রায়, হিমাংশু


রায়, হিমাংশু (১৮৯২-১৯৪০) ভারতীয় চলচ্চিত্রের পুরোধা, অভিনেতা এবং বম্বে টকিজের প্রতিষ্ঠাতা। ১৮৯২ সালে উড়িষ্যার কটকে তাঁর জন্ম, কিন্তু পৈতৃক নিবাস ছিল বৃহত্তর ঢাকার মানিকগঞ্জে। পিতা হেমেন্দ্রনাথ রায় ছিলেন বিহার ও উড়িষ্যার বিভিন্ন রাজার এস্টেট ম্যানেজার।

হিমাংশু  শান্তিনিকেতনএর ব্রহ্মচর্যাশ্রমে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ইংল্যান্ড গমন করেন। সেখানে তিনি স্কুল পরীক্ষা পাস করার পর আইন পড়ার সময় নাটক এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। ক্রমশ নাটকের প্রতিই তাঁর আকর্ষণ বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং নিরঞ্জন পাল রচিত গডেস (১৯২২) নাটকে তিনি প্রথম অভিনয় করেই খ্যাতি অর্জন করেন। এক সময় তিনি আইন পড়া ছেড়ে দিয়ে সম্পূর্ণভাবে শিল্পজগতে প্রবেশ করেন এবং তাঁর শিল্পপ্রতিভা বিকাশের মাধ্যম হিসেবে তিনি চলচ্চিত্রকে বেছে নেন।

লন্ডনে থাকা অবস্থায়ই হিমাংশু রায় চলচ্চিত্র বিষয়ে পড়াশুনা শুরু করেন। পরে চলচ্চিত্রে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য তিনি জার্মান যান। সেখানে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘গ্রেট ইস্টার্ন ফিল্ম কর্পোরেশন’ নামে একটি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান। জার্মান পরিচালক ফ্রানৎজ অস্টেনের পরিচালনায় মিউনিখের এমালকা ফিল্ম কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে তিনি প্রযোজনা করেন দি লাইট অব এশিয়া (১৯২৫), সিরাজ (১৯২৬), থ্রো অব এ ডাইস (১৯২৮) এবং কর্ম (১৯৩৩) ছবিগুলি। ভারতীয় অভিনেতা-অভিনেত্রীদের নিয়ে নির্মিত ইংরেজি ছবি কর্ম তখন গ্রেট ব্রিটেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে প্রদর্শিত হয়ে প্রচুর প্রশংসা অর্জন করে। এ ছবিতে হিমাংশু ও তাঁর স্ত্রী দেবিকারাণীর অভিনয়ও বিপুলভাবে প্রশংসিত হয়। তাঁর দি লাইট অব এশিয়া  ছবিটি ১৯২৬ সালে দশ মাস ধরে লন্ডনে প্রদর্শিত হয় এবং সে বছর শ্রেষ্ঠ ছবির বিচারে সেটি তৃতীয় স্থান লাভ করে।

নানারকম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ভারতাত্মাকে ফুটিয়ে তোলার প্রয়াসে হিমাংশু রায় দীর্ঘ দশ বছর বিদেশে কাটিয়ে দেন। পরে ১৯৩৩ সালে দেশে ফিরে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন বম্বে টকিজ। আমৃত্যু তিনি ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসেবে এর পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর কর্মনৈপুণ্যের কারণেই বম্বে টকিজ তখন প্রাচ্যের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা লাভ করে। তাঁর এই প্রতিষ্ঠান থেকেই নির্মিত হয় অচ্ছ্যুৎ কন্যা, জীবনপ্রভাত, বচন প্রভৃতি সাড়া জাগানো চলচ্চিত্র। প্রখ্যাত অভিনেতা দিলীপকুমার রায় এই প্রতিষ্ঠানের ছবির মাধ্যমেই চলচ্চিত্র জগতে আত্মপ্রকাশ করেন। [অনুপম হায়াৎ]