবস্থিত বাসভবনে বসে আবুল হাশিমকে লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে অভীষ্ট লক্ষ অর্জনের জন্য প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে উৎসাহিত করেন।  [মুহম্মদ শাহ]