রাগপ্রধান গান


রাগপ্রধান গান  বাংলা গানে রাগের ব্যবহার প্রাচীনকাল থেকেই চলে আসছে। এর প্রমাণ পাওয়া যায় খ্রিস্টীয় দশম-একাদশ শতকে রচিত চর্যাগীতির বিভিন্ন পদে। যেমন, পটমঞ্জরী রাগে রচিত ঢেণ্ঢনপার একটি পদ: ‘টালত মোর ঘর নাহি পড়বেসী। হাড়ীত ভাত নাহি নিতি আবেশী\’ পরবর্তীকালে বাংলা গানের প্রায় প্রতিটি পর্যায়েই পদকর্তাগণ তাঁদের রচনায় রাগের উলে­খ করেছেন। জয়দেবের  গীতগোবিন্দ থেকে শুরু করে পদাবলী কীর্তন, মঙ্গলগীতি,  শ্যামাসঙ্গীত, টপ্পা,  ব্রহ্মসঙ্গীতরবীন্দ্রসঙ্গীত প্রভৃতি সঙ্গীতধারায় বিভিন্ন রাগ-রাগিণীর প্রভাব রয়েছে। তবে উলি­খিত সঙ্গীতধারাসমূহে রাগ-রাগিণীর প্রয়োগের চেয়ে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য পরিস্ফুটনের প্রয়াসই প্রাধান্য পেয়েছে। বাংলা রাগপ্রধান গানের পদ রচনায় ভারতীয় রাগসঙ্গীতের রীতি অনুসৃত হলেও গায়নশৈলীতে  ধ্রুপদখেয়াল প্রভৃতির নিয়ম-কানুন ততটা পালিত হয় না।

বাংলায় হিন্দুস্থানী রাগসঙ্গীত অর্থাৎ ধ্রুপদ, খেয়াল,  টপ্পা ও  ঠুংরি চর্চার সূচনা হয় অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ থেকে। উনিশ ও বিশ শতকে এই ধারা অপেক্ষাকৃত গতিশীল ও প্রাণবন্ত হয়। এ সময় বাংলায় রাগসঙ্গীত চর্চায় যাঁরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তাঁরা হলেন  নিধু গুপ্তকালী মির্জা, রঘুনাথ রায় এবং বিষ্ণুপুর ঘরানার প্রতিষ্ঠাতা রামশঙ্কর ভট্টাচার্য। লক্ষ্ণৌর নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ্র নামও এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি ১৮৫৬ সালে ব্রিটিশ কর্তৃক রাজ্যচ্যুত হয়ে কলকাতার মেটিয়াবুরুজে নির্বাসিত হন। সুদীর্ঘ প্রায় ৩০ বছরের নির্বাসিত জীবনে এই সঙ্গীতজ্ঞ নবাব ধ্রুপদ, খেয়াল, টপ্পা ও ঠুংরি চর্চায় এক বিশাল সঙ্গীত জগৎ গড়ে তোলেন, যার গভীর প্রভাব পড়ে তৎকালীন বাংলার, বিশেষত কলকাতার সঙ্গীতজগতে। এভাবে ভারতীয় রাগসঙ্গীত বাংলা রাগসঙ্গীতের উন্নয়নে সহায়তা করে।

উনিশ ও বিশ শতকে বাংলা রাগসঙ্গীত দ্বারা বাংলা  আধুনিক গান গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন    রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন রাগ-রাগিণীর রীতি-পদ্ধতি সার্থকভাবে বাংলা গানে প্রয়োগ করেন। তিনি বাংলা গানের সনাতন পদ্ধতি ভেঙ্গে নতুন রীতিতে ভাবগীতি, রাগপ্রধান গান, লঘু সঙ্গীত প্রভৃতি রচনা করেন। তাঁর অনুসরণে সমকালীন সঙ্গীতজ্ঞ  দ্বিজেন্দ্রলাল রায়রজনীকান্ত সেনঅতুলপ্রসাদ সেন এবং পরে  কাজী নজরুল ইসলাম রাগরীতি ব্যবহার করে বাংলা গানের উৎকর্ষ সাধন করেন। অতুলপ্রসাদ তাঁর বিভিন্ন গানে রাগগীতি গাওয়ার নানা কলাকৌশল প্রয়োগ করেন। এ বিষয়টি তাঁর গানের সুরে স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হয়েছে।

রাগ-রাগিণীকে প্রাধান্য দিয়ে আধুনিক বাংলা গান রচনা ও গাওয়ার যে রীতি বিশ শতকের তৃতীয় দশকে শুরু হয়েছিল, তাকে আরও সমৃদ্ধ করেন নজরুল ইসলাম। তাঁর হাতেই নানা রাগ-রাগিণীভিত্তিক বাংলা রাগপ্রধান গান এক চমৎকার রূপ লাভ করে। ফলে তৎকালীন বাংলায় রাগপ্রধান বাংলা গান বিপুল জনপ্রিয়তা পায়।

সঙ্গীতজগতে নজরুলের উত্তরসূরী হিসেবে উলে­খযোগ্য ব্যক্তিত্ব হলেন  হিমাংশুকুমার দত্তদিলীপকুমার রায়, রাইচাঁদ বড়াল, কৃষ্ণচন্দ্র দে, সুধীরলাল চক্রবর্তী, অনিল বাগচী,  কমল দাশগুপ্ত, দুর্গা সেন,  চিন্ময় লাহিড়ী প্রমুখ। এঁদের রচিত রাগপ্রধান গানে নজরুলের প্রভাব থাকলেও স্বকীয় অভিনবত্বে তা প্রোজ্জ্বল।

বাংলা রাগপ্রধান গানের ধারা খুব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। তবে রাগপ্রধান গানের আদলে আধুনিক বাংলা গান রচনা আজও অব্যাহত আছে।  [খান মোঃ সাঈদ]