লক্ষ্মীপূজা


লক্ষ্মীপূজা হিন্দুদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। লক্ষ্মী সমৃদ্ধি ও সৌভাগ্যের দেবীরূপে পুজিতা। ঋগ্বেদে  শ্রী ও ঐশ্বর্যের দেবী অর্থে লক্ষ্মীর নাম পাওয়া যায়। ঐত্তিরীয়সংহিতায় লক্ষ্মী ও শ্রী আদিত্যের দুই স্ত্রীরূপে কল্পিত; শতপথব্রাহ্মণে  প্রজাপতি থেকে এবং রামায়ণে সমুদ্রমন্থনের সময় পদ্মহস্তে তিনি উত্থিত হন বলে বর্ণিত হয়েছে।

লক্ষ্মী

পৌরাণিক যুগে লক্ষ্মী নানাভাবে বর্ণিত ও বন্দিত হয়েছেন। তিনি কখনো বিষ্ণুশক্তি লক্ষ্মী, আবার কখনো কমলা, গজলক্ষ্মী, মহালক্ষ্মী ইত্যাদি নামে পরিচিত। লক্ষ্মীদেবীর রূপবৈচিত্র্য পর্যালোচনায় দেখা যায় যে, তিনি কখনো দ্বিভুজা, কখনো বা চতুর্ভুজা। তবে তিনি সর্বত্রই পদ্মাসনা ও পদ্মহস্তা; প্রভাত সূর্যের ন্যায় তাঁর জ্যোতি। তিনি বিভিন্ন অলঙ্কারে অলঙ্কৃত এবং তাঁর বাহন পেঁচক।

দুর্গাপূজার পর পূর্ণিমা তিথি লক্ষ্মীপূজার জন্য অতি প্রশস্ত  সময়। এদিন রাতে দেবী মর্ত্যবাসীদের দ্বারে দ্বারে এসে আশীর্বাদ নিয়ে যান। রাতে জেগে থেকে রাতব্যাপী দেবীর ধ্যান-আরাধনায় মগ্ন থাকলে ভক্ত তাঁর অনুগ্রহ লাভ করেন বলে মনে করা হয়; আর ভক্তরা বিনিদ্র থেকে লক্ষ্মীর পূজা করে বলে এ রাতকে বলা হয় কোজাগরী পূর্ণিমা বা কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা।

আশ্বিনী পূর্ণিমা ছাড়াও কেউ কেউ প্রতি বৃহস্পতিবার লক্ষ্মীর বিশেষ পূজা করে থাকে। কোনো কোনো অঞ্চলে দীপান্বিতা অমাবস্যায় সন্ধ্যাবেলা লক্ষ্মীপূজার রীতি প্রচলিত আছে। সরায়, ঘটে বা মূর্তিতে লক্ষ্মীর পূজা করা হয়। এ পূজা সর্বজনীন বা ব্যক্তিগত উভয়ভাবেই অনুষ্ঠিত হয়।

লক্ষ্মীপূজা উপলক্ষে বাড়ি-ঘরে বিভিন্ন রকম  আলপনা অাঁকা হয়; বিশেষ করে ঘরের দরজা থেকে শুরু করে লক্ষ্মীর আসন এবং ধান-চালের গোলা পর্যন্ত ছোট ছোট পায়ের ছাপ দেওয়া হয়। এটি লক্ষ্মীর গমনপথের প্রতীকরূপে কল্পিত। পূজান্তে ভক্তেরা প্রসাদ খায়; অঞ্চলভেদে নারকেল (বিশেষত নারকেলের জল) এবং নাড়ু-চিড়া খেয়ে সারারাত আনন্দফূর্তি করে থাকে। পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে লক্ষ্মীদেবী পূজিতা হন। বাঙালি হিন্দুদের ঘরে ঘরে বিশেষত গ্রামাঞ্চলে লক্ষ্মীর আসন থাকে।  গ্রামাঞ্চলে লক্ষ্মীপূজার দিন বিভিন্ন স্থানে মেলা বসে; মেলায় গার্হস্থ্যকর্মে ব্যবহার্য জিনিসপত্রসহ বিভিন্ন সৌখিন দ্রব্যও বেচা-কেনা হয়। এ উপলক্ষে কোথাও কোথাও নৌকাবাইচও অনুষ্ঠিত হয়। [সুরেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়]