রায়, অতীন্দ্রমোহন


রায়, অতীন্দ্রমোহন (১৮৯৪-১৯৭৯)  বিপ্লবী নেতা। ১৮৯৪ সালে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলার নবীনগর উপজেলার ভোলাচং গ্রামের এক জমিদার পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষাজীবন বাড়িতেই শেষ হয়। পরে বাবা আনন্দ মোহন রায় তাঁকে কুমিল্লার ইউসুফ উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করেন। এ বিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালে অতীন্দ্রমোহন বিপ্লবী সংগঠন ‘অনুশীলন সমিতি’র সদস্যদের সংস্পর্শে আসেন। বাংলা প্রদেশের পূর্বাঞ্চলের বিপ্লবী পুলিন দাশ অনুশীলন সমিতির সংগঠক ছিলেন এবং অতীন্দ্রমোহন এ দলের সক্রিয় সদস্য হিসেবে যোগদান করেন। ভিক্টোরিয়া কলেজে দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নকালে অনুশীলন দলের বিপ্লবী কর্মকান্ডের দায়ে পুলিশ তাঁকে আটক করে এবং সে সঙ্গে তাঁর পরবর্তী পড়াশুনার অগ্রগতির সম্ভাবনার পথও বন্ধ হয়ে যায়। ১৯২১ সালে বন্দীদশা থেকে মুক্ত হয়ে অতীন্দ্রমোহন কুমিল্লায় ফিরে আসার পর তিনি কবি কাজী নজরুল ইসলামের ঘনিষ্ট সংস্পর্শে আসেন। ১৯২২ সালে সাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’ প্রকাশের জন্য অতিন্দ্রমোহন কবিকে শুভেচ্ছাবাণী পাঠান, কারণ ধূমকেতু ছিল বিপ্লবীদের মুখপাত্র স্বরূপ।

বিপ্লবী রাজনীতিতে একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে অতীন্দ্রমোহন বিপ্লবী দলের সশস্ত্র ক্যাডারের অস্ত্র চালনা ট্রেনিং নেয়া ছাড়াও দেশের বাইরের বিভিন্ন উৎস থেকে অস্ত্র সংগ্রহ করা, বাংলায় কর্মরত ব্রিটেনের ধনী কর্মকর্তাদের বাড়িতে হানা দিয়ে ও ডাক এর ব্যাগ ছিনতাই করে বিপ্লবের জন্য পুঁজি সংগ্রহ করা, প্রভৃতি কাজে সক্রিয় থাকার দায়ে বিভিন্ন মেয়াদে তাঁকে প্রায় পঁচিশ বছর কারাবাস করতে হয়েছিল।

বন্দিদশায় অতীন্দ্রমোহন রাজ কারাবন্দীদের উন্নত সুযোগ-সুবিধা প্রদানের দাবিতে অন্যান্য রাজবন্দীদের সঙ্গে একটানা ৩৫ দিন অনশন করেন। দীর্ঘ কারাবাসের সময়ে একবার তাঁকে বীরভূম জেলার লবপুরে মুক্ত কারাগারে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি লবপুরের বাঙালি উপন্যাসিক প্রখ্যাত তারাশংকর বন্দোপাধ্যায়ের সংস্পর্শে আসেন।

অতীন্দ্রমোহন রায়

বলা হয়ে থাকে যে, দেশের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র বিপ্লবী রাজনীতিতে একনিষ্ঠ অতীন্দ্র রায়ের অনুরক্তিতে মুগ্ধ হয়ে তারাশংকর তাঁর ‘গঙ্গা-দেবতা’ উপন্যাসের প্রধান চরিত্রের ‘যতীন’কে অতীন্দ্র রায়ের প্রতিচ্ছবি হিসেবে তুলে ধরেছেন।

অতীন্দ্র রায় কুমিল্লায় একটি গোপন বিপ্লবী দল গড়ে তুলে সদস্যদেরকে ত্রিপুরার উদয়পুরে অস্ত্র চালনা শিক্ষা দিয়ে প্রত্যেককে সশস্ত্র বিপ্লবে অংশ গ্রহণের জন্য প্রস্ত্তত করার জন্য সংঘবদ্ধ করেন এবং একই সঙ্গে যুগান্তর, অনুশীলন প্রভৃতি অন্যান্য সশস্ত্র বিপ্লবী দলের সঙ্গে সমগ্র ভারতব্যাপী বিপ্লবী আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য প্রস্ত্তত করেন। কিন্তু তাঁর এ পরিকল্পনা প্রকাশ হয়ে গেলে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের অনেককেই পুলিশ আটক করে ডিটেনশনে পাঠায়। অতীন্দ্র রায় পালিয়ে গোপন আস্তানায় চলে যেতে সক্ষম হলেও ১৪ মাস পরে পুলিশ তাঁকে আটক করতে সক্ষম হয়। বিচারের রায়ে তাঁর ২৪ বছরের জেল হয়।

মুক্তির সংগ্রামে বিপ্লবী অতীন রায় ও তাঁর বিপ্লবী সদস্যদের অর্থনৈতিক সহযোগিতা করতেন আগরতলা রাজ্যের মহারাজা। বন্দীদশা থেকে মুক্তির পর তিনি কুমিল্লা শহরে House of Labours (শ্রমিক গৃহ) ঘরানার এক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলেন এবং এতে তিনি বহু বিপ্লবী কমরেডদের যুক্ত করেন। উৎপাদনশীল ব্যবসায় সক্রিয় থেকে বিপ্লবীরা গোপন রাজনৈতিক কর্মকান্ড চালনার মঞ্চ হিসেবে এ প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করতেন। কুমিল্লা ইলেকট্রিক সাপ্লাই লিঃ নামের একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি ছিলো ‘হাউজ অব লেবার’-এর সহযোগী সংস্থা সমূহের মধ্যে একটি। অতীন্দ্রমোহন রায় ছিলেন এর প্রথম ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

রাজ্যস্থানের দেউলী জেলে অবস্থানকালে অতীন রায় ও তাঁর অনুসারীগণ কার্ল মার্কস-এর তত্ত্ব অধ্যায়ন করেন ও রাশিয়ার বলশেভিক সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব দ্বারা অনুপ্রাণীত হয়ে তাঁরা মার্কসীয় সমাজতান্ত্রিক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েন। তিনি ও তাঁর অনুসারীগণ ভারতের শোষিত জনগণের শোষণমুক্তির পথ হিসেবে ‘বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দল’ (Revolutionary Socialist Party-RSP) নামে একটি মার্কসপন্থী দল গঠন করার সিদ্ধান্ত নেন। এসময় থেকে পরবর্তী সময়ে অতীন রায় নিজেকে সক্রিয়ভাবে দল গঠনের কাজে নিয়োজিত রাখেন।

ভারত ছাড় আন্দোলন (১৯৪২) কালে অতীন রায় কারাবাস থেকে মুক্ত হয়ে নিজেকে সাধারণের কল্যাণে নিয়োজিত করেন এবং ১৯৪৬ সালে কুমিল্লা পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত উক্ত পদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক উন্নয়নে আগ্রহী ছিলেন। অতীন রায় ১৯৩০ সালে কুমিল্লার কান্দিরপাড়ে ‘বিদ্যায়তন’ নামে একটি জাতীয়তাবাদী প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে বিদ্যালয়টি ভিন্ন স্থানে ‘ফরিদা বিদ্যায়তন’ নামে বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। অতীন রায় বেশ কয়েক বছর এ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটির সেক্রেটারির দায়িত্ব পালন করেন। সহযোগী বিপ্লবীদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ অমূল্য মুখার্জির মৃত্যুর পর অতীন রায় কুমিল্লার কান্দিরপাড়ে ‘অমূল্য স্মৃতি পাঠাগার’ প্রতিষ্ঠা করেন। তাছাড়াও অভয় আশ্রম, বীরচন্দ্র পাঠাগার, বসন্ত স্মৃতি পাঠাগার প্রভৃতি প্রতিষ্ঠায় তাঁর অনেক অবদান ছিল।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে অতীন রায়ের সক্রিয় সমর্থন ছিলো। ১৯৬৯ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিতব্য এক সম্মেলনে আর.এস.পি এর নতুন দল হিসেবে ‘শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল’ এর পত্তন হলে অতীন রায় নব প্রতিষ্ঠিত দলকে অকুণ্ঠ সমর্থন প্রদান করেন। তিনি ছিলেন কুমিল্লার শিশু সংগঠন ‘কচি-কাঁচার মেলা’র একজন প্রধান পৃষ্ঠপোষক।

১৯৭১ সালে ঢাকায় পশ্চিম পাকিস্তানী সৈন্যদের অতর্কিত আক্রমণের পর অতীন রায় কলকাতায় পালিয়ে যান। সেখানে তিনি বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামের পক্ষে ভারত সরকারের সমর্থন ও সাহায্যের জন্য তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। অতীন্দ্রমোহন রায়ের অনুপস্থিতিতে তাঁর ছেলে অসীম রায়কে (কুমিল্লার ভিক্টোরিয়া সরকারী কলেজের ডেমোনস্ট্রেটর), পাকিস্তানী দখলদার আর্মিরা হত্যা করে। স্বাধীনতার পর কুমিল্লায় ফিরে এলেও জীবনের শেষ দিনগুলো তিনি একজন বিচ্ছিন্ন ও একাকী মানুষ হিসেবে অতিবাহিত করেন।  [অজিত কুমার চৌধুরী]