রাজস্ব নীতি


রাজস্ব নীতি  একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যাবলি পরিচালনার লক্ষ্যে রাজস্ব এবং সরকারি ব্যয়সমূহের যথাযথ ব্যবহারপ্রণালী। দেশের জনগণকে কাম্য সেবা প্রদানার্থে সম্পদ সংগ্রহ এবং সেসব সম্পদের দক্ষ অর্থনৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য রাজস্ব নীতি প্রস্ত্তত করা হয়। সরকারি অর্থের মাধ্যমে রাজস্ব নীতি অর্থনৈতিক শক্তিসমূহের গতিপ্রকৃতিকে প্রভাবিত করে। বাংলাদেশের রাজস্ব নীতির মূল উদ্দেশ্যগুলির মধ্যে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার উন্নয়ন এবং জাতীয় আয়ের সমবণ্টনের উপায় বা কৌশলসমূহ চিহ্নিত ও উন্নতকরণ উলে­খযোগ্য। এসব উদ্দেশ্য অর্জনের প্রধান হাতিয়ারগুলি হচ্ছে সরকারি রাজস্ব ও সরকারি ব্যয়ের গুণগত পরিবর্তন এবং সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনা। এ বিষয়গুলি বাৎসরিক ভিত্তিতে প্রণীত ও বাস্তবায়িত সরকারি বাজেট সংক্রান্ত কার্যাবলির মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়।

স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রথম কয়েক বছর বাংলাদেশ সরকারকে দেশের আর্থ-সামাজিক অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত জনগণকে পুনর্বাসনের জন্য বিপুল পরিমাণ সম্পদ ব্যয় করতে হয়েছে। কিন্তু সে সময় সরকারি সঞ্চয় পরিস্থিতিতে প্রতিকূলতা বিরাজ করার সাথে সাথে ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগের পরিমাণও ছিল সীমিত। বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক সাহায্য পাওয়া সত্ত্বেও সরকারের আয় অপেক্ষা ব্যয়ের পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকায় তা সরকারকে ভাবিয়ে তোলে। তদুপরি অভ্যন্তরীণ ও বহির্দেশীয় নানা ঘাত-প্রতিঘাতের ফলে ঘাটতি অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। এমতাবস্থায় ১৯৭০ এবং ১৯৮০-র দশকে সরকারের রাজস্ব নীতি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন এবং বিভিন্ন অপ্রত্যাশিত ঘাত-প্রতিঘাত থেকে মুক্ত হয়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের ওপর গুরুত্বারোপ করে। তারপরও দেশের রাজস্ব কাঠামো এবং রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা অব্যাহত থাকে। আয়ের অসম বণ্টনের ফলে প্রতিবছর উলে­খযোগ্য সংখ্যক লোকের জীবনযাত্রার মান দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যেতে থাকায় আয়কর দাতার সংখ্যাও কমে যেতে থাকে। ফলে কর রাজস্বের পরিমাণও কমে যায়। সরকারের মোট কর রাজস্বের ৮০% ছিল অপ্রত্যক্ষ কর খাতে অর্জিত এবং এর মধ্যে আমদানি করের হার ছিল ৬০%। অর্থনৈতিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য অধিকাংশ আমদানি সরকার কর্তৃক সম্পাদন করা হতো বলে আমদানি কর বৃদ্ধি করার কোন সুযোগ ছিল না। উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়া সত্ত্বেও সরকার দেশের আর্থ-সামাজিক প্রয়োজন মেটানো ও আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়নের লক্ষ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্প প্রতিষ্ঠানসমূহের উৎপাদিত পণ্যাদির দাম উৎপাদন ব্যয় অপেক্ষা কম পর্যায়ে নির্ধারণ করে। এর ফলে উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয় রাজস্বের মধ্যে ব্যাপক ঘাটতি সৃষ্টিও অব্যাহত থাকে। বাংলাদেশের রাজস্ব নীতি এবং বাজেট প্রণয়নের সময় প্রাক্কলিত ব্যয় অপেক্ষা অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক সূত্র থেকে প্রাপ্তব্য আয় প্রবাহ অত্যধিক বেশি দেখানো হতো। এতে প্রায় প্রতিবছরই রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ বৃদ্ধি পেত। সংক্ষেপে বলা যায় যে, ১৯৭০ এবং ১৯৮০-র দশকে বাংলাদেশের রাজস্ব নীতিসমূহ সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি।

বৈদেশিক উৎসমূহ, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং তফশিলি ব্যাংকগুলির নিকট থেকে ঋণ গ্রহণের মাধ্যমে ঘাটতি অর্থায়ন বাংলাদেশের রাজস্ব নীতির মৌলিক বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। সাধারণ জনগণের সঞ্চয় ক্ষমতা এবং সঞ্চয়ের হার অত্যন্ত নিম্ন হওয়ায় তাদের নিকট থেকে ঋণ গ্রহণ করার মাধ্যমে ঘাটতি অর্থ সংগ্রহ করার সুযোগও ছিল অত্যন্ত সীমিত। সুতরাং মুদ্রাস্ফীতি ব্যতীত বাজেট ঘাটতি পূরণের কোন সুযোগই বাংলাদেশে ছিল না। আন্তর্জাতিক তারল্যাবস্থা এবং আন্তর্জাতিক মূলধন বাজারের স্থিতিশীলতার ওপর বহির্দেশীয় উৎস থেকে সরকারের ঋণগ্রহণ প্রাপ্তির সুযোগ নির্ভর করে। কিন্তু এ সুযোগ বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত একটি দেশের জন্য উন্মুক্ত ও নিশ্চিত নয়। রি-ফিন্যান্স সুবিধার আওতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পুনর্ভরণ পাওয়ার সুযোগ থাকায় বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণগ্রহণও মুদ্রাস্ফীতিমুক্ত নয়। এ অবস্থায় কোন একটি নির্দিষ্ট বৎসরের রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ যাই হোক না কেন, এর একটি অংশ কোনভাবেই বিদেশি ঋণের অর্থ দ্বারা মেটানো সম্ভব নয়। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করে তা মেটাতে হয়। ফলে বাংলাদেশের রাজস্ব ঘাটতির একটি অংশ সর্বদা কেন্দ্রীয় ব্যাংক তথা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে কর্জ গ্রহণের মাধ্যমে মেটানো হয়।

রাজস্ব খাতের উন্নয়নের জন্য ১৯৯০-এর দশকের প্রথমভাগে সরকার বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে। চলতি ব্যয় বৃদ্ধির হারকে জিডিপি বৃদ্ধির হার অপেক্ষা কম রাখাই ছিল সরকারের রাজস্ব নীতির প্রধান লক্ষ্য। মূলত প্রতিবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পর্যাপ্ত সম্পদের সংস্থান করাই ছিল সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করার মুখ্য উদ্দেশ্য। এই লক্ষ্যে আইএমএফ-এর এনহেন্সড স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটির আলোকে ১৯৯১ সালে মূল্য সংযোজনী করসহ রাজস্ব নীতিতে বেশকিছু উলে­খযোগ্য সংস্কার সাধন করা হয়। উৎপাদনসহ আমদানির শতকরা ১৫ ভাগ হারে ভ্যাট চালু করা হয়। ভ্যাট ব্যবস্থা চালুর ফলে আমদানির ওপর বিভিন্নমুখী বিক্রয় কর এবং স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত দ্রব্যাদির ওপর আবগারি কর কাঠামো বাতিল হয়ে যায়। ব্যক্তিগত আয়করের ক্ষেত্রেও কিছু সংস্কার সাধন করা হয়েছে। এর মধ্যে উলে­খযোগ্য হলো ব্যক্তিগত আয়করের ভিত্তি নির্ণয়ের সময় আপ্যায়ন খরচ ও অনুমোদিত সম্পদে করদাতার বিনিয়োগের অঙ্ক বাদ দেওয়া। এছাড়া সরকারি সঞ্চয়পত্রে প্রদেয় সুদের হার এবং খাদ্য ও পাটের জন্য ভর্তুকি হ্রাসের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ব্যক্তিখাতের নিকট বিক্রয়পূর্বক বেশ কিছুসংখ্যক রাষ্ট্রায়ত্ত বা সরকারি প্রতিষ্ঠান বিরাষ্ট্রীয়করণ করা হয়। এসব সংস্কারের ফলে ১৯৯০-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকারের রাজস্ব খাতে প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। চলতি ব্যয় বৃদ্ধির হার জিডিপি প্রবৃদ্ধির হারের নিম্নে অবস্থান করে। এছাড়া কর ব্যবস্থার সংস্কারের ফলে সরকারের রাজস্ব আয়ের হার ১৯৮৯-৯০ সালে জিডিপির ১০%-এর কম থেকে ১৯৯১-৯২ সালে ১১%-এ বৃদ্ধি পায়। এ ঊর্ধ্বগামী অবস্থা অব্যাহত থাকে এবং সামান্য হ্রাস-বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে তা ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে জিডিপির ১২% অতিক্রম করে। সংস্কারের কারণে কর রাজস্ব কাঠামোতে আরও কিছু পরিবর্তন সাধিত হয়। মোট কর রাজস্বের মধ্যে কাস্টমস শুল্কের পরিমাণ হ্রাস পায়। পক্ষান্তরে, আয়কর ও মুনাফা করের অংশ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে উন্নয়ন প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়নের জন্য প্রকল্প বরাদ্দের সরকারি অংশ যোগান দেওয়ার ক্ষেত্রে পূর্বেকার ঘাটতি অনেকাংশে দূর হয়।

বাংলাদেশ সরকারের রাজস্ব নীতি ও ব্যবস্থার উন্নয়নের বিষয়টি সরকারের প্রণীত বাজেটসমূহের মধ্যে প্রতিফলিত হয়। আশির দশকে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ ছিল জিডিপির ৮.৪% যা ১৯৯১-৯২ অর্থবছরে ৫.৯%-এ হ্রাস পায়। এতে সরকার আশান্বিত হয়। এ অবস্থা অব্যাহত থাকে এবং ১৯৯৭-৯৮ অর্থবছর পর্যন্ত সরকার বাজেট ঘাটতির পরিমাণ জিডিপির ৬%-এর মধ্যে সীমিত রাখতে সক্ষম হয় যা অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কিন্তু ১৯৯৮-৯৯ সময়ে সংঘটিত প্রলয়ঙ্করী ও দীর্ঘস্থায়ী বন্যার কারণে উপরিউক্ত স্থিতিশীলতা বিনষ্ট হয় এবং বাজেট ঘাটতির পরিমাণ পূর্বের তুলনায় বৃদ্ধি পায়। সার্বিক অবস্থা এমনই রূপ পরিগ্রহ করে যে, সরকার সর্বতোভাবে প্রচেষ্টা চালিয়েও চলতি ব্যয়সমূহের বৃদ্ধির হার নিয়ন্ত্রণে রাখতে অসমর্থ হয়। পক্ষান্তরে, রাজস্ব আদায়ের হারও হঠাৎ হ্রাস পেতে থাকে এবং তা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা অপেক্ষা অনেক নিম্নে অবস্থান করে। ফলে ১৯৯৮-৯৯ সালে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ জিডিপির ৭.৮% ছাড়িয়ে যায়। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে সরকার কিছু ত্বরিত পদক্ষেপ গ্রহণ করায় ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে বাজেট ঘাটতির পরিমাণ কিছুটা হ্রাস পেলেও তা জিডিপির ৬% অপেক্ষা কিছুটা উপরে অবস্থান করে।

১৯৮৯-৯০ অর্থবছর পর্যন্ত সরকারের রাজস্ব ঘাটতির একটি বিরাট অংশ বৈদেশিক উৎসসমূহ থেকে মেটানো হতো। ১৯৯০-৯১ অর্থবছর থেকে বাজেট ঘাটতি মেটানোর ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তহবিলের উৎস পরিবর্তিত হতে থাকে। ১৯৮৯-৯০ অর্থবছরের বাজেট ঘাটতির মাত্র ১৫% স্থানীয় উৎস হতে সংগৃহীত তহবিল দ্বারা মেটানো সম্ভব হয় এবং অবশিষ্ট ৮৫% বৈদেশিক উৎসসমূহ থেকে প্রাপ্ত হয়। কিন্তু বৈদেশিক তহবিল প্রাপ্তিতে শিথিলতার কারণে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে বাজেট ঘাটতি পূরণে সচেষ্ট হওয়ায় ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরের বাজেটে স্থানীয় তহবিলের অংশ দাঁড়ায় মোট বাজেট বরাদ্দের ৪৭%। পর্যায়ক্রমে বৈদেশিক সাহায্য ও অনুদানপ্রাপ্তি আরও হ্রাস পেতে থাকায় স্থানীয় তহবিলের ওপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। অভ্যন্তরীণ সূত্র থেকে তহবিল সংগ্রহের ওপর জোর দেওয়ায় বাজেটীয় কর্মসূচিসমূহ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চলমান অনিশ্চয়তা উল্লেখযোগ্য পরিমাণে হ্রাস পায়। তবে, এর ফলে অভ্যন্তরীণ সুদের হারও বৃদ্ধি পায়। তবে সামগ্রিক আর্থনীতিক অবস্থা সুচারুরূপে ব্যবস্থাপনা করতে ব্যর্থ হলে রাজস্ব কার্যক্রমের স্থিতিশীলতা নষ্ট হবে এবং উচ্চহার সুদের বোঝাও বাড়বে।

রাজস্ব ও আর্থিক উভয়খাতের ব্যাপক সংস্কারের মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহের ব্যাপক প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। রাজস্ব ব্যয়ের অংশে সরকার মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দারিদ্র্য দূরীকরণের ওপর সবিশেষ গুরুত্ব আরোপ করছে। শিক্ষার মান ও আওতা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা সেবাসমূহের মানবৃদ্ধির ওপর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে সামাজিক নিরাপত্তা বৃদ্ধির কর্মসূচিও সরকার হাতে নিয়েছে। এজন্য সাম্প্রতিক বাজেটসমূহে উক্ত খাতের জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। সরকারের আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার মাধ্যমে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে রাজস্বনীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া পরিচালিত হচ্ছে। এজন্য রাজস্ব বাস্তবায়নকে আধুনিক ও সময়োপযোগী করার জন্য মধ্যম মেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোর বাজেট প্রণয়নপূর্বক তা বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এটাকে মধ্যমেয়াদি বাজেটারি ফ্রেমওয়ার্ক (MTBF) বলা হয়। সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে শক্তিশালীকরণের কর্মসূচির অংশ হিসেবে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ৫ বছর মেয়াদি এ ধরনের একটা প্রকল্পও বর্তমানে বাস্তবায়নাধীন। এটা বাস্তবায়িত হলে সরকারের রাজস্ব নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে এবং রাজস্ব ব্যবস্থাও ব্যাপক উন্নতি হবে বলে আশা করা যায়। ইতোমধ্যে সরকার করের আওতা বৃদ্ধি, আদায় পদ্ধতি জোরদারকরণ ও নতুন নতুন উৎস নির্ণয়পূর্বক করের পরিমাণ বৃদ্ধিতে উল্রেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এর প্রতিফল হিসেবে মোট রাজস্ব/জিডিপি অনুপাত ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে ৮.৪৭ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০০৯-১০ অর্থবছরে ১১.৫ শতাংশে দাঁড়ায়। কর বহির্ভূত রাজস্ব ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে জিডিপির শতকরা হার হিসেবে ১.৮০ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০০৯-১০ অর্থবছরে ২.২০ শতাংশে দাঁড়ায়। এমতাবস্থায় সরকারের বাষিক উন্নয়ন কর্মসূচি উত্তোরত্তর বৃদ্ধি সত্ত্বেও বাজেট ভরসাম্য রক্ষায় ও ঘাটতি অর্থায়নে ভারসাম্য বজায় থাকে। লক্ষ্যণীয় যে ২০১০ সাল পর্যন্ত বিগত দশকে একমাত্র ২০০৮ অর্থবছর ব্যতীত সার্বিক বাজেট ঘাটতি জিডিপির শতকরা ৫ ভাগের নিচে থাকে।

বর্তমানে সরকারি ঋণদায়ও (debt obligation) সহনীয় পর্যায়ে রয়েছে। বৈশ্বিক বিভিন্ন পরিবর্তনজনিত কারণে বর্তমানে বৈশ্বিক উৎস হতে ঋণ ও অনুদান প্রাপ্তি ক্রমান্বয়ে হ্রাস পাচ্ছে। তাই বাজেট ঘাটতিপূরণে বৈদেশিক ঋণের পাশাপাশি সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সম্পদ সংগ্রহের জন্য নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। ফলে ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে যেখানে বৈদেশিক উৎস হতে ঘাটতি অর্থায়নের পরিমাণ ছিল জিডিপির শতকরা ২.৫ ভাগ তা ক্রমান্বয়ে হ্রাস পেয়ে ২০০৯-১০ অর্থবছরে শতকরা ২.০ ভাগে নেমে এসেছে এবং একই সময়ে অর্থায়নের পরিমাণ শতকরা ১.৯ ভাগ হতে বৃদ্ধি পেয়ে ২.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এটাকে আমাদের রাজস্ব ব্যবস্থপনার একটা ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচনা করা যায়।  [সৈয়দ আহমেদ খান এবং এ সামাদ সরকার]