রাজস্ব বিক্রয় আইন, ১৭৯৩


রাজস্ব বিক্রয় আইন, ১৭৯৩  সাধারণভাবে ’সূর্যাস্ত আইন’ নামে পরিচিত এই আইনটি চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত সংক্রান্ত আইনসমষ্টির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ১৭৯৩ সালের ১৪ নং রেগুলেশনে বিধান করা হয়েছিল যে, রাজস্ব পরিশোধে অক্ষম জমিদারদের জমি প্রকাশ্য নিলামে বিক্রয় করে জমিদারদের বকেয়া রাজস্ব আদায় করা হবে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অধীনে জমি জমিদারদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে পরিগণিত হয়।

মুগল শাসনতন্ত্র অনুযায়ী ভূমির মালিকানা ছিল রাষ্ট্রের এবং রায়ত বা প্রজাগণ তাতে প্রথাগত অধিকার ভোগ করত। রায়তদের নিকট থেকে খাজনা বা কর আদায়ের জন্য জমিদারগণ ছিলেন রাষ্ট্র কর্তৃক নিয়োজিত এজেন্ট বা প্রতিনিধি মাত্র। কর আদায়কারী এজেন্ট হিসেবে জমিদারগণ এবং উত্তরাধিকারসূত্রে জমির দখলদার হিসেবে রায়তদের মধ্যকার সম্বন্ধ একটি নতুন সম্পর্ক দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছিল। এর ফলে ভূমিতে জমিদারগণ নিরঙ্কুশ মালিকানা স্বত্ব লাভ করেন এবং রায়তগণ তাদের প্রজায় পরিণত হন। এই বিরাট সুবিধা ছাড়াও জমিদারগণ একটি নির্দিষ্ট হারে সরকারকে কর প্রদানের একটি বিশেষ সুবিধা লাভ করেন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত আইনে জমিদারদের ওপর নির্ধারিত রাজস্ব দাবি সরকার কর্তৃক বৃদ্ধিকরণ স্থায়িভাবে নিষিদ্ধ করা হয়।

বিনা খরচে ভূমিতে জমিদারদের মালিকানা-স্বত্ব লাভ এবং স্থায়িভাবে সরকারি রাজস্ব দাবি নির্ধারণ, এই দুটি বিশেষ সুবিধার বিপরীতে উপনিবেশিক সরকার একটি কঠোর আইন প্রণয়ন করেন। এই আইনে বিধান করা হয়েছিল যে, বন্যা, খরা, মহামারী প্রভৃতি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে জমিদারগণ রাজস্ব হ্রাসের জন্য কখনও কোন দাবি করতে পারবেন না এবং সরকার জমিদারি প্রকাশ্য নিলামে বিক্রয় করে বকেয়া রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করবেন। বঙ্গদেশের মতো মৌসুমি জলবায়ুনির্ভর কৃষি অর্থনীতিতে এরূপ একটি আইন ভূম্যধিকারীদের মধ্যে অবধারিতভাবে চরম দুরবস্থার সৃষ্টি করে, কারণ বন্যা ও খরার ফলে ফসল বিনষ্ট এবং গবাদিপশু ধ্বংস হয়ে অর্থনীতি সাময়িকভাবে পঙ্গু হয়ে পড়াটা ছিল খুবই স্বাভাবিক। ফলে যথাসময়ে নির্ধারিত রাজস্ব প্রদান করা জমিদারদের জন্য অনিশ্চিত হয়ে পড়ত।

জমিদারদের প্রবল প্রতিবাদ সত্ত্বেও ১৭৯৩ সালে রাজস্ব বিক্রয় আইন বলবৎ করা হয়। আইনটি কার্যকর হওয়ার সাত বছরের মধ্যেই জমিদারদের ভূ-সম্পত্তির প্রায় অর্ধেক অংশেরই হাত বদল হয়ে যায়। বৃহৎ এলাকার জমিদারগণ এ আইনের ফলে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। আইনটি বলবৎ হওয়ার এক দশকের মধ্যেই রাজশাহী, নদীয়া, বিষ্ণুপুর, দিনাজপুর, রাজনগর, লস্করপুর ও বৃহত্তর বর্ধমান অঞ্চলের জমিদারিসমূহ বিভাজিত হয়ে যায় এবং তাদের ভূমি নতুন ভূমালিকের হাতে চলে যায়। বছরের যেকোন মাসে রাজস্ব বিক্রয় আইন তাদের ধ্বংস করতে পারে, এই ভয়ে মাঝারি ও ছোট জমিদারগণ সব সময়ই তটস্থ ছিলেন। এ আইনে বারো কিস্তি বা দফায় অর্থাৎ মাসে মাসে কর পরিশোধের নিয়ম প্রচলিত ছিল। কোন কিস্তি সময়মতো পরিশোধ করতে ব্যর্থ হলে মাসের শেষে জমিদারি প্রকাশ্য নিলামে বিক্রয় করার  বিধান ছিল। কর প্রদানে ব্যর্থ জমিদারদের জমি বিক্রয়ের বিধান এত কড়াকড়ি ও নির্দয়ভাবে প্রয়োগ করা হতো যে, তা সূর্যাস্তের মতোই অপ্রতিরোধ্য ও অবশ্যম্ভাবী ছিল এবং তাতে অনেক বড় বড় জমিদার বংশের পতন তথা বৈভব-সম্পদের সূর্য অস্তমিত হতো। আর এজন্যই লোকে এ আইনকে সূর্যাস্ত আইন নামে আখ্যায়িত করে।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বলবৎ হওয়ার অব্যবহিত পরে ভূমি নিয়ন্ত্রণ ও ভূমি বাজারে যে সঙ্কট দেখা দেয় তা সমগ্র ভূমিসমাজকে অস্থিতিশীল করে তোলে। অনেক সময় দখলচ্যুত জমিদারগণ বিক্রয় প্রক্রিয়ার বিরোধিতা করে এবং ক্রেতাদের তাদের ক্রীত জমির দখল গ্রহণে বাধা প্রদান করে। ফলে সঙ্কটগ্রস্ত হয়ে উভয় পক্ষ আদালতে মামলা করে। সামাজিক অসন্তোষ ও দ্বন্দ্বসংঘাত, ক্রম অবনতিশীল আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, এবং সর্বোপরি এসব কারণে সরকারি রাজস্ব আদায়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিলে ১৭৯৯ সালে সরকার রাজস্ব বিক্রয় আইন সংশোধন করতে বাধ্য হয়। ১৭৯৯ সালের ৭ নং রেগুলেশনের অধীনে কর পরিশোধে ব্যর্থ ব্যক্তিদের জমি মাসের শেষে বিক্রয় করার প্রক্রিয়া রহিত করে বছরশেষে নিলামে বিক্রয়ের নতুন পদ্ধতি প্রবর্তন করা হয়।

উক্ত আইনে প্রবর্তিত সংশোধনীটি ভূমিবাজার ও ভূমিসমাজে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এতে দেখা গেল যে, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে সঙ্গে মধ্য উনিশ শতক থেকে কর উৎস হতে জমিদারি আয় বিস্ময়করভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের বিধান অনুযায়ী জমিদারদের ওপর সরকারি রাজস্ব দাবি সব সময়ই অপরিবর্তিত থেকে যায়। সুতরাং উনিশ শতকের শেষদিকে ও পরবর্তীকালে রাজস্ব প্রদানে ব্যর্থতার জন্য রাজস্ব বিক্রয় আইনের প্রয়োগ বিরল ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। তবু ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত না হওয়া পর্যন্ত সূর্যাস্ত আইন জমিদারদের তাড়া করে এসেছে। নিলামে জমিদারি বিক্রয়ের সামাজিক প্রতিক্রিয়াই জমিদারদের সন্ত্রস্ত করে রাখত। কেননা ভূমির মালিকগণ ছিলেন সামাজিকভাবে প্রভাবশালী ও সম্মানিত ব্যক্তি। স্বাভাবিকভাবেই তাদের জমি নিলামে বিক্রয় এবং তাদের স্বত্ব অন্যদের নিকট হস্তান্তর করা তাদের পারিবারিক সম্মান ও মর্যাদা হানিকর হিসেবেই বিবেচিত হতো।  [সিরাজুল ইসলাম]