লকেট ও মন্ত্রপূত কবচ


লকেট ও মন্ত্রপূত কবচ  লকেট মূলত মালার মধ্যমণি, যা সৌন্দর্যবর্ধক অলঙ্কার হিসেবে ব্যবহূত হয়। অপরপক্ষে মন্ত্রপূত কবচের সঙ্গে জাদু-টোনা এবং রোগব্যাধি থেকে আরোগ্য লাভের সংস্কার জড়িত। অনেকে মনে করেন যে, মন্ত্রপূত কবচ ব্যবহারকারী কুদৃষ্টি বা দুর্ভাগ্য থেকে রক্ষা পান।

কৌষিকসূত্র গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, নৌকা আকৃতির মন্ত্রপূত কবচ পরিধান করলে নৌযাত্রা নিরাপদ হয়। বৈদিক যুগ থেকে কুঠারাকৃতির একটি মন্ত্রপূত কবচ কোন ব্যক্তিকে মিথ্যা অপবাদ থেকে বাঁচানোর প্রতীক হিসেবে ব্যবহূত হয়ে আসছে। কচ্ছপ আকৃতির মন্ত্রপূত কবচ দীর্ঘায়ুর প্রতীক। ধর্মীয় আচার হিসেবেও মন্ত্রপূত কবচের ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়। মিশরীয় মমির বুকের উপর বহু সংখ্যক মন্ত্রপূত কবচ দেখা যায়। ব্রিটিশ জাদুঘরের মমির বুকে নির্দিষ্ট স্থানে সুনির্দিষ্ট মন্ত্রপূত কবচ থাকার রেওয়াজ প্রদর্শিত হয়েছে। অনেক উদাহরণ থেকে লক্ষ্য করা গেছে যে, রোগমুক্তি, শত্রুজয়, পৌরুষত্বলাভ, বিপরীত লিঙ্গকে আকৃষ্ট করা, ক্রুদ্ধ দেবতাকে বশীভূত করা প্রভৃতি মন্ত্রপূত কবচ ব্যবহারের প্রধান উদ্দেশ্য। কিন্তু একথাও সত্য যে, অনেক মন্ত্রপূত কবচ ব্যবহারের প্রকৃত কারণ আজও জানা সম্ভব হয়নি। অথর্ববেদ ও কৌষিকসূত্রসহ অন্যান্য বৈদিক গ্রন্থে মন্ত্রপূত কবচ ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়।

প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্যে দেখা যায় যে, ভারতবর্ষে হরপ্পা সভ্যতায় লকেট ও মন্ত্রপূত কবচ ব্যবহারের প্রচলন ছিল। প্রাচীন বাংলার অসংখ্য প্রত্নস্থান, যেমন বাণগড়, চন্দ্রকেতুগড়, মহাস্থানগড়, উয়ারী-বটেশ্বর থেকে বিভিন্ন পদার্থের বেশ কিছু লকেট এবং মন্ত্রপূত কবচ পাওয়া গিয়েছে। স্বল্পমূল্য পাথর ছিল লকেট এবং মন্ত্রপূত কবচ তৈরির জনপ্রিয় উপাদান। কুঠার, নৌকা, দাঁত, অর্ধচন্দ্র, পানির ফোঁটা প্রভৃতি আকৃতির লকেট এবং মন্ত্রপূত কবচ ছিল জনপ্রিয়। ভারতবর্ষসহ পৃথিবীর অনেক প্রত্নস্থানে অনুরূপ লকেট এবং মন্ত্রপূত কবচ পাওয়া যায়। প্রাচীন বাংলায় প্রাপ্ত সাদৃশ্যপূর্ণ লকেট এবং মন্ত্রপূত কবচসমূহ উপর্যুক্ত প্রত্নস্থানগুলির বিশ্বজনীন চরিত্রের ইঙ্গিত প্রদান করে।

পরিতাপের বিষয় যে, প্রাচীন বাংলায় প্রাপ্ত মহামূল্যবান ইতিহাসের উপাদান লকেট এবং মন্ত্রপূত কবচ নিয়ে খুব একটা গবেষণা হয়নি। উৎখনন ও অনুসন্ধানের ফলে প্রাপ্ত লকেট এবং মন্ত্রপূত কবচগুলির তথ্য প্রায় ক্ষেত্রে অপ্রকাশিত। ব্যক্তিগত সংগ্রহ এবং জাদুঘরের গুদামে রক্ষিত সংগ্রহগুলিও যথাযথ গবেষণার দাবি রাখে।  [শাহ সুফি মোস্তাফিজুর রহমান]