রোহিতাগিরি


রোহিতাগিরি  দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার (সমতট-বঙ্গ) চন্দ্রবংশীয় বিখ্যাত রাজা শ্রীচন্দ্রের বেশ কয়েকটি তাম্রশাসনে তাঁর পূর্বপুরুষদের আদিবাসস্থান হিসাবে উল্লেখিত স্থান। উল্লেখ করা হয়েছে যে বংশের প্রথম রাজা পূর্ণচন্দ্র ছিলেন রোহিতাগিরির ‘ভূজাম’ (অর্থাৎ ভূস্বামী)। তাঁরই পৌত্র ত্রৈলোক্যচন্দ্র হরিকেল রাজার অধীন এমন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন যে তাঁকে হরিকেল রাজার শক্তির ‘আধার’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ তিনি ছিলেন হরিকেল রাজার একজন অতীব শক্তিশালী সামন্ত। চন্দ্রলিপিতে উল্লেখিত রোহিতাগিরির অবস্থান শনাক্তকরণে বহু পন্ডিত বিভিন্ন প্রস্তাব রেখেছেন। রাখাল দাস বন্দোপাধ্যায় ও ননী গোপাল মজুমদার রোহিতাগিরিকে বিহারের শাহাবাদ জেলার রোহতাসগড়ের সাথে শনাক্ত করে মনে করেছেন যে চন্দ্রবংশ পাল রাজাদের সামন্ত ছিলেন এবং পালরাজাদের অধীনে কর্মোপলক্ষে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় আসেন। এ কথা বলা আবশ্যক যে ধ্বনীগত মিল ছাড়া এ মতের সমর্থনে অন্য কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাছাড়া চন্দ্রলিপিতে তথ্য রয়েছে যে চন্দ্ররা প্রাথমিক পর্যায়ে হরিকেল রাজাদের অধীনে সামন্ত ছিলেন। সুতরাং এ তথ্যের সাথে উপর্যুক্ত মতের কোন মিলই পাওয়া যায় না। তাই রোহিতাগিরির অবস্থান খুঁজতে হবে দক্ষিণ-পূর্ব বাংলায় এবং হরিকেল রাজ্যের মধ্যে। হরিকেল রাজ্যের আদি অবস্থান দক্ষিণ-পূর্ব বাংলার আরাকান সংলগ্ন অঞ্চল বলেই নির্ধারণ করা হয়েছে। এসব তথ্য মনে রেখে নলিনীকান্ত ভট্টশালী রোহিতাগিরিকে কুমিল্লা জেলার লালমাই পাহাড় অঞ্চলে শনাক্ত করার পক্ষে মত পোষণ করেছেন। হরিদাস মিত্র অবশ্য রোহিতাগিরিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটির সাথে অভিন্ন মনে করেছেন। ময়নামতী এলাকায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননে চন্দ্রবংশের তিনটি তাম্রশাসন প্রাপ্তি লালমাইর পক্ষেই কিছুটা পন্ডিতদের প্রভাবিত করেছিল।

একথা মনে রাখা প্রয়োজন যে রোহিতাগিরি ‘লালমাই’ (লালমাটি)-এরই সংস্কৃতরূপ এবং উপর্যুক্ত কারণেই ভট্টশালীর মতই পন্ডিতবর্গের সমর্থন পেয়েছিল। কিন্তু শ্রীচন্দ্রের পশ্চিমভাগ তাম্রশাসনের উপর ভিত্তি করে হারুনুর রশীদ উল্লেখ করেছেন যে সমতট অঞ্চল প্রথমদিকে চন্দ্ররাজ বংশের অধীনস্থ ছিল না তাই রোহিতাগিরিকে সমতটের বাইরে খুঁজতে হবে। তাই তিনি আহম্মদ হাসান দানীর মতের প্রতি কিছুটা সমর্থন দিয়েছেন। দানী প্রস্তাব করেছিলেন যে লালমাই পাহাড়ের দক্ষিণদিকে যে পার্বত্য অঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রাম পেরিয়ে আরাকানের দিকে গিয়েছে রোহিতাগিরির অবস্থান সম্ভবত এ পর্বত এলাকাতেই হবে। উল্লেখ্য যে এ পার্বত্য এলাকার মাটিও লালচে ‘লেটিরাইটিক’ এবং তাই রোহিতাগিরি নামে পরিচিত হওয়ার দাবি করতে পারে। হারুনুর রশীদ মনে করেন যে চন্দ্রদের আদি বাসস্থান রোহিতাগিরি যদি এখনও থেকে থাকে তাহলে তাকে খুঁজতে হবে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে বঙ্গ-সমতট-শ্রীহট্ট এলাকা ও আরাকানের মধ্যবর্তী অঞ্চলে। ভবিষ্যৎ প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানই হয়তো এ ব্যাপারে আমাদেরকে নিঃসন্দেহ প্রমাণ দিতে সক্ষম হবে।  [ আবদুল মমিন চৌধুরী ]

গ্রন্থপুঞ্জি  AM Chowdhury, Dynastic History of Bengal, Dhaka, 1967; M Harunur Rashid, The Early History of South-East Bengal in the Light of Archaeological Material, Dhaka, 2008.