লক্ষ্মণসম্বত


লক্ষ্মণসম্বত (সংক্ষেপে লা সাম)  উত্তর বিহারে আবিষ্কৃত স্বল্প সংখ্যক লিপিতে উল্লিখিত একটি কালগণনার নাম। রাখালদাস বন্দোপ্যাধায় এ তত্ত্বের প্রধান প্রবক্তা যে ১১১৯-২০ খ্রিস্টাব্দ থেকে লক্ষ্মণসম্বত সনের শুরু। সেন রাজা লক্ষ্মণসেন কর্তৃক সিংহাসনে অধিষ্ঠানকালের সূচনাকে নির্দেশ করে। যদিও উক্ত সময়ে লক্ষ্মণসম্বতত সন ব্যবহারের কোন প্রমাণ ইতিপূর্বে পাওয়া যায়নি। অশোকছল্লের প্রাপ্ত বোধগয়া লিপিতে উল্লিখিত তথ্যানুযায়ী, লক্ষ্মণসম্বত ব্যবহূত প্রাচীনতম সন হিসেবে পাওয়া যায় ৫১ বছর। এ লিপিতে বা অন্যান্য সকল লিপিতে রাজত্বকাল হিসেবে উল্লিখিত ‘সম’ শব্দটির আগে সর্বদাই ‘অতীত রাজ্য’ শব্দ দুটি ব্যবহার করা হয়েছে। লিপির ব্যাখ্যাকারী ‘অতীত রাজ্য’ শব্দটির প্রয়োগ এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে কালগণনা লক্ষ্মণসেনের রাজত্বকালের শুরু থেকেই করা হয়েছে; অথচ লক্ষ্মণসেনের রাজত্বকাল অতীতের একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

এ তত্ত্বের ব্যাখ্যার বিরোধীতাকারীদের যুক্তিও প্রণিধানযোগ্য। বিপক্ষ মতের সমর্থকদের প্রধান আর,সি মজুমদার মনে করেন, লক্ষ্মণসেনের রাজত্বের পতনের সময় থেকেই লক্ষ্মণসম্বত গণনা শুরু হয়েছিল। লক্ষ্মণসেন-এর রাজত্বের অবসানের সময় থেকে অর্থাৎ তেরো শতকের শুরুতে বিহারের জনগণ কর্তৃক লক্ষণসম্বত গণনা শুরু হয়েছিল বলেই তাঁরা এ সনকে ‘অতীত রাজ্য’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

মূলত বাংলায় সেন রাজাদের সঙ্গে লক্ষ্মণসম্ব^ত এর কোন সম্পর্ক নেই। কারণ লক্ষ্মণসেনের রাজত্বকালের সূচনার সঙ্গে এই সনের সম্পৃক্ততার বিরুদ্ধে প্রধান যুক্তি হচ্ছে যে লক্ষ্মণসম্বত উল্লেখ রয়েছে এমন কোন একটিও প্রামাণিক দলিল এ পর্যন্ত সেনদের রাজ্যে আবিষ্কৃত হয়নি। উপরন্তু এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত সেন রাজাদের সকল সরকারি দলিলে সংশ্লিষ্ট রাজাদের, বিশেষ করে লক্ষণসেন ও তাঁর পুত্রদের রাজ্যাঙ্কে উল্লেখ করা হয়েছে। ব্যাখ্যাকারগণ কখনোই এ তথ্যের ব্যাখ্যা দেননি যে, লক্ষ্মণসেন কেন এ কালগণনা তাঁর নিজ রাজ্যে প্রচলন না করে উত্তর বিহারে করতে গেলেন। অবশ্য ব্যাখ্যাকারগণ ফ্লিটের নীতিবাক্যটি এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করেন তা হলো, ‘অনেক রাজ্যেই এমন কালগণনা ব্যবহার হয়েছে যার উৎপত্তি অন্য রাজ্যে; কিন্তু এমন কোনো রাজ্য পাওয়া যাবে না যেখানে সৃষ্ট কোন কালগণনা কখনোই সেখানে ব্যবহূত হয়নি’। কাজেই আমাদের অবশ্যই লক্ষ্মণসম্বত এর নামের সঙ্গে সেন রাজা লক্ষ্মণসেনের নামের সম্পৃক্ত করা থেকে বিরত থাকা উচিৎ। অর্থাৎ পুর্বভারতের ইতিহাসে ‘লক্ষ্মণসম্বত’ একটি অমিমাংসিত সমস্যা হিসেবেই থেকে যাবে।  [আবদুল মমিন চৌধুরী]

গ্রন্থপঞ্জি  Rakhal Das Bandopadhyaya, Bangalar Itihas, Calcutta, 1321 BS.,Vol.I, p. 284ff.; R.C.Majumdar, History of Bengal, Vol.I, Dacca, 1943, p.233-238; Abdul Momin Chowdhury, Dynastic History of Bengal, Dacca, 1967, p. 212-215.