রেনেল, জেমস


রেনেল, জেমস (১৭৪২-১৮৩০)  ভূগোলবিদ ও নৌ-প্রকৌশলী। তিনি বাংলার নদী অববাহিকা সম্পর্কে অনুসন্ধান চালান এবং সর্বপ্রথম এদের মানচিত্র অঙ্কন করেন। ইংল্যান্ডের ডেবনশায়ারে জন্মগ্রহণকারী জেমস রেনেল ১৭৫৬ সালে ব্রিটিশ নৌবাহিনীতে যোগ দেন। তাঁর পিতা জন রেনেল রাজকীয় সেনাবাহিনীর গোলন্দাজ শাখার ক্যাপ্টেন ছিলেন। নৌবাহিনীতে কাজ করার সময় রেনেল সমুদ্র-জরিপ ও নৌ-প্রকৌশল বিদ্যায় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৭৬৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চাকরিতে যোগদানের পূর্বে রেনেল ফিলিপাইনের কয়েকটি পোতাশ্রয়ের জরিপকার্য সম্পন্ন করেন। বাণিজ্যিক নৌযান চলাচল সহজতর করার জন্য ফোর্ট উইলিয়মের গভর্নর হেনরী ভ্যান্সিটার্ট কোম্পানির সেনাবাহিনীর বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ার্স কোর-এ তাঁকে কমিশন প্রদান করে বাংলার প্রধান প্রধান নদী ও এদের শাখা নদীর একটি জরিপকার্য সম্পাদনের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব তাঁর উপর ন্যস্ত করেন। কোম্পানি কর্তৃক বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দীউয়ানি লাভের (১৭৬৫) পর এই ধরনের একটি জরিপের প্রয়োজনীয়তা আরও তীব্রভাবে অনুভূত হয়। গভর্নর রবার্ট ক্লাইভ ১৭৬৭ সালে একটি নিয়মিত জরিপ বিভাগ প্রতিষ্ঠা করেন এবং জেমস রেনেলকে এই বিভাগের সার্ভেয়ার জেনারেল নিয়োগ করা হয়।

অবশ্য এই সময় নাগাদ রেনেল গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর গতিপ্রকৃতি ও আনুষঙ্গিক অবস্থার অনুসন্ধানকার্য বহুলাংশে সম্পন্ন করেছিলেন। ঢাকা ছিল তাঁর কর্মকান্ড পরিচালনার সদর দপ্তর। রেনেলকে প্রথমত নিয়োগ করা হয়েছিল শুধু গাঙ্গেয় ব-দ্বীপ জরিপ করার জন্য, যার বিশেষ লক্ষ্য ছিল সুন্দরবন ও মেঘনার মধ্যবর্তী পথের পরিবর্তে গঙ্গা থেকে কলকাতায় বৃহদাকার নৌযান চালানোর উপযোগী অপেক্ষাকৃত কম দূরত্বের নৌপথ খুঁজে বের করা। তাঁর লেখা দিনপঞ্জি থেকে এই অভিযান এবং পরবর্তী তিনটি অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। এই অভিযানকালে তিনি উত্তর ও পূর্ব বঙ্গের অধিকাংশ অঞ্চলে জরিপকার্য সম্পন্ন করেন এবং গোয়ালপাড়া ছাড়িয়ে আসামে ঢুকে পড়েন। কুচবিহার সীমান্তে এই দায়িত্বে নিয়োজিত থাকাকালে তিনি ফকির  মজনু শাহের অনুসারী একদল বিদ্রোহী কর্তৃক আক্রান্ত হয়ে গুরুতর আহত হন। সম্ভবত এই ঘটনাই ১৭৭১ সালে ফকির বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে উত্তরবঙ্গে এক অভিযানে নেতৃত্ব দানে রেনেলকে তাড়িত করেছিল।

রেনেল তাঁর দিনপঞ্জিতে উল্লেখ করেছেন যে, অনুসন্ধান পরিচালনাকালে তিনি অনেকবার বাঘ, সরীসৃপ, ডাকাত ও শত্রুভাবাপন্ন লোকদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন। প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অপ্রতুলতা সত্ত্বেও মাত্র চারজন সহকারী নিয়ে তিন বছরের মধ্যে তিনি জরিপকার্য সম্পন্ন করেন। তাঁর অনুসন্ধানী কার্যক্রম এতোটাই সন্তোষজনকভাবে সম্পাদিত হয়েছিল যে, পরবর্তীকালে সার্ভে অব ইন্ডিয়া কর্তৃক তাঁর শনাক্তকরণ অত্যন্ত নির্ভুল প্রতিপন্ন হয়। বেঙ্গল ইঞ্জিনিয়ার্সে মেজর পদে পদোন্নতি লাভের অল্পকাল পরেই রেনেল ১৭৭৬ সালে পেনশনসহ চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। ১৭৭৯ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘বেঙ্গল অ্যাটলাস’ ছিল বাণিজ্যিক, সামরিক ও প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটি সর্বোচ্চ গুরুত্বসম্পন্ন অবদান। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বাজারে মানচিত্রের সহজলভ্যতার পূর্ব পর্যন্ত রেনেলের ‘অ্যাটলাস’ (ভূমানচিত্র) শিক্ষার্থিসহ প্রশাসনিক ও নৌ-চলাচল কাজে সর্বস্তরের ব্যবহারকারীদের কাছে ছিল একটি-নির্ভরযোগ্য অবলম্বন। রেনেলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ অবদান সর্বপ্রথম মোটামুটি নির্ভুলভাবে অঙ্কিত ভারতবর্ষের মানচিত্র। এই মানচিত্রের সঙ্গে সংযুক্ত ছিল রেনেলের একটি ‘ভাষ্য’ (১৭৮৩)। যে পরিকল্পনার ভিত্তিতে মানচিত্রটি অঙ্কিত হয়েছিল তার পূর্ণ বিবরণ লিপিবদ্ধ ছিল এই ভাষ্যে। ১৭৯০ সালে তিনি উত্তর আফ্রিকার একটি মানচিত্রও অঙ্কন করেন।

১৭৮১ সালে জেমস রেনেল রয়্যাল সোসাইটির একজন ‘ফেলো’ নির্বাচিত হন। ১৭৯১ সালে তিনি রয়্যাল সোসাইটির ‘কপলে পদক’ লাভ করেন। পরবর্তীকালে তিনি বায়ু ও সমুদ্র স্রোত সম্পর্কিত অধ্যয়নে সম্পূর্ণভাবে আত্মনিয়োগ করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি তাঁর সকল পর্যবেক্ষণ ও সমুদ্র সম্পর্কিত অধ্যয়ন লব্ধ জ্ঞান একটি একক পদ্ধতিতে সমন্বিত করেন। ভূগোলবিদদের নিকট এটি ‘রেনেলের স্রোত’ নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৮০০ সালে তাঁকে ইনস্টিটিউট অব ফ্রান্স-এর একজন সহযোগী মনোনীত করা হয় এবং ১৮২৫ সালে তিনি রয়্যাল সোসাইটি অব লিটারেচার-এর স্বর্ণপদক লাভ করেন। ১৮৩০ সালের ২৯ মার্চ তাঁর মৃত্যু হয় এবং ওয়েস্টমিনিস্টার অ্যাবিতে তাঁকে সমাহিত করা হয়।  [সিরাজুল ইসলাম]