রোহিঙ্গ্যা


রোহিঙ্গ্যা  আরাকান থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণকারী আরাকানের মুসলিম অধিবাসী। এরা ১৯৭৮ সাল থেকে মায়ানমার সীমান্তে আন্তর্জাতিক উদ্বাস্ত্ত সমস্যার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাধীন আরাকান রাজ্যে প্রাচীনকাল থেকেই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী মুসলমান। মুসলমানরা বিভিন্ন দেশ থেকে এসে মধ্যযুগে আরাকানে বসতি স্থাপন শুরু করে। আরাকান রাজ্যে বসবাসকারী মুসলমানরা রোয়াইঙ্গা, যাম্ভইকা, কামানচি, জেরবাদী ও দিন্নেত এই পাঁচটি জাতিগোষ্ঠীতে বিভক্ত। রোয়াইঙ্গা জাতিগোষ্ঠিই রোহিঙ্গ্যা নামে পরিচিত। রোহিঙ্গ্যা জাতিগোষ্ঠির উদ্ভব সম্পর্কে মতভেদ সত্ত্বেও নির্ভরযোগ্য মত হলো, চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে আরাকান রাজ্যে বসতিস্থাপনকারী চট্টগ্রামি পিতার ঔরসজাত ও আরাকানি মাতার গর্ভজাত বর্ণসংকর জনগোষ্ঠীই রোয়াইঙ্গা বা রোহিঙ্গ্যা।

আরাকানে বৌদ্ধ মগ ও রোহিঙ্গ্যা মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদয়িক দাঙ্গার ফলে ১৯৪০ সাল থেকে, বিশেষ করে ১৯৪৮ সালে বার্মার স্বাধীনতা লাভের পর বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গ্যা মুসলমান আরাকান ত্যাগ করে চট্টগ্রামে আশ্রয় নেয়। সবচেয়ে ভয়াবহ দাঙ্গা সংঘটিত হয় ১৯৪২ সালে। এ দাঙ্গায় প্রায় এক লক্ষ রোহিঙ্গ্যা মুসলমানকে হত্যা করা হয় বলে উল্লেখ রয়েছে। ফলে বহুসংখ্যক রোহিঙ্গ্যা আরাকান ছেড়ে বাংলাদেশে চলে আসে। রোহিঙ্গ্যা মুসলমানরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানীদের ফেলে যাওয়া অস্ত্র এবং পরবর্তী সময়ে গোপন পথে অস্ত্র সংগ্রহ করে মগদের বিরুদ্ধে মোজাহিদ বাহিনী গঠন করলেও তেমন সাফল্য অর্জন করতে পারে নি। ১৯৪৮ সালে উ নু-র শাসনামলে ৯০ ভাগ মগদের সমন্বয়ে গঠিত বার্মা টেরিটোরিয়াল ফোর্স (বি.টি.এফ) সন্দেহজনক নাগরিক অজুহাতে রোহিঙ্গ্যাদের উচ্ছেদ অভিযান চালায়। এ সময়ে রোহিঙ্গ্যাদের সশস্ত্র প্রতিরোধ আন্দোলনের মুখে বার্মা সরকার তাদের কিছু অধিকার প্রদান করে। রোহিঙ্গ্যারা বার্মার একটি জাতি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

১৯৬২ সালে রোহিঙ্গ্যারা পুনরায় নিপীড়ন, নির্যাতন ও উচ্ছেদের শিকার হয়। জেনারেল নে-উইন প্রধানমন্ত্রী উ নু-কে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং সামরিক অফিসারদের নিয়ে বার্মা সোশালিস্ট প্রোগ্রাম পার্টি গঠন করে বার্মাকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ঘোষণা করে। আরাকানকে বৌদ্ধশাসিত অঙ্গরাজ্যের মর্যাদা দেওয়া হয়। জেনারেল নে-উইনের সাম্প্রদায়িক নীতির ফলে রোহিঙ্গ্যাসহ আরাকানের অন্যান্য মুসলিম জাতিগোষ্ঠীর সঙ্গে বৌদ্ধদের সাম্প্রদায়িক বিভেদ ও দাঙ্গা প্রকটতর হয়। নে-উইনের বৈষম্যমূলক আচরণ এবং জাতিগত আন্দোলন দমনে বর্মীকরণ নীতি বাংলাদেশের রোহিঙ্গ্যা উদ্বাস্ত্ত সংকটের বিস্তার ঘটায়।

জেনারেল নে-উইন ও স মং-এর শাসনকালে বার্মার নাগরিক হিসেবে যেসকল রোহিঙ্গ্যা মুসলমান বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে তাদের নিয়েই সৃষ্টি হয়েছে রোহিঙ্গ্যা উদ্বাস্ত্ত সমস্যা। জেনারেল নে-উইন আরাকানে জাতিগত আন্দোলন দমনের জন্য ১৯৭৮ সালে নাগামিন ড্রাগন অপারেশন চালায়। আরাকান ন্যাশনাল লিবারেশন পার্টির সঙ্গে রোহিঙ্গ্যা মুসলমানদের সম্পৃক্ততার কারণে নির্বিচারে হাজার হাজার রোহিঙ্গ্যাকে হত্যা করা হয়। নাগামিন ড্রাগন অপারেশনের ফলে প্রায় ২ লাখ রোহিঙ্গ্যা মুসলমান উদ্বাস্ত্ত বাংলাদেশে প্রবেশ করে। বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গ্যা উদ্বাস্ত্তদের আশ্রয় ও মানবিক সহায়তা প্রদানের মতো আর্থসামাজিক অবস্থা বাংলাদেশের ছিল না। উদ্বাস্ত্ত সমস্যার দ্রুত সমাধানের জন্য বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ কামনা করে। জাতিসংঘসহ অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামের চাপের মুখে নে-উইন সরকার রোহিঙ্গ্যা উদ্বাস্ত্তদের ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়। দুদেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী ১৯৭৯ সালের ৬ অক্টোবর থেকে ২৪ ডিসেম্বরের মধ্যে রোহিঙ্গ্যা উদ্বাস্ত্তরা স্বদেশে ফিরে যায়। অবশ্য তখনও ১৫ হাজার রোহিঙ্গ্যা মুসলমান বাংলাদেশে থেকে যায়।

নে-উইন ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে ১৯৮৩ সালের পর বার্মায় আগত রোহিঙ্গ্যাদের ভাসমান নাগরিক হিসেবে ঘোষণা করেন। ফলে বার্মায় রোহিঙ্গ্যাদের সম্পত্তি অর্জন, রাজনৈতিক অধিকার ও অবাধ বিচরণ নিষিদ্ধ হয়ে যায়। রোহিঙ্গ্যাদের উপর নতুন করে নির্যাতন শুরু হয়। নে-উইনের নিবর্তনমূলক নীতির ফলেই ১৯৯১ সালে পুনরায় রোহিঙ্গ্যা উদ্বাস্ত্ত সংকটের সৃষ্টি হয়।

১৯৯০ সালের মে মাসে সাধারণ নির্বাচনে অং সাং সুচির নেতৃত্বাধীন ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্র্যাসির প্রার্থীরা ৯০% আসনে জয়ী হয়। উক্ত নির্বাচনে আরাকানের রোহিঙ্গ্যা মুসলমানরা অং সাং সু চি-র প্রার্থীদের সমর্থন করে। আরাকানের ২৩টি নির্বাচনী এলাকায় ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্র্যাসি একচেটিয়া প্রাধ্যান্য লাভ করে। জেনারেল স মং নির্বাচনে বিজয়ী দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে অং সাং সু চি-কে গৃহবন্দি করেন এবং সু চি-র প্রতি একচেটিয়া সমর্থন প্রদানের কারণে স মং-এর নির্দেশে সেনাবাহিনী রোহিঙ্গ্যা মুসলমানসহ গণতান্ত্রিক আন্দোলনে জড়িত রাখাইনদের উপর ব্যাপক নির্যাতন শুরু করে। নববইয়ের নির্বাচনী ফলাফল ও রোহিঙ্গ্যা বিরোধী অপারেশনের ফলে ১৯৯১ সালের ২৬ জুনের মধ্যে ২,৫০,৮৭৭ জন রোহিঙ্গ্যা মুসলমান আরাকান থেকে বিতাড়িত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের ১৯টি শরণার্থী শিবির এবং শিবিরের বাইরে ২,৫০,৬৬১ জন রোহিঙ্গ্যা উদ্বাস্ত্ত আশ্রয় নেয়। মায়ানমার সরকার ২,৩১,২৭৯ জন রোহিঙ্গ্যাকে তাদের দেশের নাগরিক বলে স্বীকার করে। দুদেশের সরকারের মধ্যে ১৯৯২ সালের ২৮ এপ্রিল এক সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী ১৯৯২ সালের ১৫ মে থেকে ৬ মাসের মধ্যে শরণার্থীদের ফিরিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করলেও অদ্যাবধি প্রায় ২২ হাজার শরণার্থী প্রত্যাবসনের অপেক্ষায় কক্সবাজার জেলার উখিয়া থানাধীন কুতুপালং এবং টেকনাফ থানাধীন নয়াপাড়া শরণার্থী শিবিরে অবস্থান করছে।

মায়ানমার সরকার এই ২২ হাজার শরণার্থীর মধ্যে মাত্র ৭ হাজার রোহিঙ্গ্যাকে তাদের নাগরিক বলে স্বীকার করে। পাঁচ হাজার শরণার্থী মায়ানমার সরকারের নির্যাতনের ভয়ে স্বদেশে ফিরে যেতে চাচ্ছে না। শরণার্থীদের নাগরিকত্বের প্রশ্নে মায়ানমার সরকারের নেতিবাচক ভূমিকা এবং স্বদেশে ফিরে যেতে রোহিঙ্গ্যাদের ভীতি শরণার্থী প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে স্থবির করে রেখেছে। ১৯৯৭ সালে প্রত্যাবাসনের বিপক্ষের গ্রুপসমূহ এবং বাংলাদেশ পুলিশের মধ্যে সশস্ত্র সংঘাতের পর দীর্ঘ ১৬ মাস শরণার্থী প্রত্যাবাসন বন্ধ থাকে। অতঃপর ১৯৯৮ সালের ২৫ নভেম্বর থেকে পুনরায় প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হয়। মায়ানমার সরকার প্রতি মাসে ৫০ জনের তালিকা পাঠায় এবং জাতিসংঘ উদ্বাস্ত্ত বিষয়ক হাইকমিশন ও বাংলাদেশ সরকার সে তালিকা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে সে অনুযায়ী শরণার্থী প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। প্রথমদিকে ২৮টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক এনজিও বাংলাদেশে আশ্রিত বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গ্যা উদ্বাস্ত্তদের জরুরি ভিত্তিতে খাদ্য, পানীয়, গৃহনির্মাণ, পয়ঃনিষ্কাশন, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের জন্য কাজ শূরু করে।

সাধারণভাবে ধরে নেওয়া হয় যে মায়ানমারের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকট বাংলাদেশে উপর্যুপরি রোহিঙ্গ্যা শরণার্থী সংকট সৃষ্টি করে আসছে। রোহিঙ্গা সমস্যা ব্যতিত দুই দেশের মধ্যে বস্ত্তত অন্য কোনো রাজনৈতিক সমস্যা নেই। দেশের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, পরিবেশগত বিপর্যয়, চোরাচালানের প্রকোপ বৃদ্ধি, জনমনে অসন্তোষ, সীমান্তে উত্তেজনা সৃষ্টি ইত্যাদি থেকে দ্রত অব্যাহতি পেতে হলে রোহিঙ্গ্যা সমস্যার দ্রুত সমাধান হওয়া প্রয়োজন।  [কে.এম মহিউদ্দিন]