রাখাইন


রাখাইন  বাংলাদেশে বসবাসরত একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠী যারা আঠারো শতকের শেষে আরাকান থেকে বাংলাদেশে এসে উপকূলীয় জেলা কক্সবাজার ও পটুয়াখালীতে বসতি স্থাপন করে। রাখাইনদের হাজার বছরের পুরানো এক সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে। আদি ব্রাহ্মীলিপিতে প্রথম লিখিত আকারে পালি ভাষায় ‘আরাখা’ অর্থাৎ রক্ষ বা রক্ষিতা অথবা রক্ষক শব্দ থেকে রাখাইন শব্দটির উৎপত্তি। আর্য বংশোদ্ভূত প্রকৃতি উপাসক রাখাইনরা প্রাচীনযুগে মগধ রাজ্যে বসবাস করত। উল্লেখিত সময়ে মগধ থেকে রখঙ্গ, রখাইঙ্গপি, আরখঙ্গ, রোসাঙ্গ, রাখাইনপ্রে বা আরাকানে এসে বসবাস শুরু করলে মগধী বা মগ রূপে ইতিহাসে পরিচিতি লাভ করে।

প্রায় তিন হাজার বছর আগে আরাকানে ‘আস্সাং নাগিদ্ধা’ নামক ঋষি আদি শিলালিপিতে লিখেছিলেন ‘আম্মিও  সিলা নেথা নাহ্-গো, প্রে-ওয়া মেন-দাই, চাঙ থিং নাই-মা রাখাইন না-মা বো-য়ে মি-হ্লা-গো আন্নোথা ছাই নিয়া খ-এ রা-দে’। যার অর্থ জাতি ও শীল এই দুইটিকে স্মৃতিসৌধের মত যিনি সার্বক্ষণিক রক্ষা করতে সক্ষম হবেন তিনিই রাখাইন। এটি যিনি যতদিন বজায় রাখতে পারবেন তিনি ততদিন এই বিশেষণে বিশেষিত হবেন।

রাখাইনদের মধ্যে বিশ্বাস যে, সুদূর অতীতে ২৬ জন ব্রাহ্মণ রাজা আরাকান শাসন করেন। রাখাইন রাজা মারিও থেকে মহা সামাদা, ১৭৮৪ সালে পর্যন্ত মোট ২৩৪ জন আরাকান শাসন করেন। এই শাসনকাল ইতিহাসে ধন্যাবতী, বৈশালী, লেম্রু ও ম্রাউ যুগ হিসাবে চিহ্নিত।

আধুনিক পোশাকে রাখাইন তরুণী

আরাকানের ইতিহাস ‘রাজোয়াং’ সূত্র মতে, ১৪৬৪ সালে রাজা চন্দ্র-সূর্য চট্টগ্রাম-আরাকান রাজ্য প্রতিষ্ঠাকালে তাঁর সঙ্গী মগধাগত বৌদ্ধ সৈন্যরা চট্টগ্রাম তথা কক্সবাজার আসেন। আরাকানী রাজা সুল-তৈংগ-চন্দয়স ‘সুরতন’ রাজ্য জয়ে বের হলে ৯৫০ সালে একবার চট্টগ্রামের কুমিরা পর্যন্ত অধিকার করে আরাকানী শব্দ ‘চাই মাতাই কং’ বা ‘চেত্তগৌং’ (আর যুদ্ধ নয়) খোদিত বিজয় স্তম্ভ স্থাপন করেছিলেন। মুগলরা মার্মাদের বসবাস পছন্দ করত না বলে ১৬৬৬ সালে শায়েস্তা খানের সময়ে বাংলাদেশের কক্সবাজার-চট্টগ্রামে ‘মগজমা’ নামে কর বসান।

এ.পি ফিরের (A.P Phyre) বর্ণনাতে লেম্রু যুগের শেষে বার্মার রাজা বো-দ-মাও ওয়ে আরাকান দখল করলে, রাজা মেঙ সোয়ামাউ (জি.ই হার্ভের হিস্টরি অব বার্মা’য় যার নাম নরমিখিলা) বাংলার (গৌড়) স্বাধীন সুলতানের কাছে ১৪০৬ সালে আশ্রয় নেয়। পরে সুলতান জালাল উদ্-দীন মুহাম্মদ শাহ দুই দফায় লক্ষাধিক সৈন্য দিলে মেঙ সোয়ে মাউ ১৪৩০ সালে আরাকান পুনরুদ্ধার করেন। তৎসময়ের কিছু রৌপ্য মুদ্রা এ.পি ফিরে আবিষ্কার করেন। ব্রিটিশ মিউজিয়ামে এইরূপ আরও কয়েকটি মুদ্রা সংরক্ষিত রয়েছে। ইতিপূর্বে আরাকানে সাংকেতিক মুদ্রার প্রচলন ছিল। সেই থেকে আরাকানী রাজারা রাখাইন ও মুসলমানী (ফার্সি) নাম এবং কলেমা মুদ্রায় উৎকীর্ণ করতে থাকে। মেঙ সোয়ে মাউ (মাং চ মোয়ে) ম্রাউক নগরীতে রাজধানী স্থাপন করে ম্রাউ যুগের সূচনা করেন।

মধ্য-আঠারো শতকে আমত্য হারি’র আমন্ত্রণে ১৭৮৪ সালে বর্মী রাজ আরাকান দখল করে। ১৭৯১ সালে ওয়েমোর নেতৃত্বে কক্সবাজার থেকে আরাকান গিয়ে পূর্বের গণহত্যার প্রতিশোধ নিয়ে ফিরে আসে। ১৭৯৬ সালে আরাকানে দেশব্যাপী বিদ্রোহ হয়। এর ফলে অনেক আরাকানী কক্সবাজারে এসে আশ্রয় নেয়। ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স (যার নামানুসারে কক্সবাজার) ১৭৯৯ সালে কক্সবাজারের সুপারিনটেনডেন্ট নিযুক্ত হন। তিনি উদ্বাস্ত্তদের পুনর্বাসনের নীতিমালা প্রণয়ন, স্থান নির্ধারণ ও জমি পত্তনি দেয়ার সময় শের মোস্তফা খান, কালিচরণ, সাদ উদ্দীন প্রভৃতি ভূস্বামীগণ দ্বন্দ্ব শুরু করেন। ১৮১৭ সালে পিচেলের চেষ্টায় কক্সবাজারের সরকারি সম্পত্তি প্রকৃত ব্যবসায়ীদের জন্য করমুক্ত ঘোষণা করেন।

টংক হার’ পরিহিত রাখাইন তরুণী

জুলাই ১৭৯৯ হিরাম কক্স এক রিপোর্টে আগত রাখাইনদের বসতি স্থাপনের সংখ্যা জানিয়েছিলেন ৪০-৫০ হাজারের মত। ১৮০০ থেকে ১৮১৩ সালের ২৯ জানুয়ারি তারিখের রিপোর্ট মতে, ১৪,৪৫১ জনকে পূনর্বাসন করা হয়। কোম্পানি ১৮০০ সালের মে মাসে রাখাইনদের অধিকতর অভিবাসন বন্ধের আদেশনামা জারি করে। ১৭৮৫ সালের তামাদা পালিয়ে গেলে ব্রাহ্মরাজ বোধ পায়া আরাকানকে ব্রহ্মদেশের সাথে অর্ন্তভুক্ত করে প্রায় দুই লক্ষ আরাকানী নারী-পুরুষ হত্যা করে এবং সমসংখ্যক দাস হিসেবে বার্মায় প্রেরণ করে। স্যার ওয়ান্টার হেমিল্টন রামুতে প্রায় লক্ষাধিক আরাকানী শরণার্থী দেখেছিলেন। ইংরেজরা তাদেরকে দ্বিতীয় দফায় কক্সবাজার, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও পটুয়াখালীতে পুর্ণবাসন করেন। এটি ছিল রাখাইনদের বড় ধরণের অভিবাসন। বর্তমানে বাংলাদেশে কক্সবাজারের পৌর এলাকা, খুরুশকুল, চৌফলদন্ডী, রামু, পানের ছড়া, আশকর কাটা, টেকনাফ, খারাংখালী, হ্নীলা, চকরিয়ার হারবাং, মহেশখালীর গোরকঘাটা এবং পটুয়খালীর খেপুপাড়া ও কুয়াকাটায় রাখাইনরা বসবাস করছে।

আরাখা (রাখাইন)রা অরাল ফর্মে কয়েক হাজার বছর পূর্ব মগধে এই ভাষার উদ্ভব ঘটায় বলে ধারণা করা হয়। প্রায় ৬ হাজার বছর আগে নানান্দা পাথরে খোদাই করা শিলালিপিতে প্রথম রাখাইন বর্ণমালার উৎপত্তির দলিল পাওয়া যায়। এই শিলালিপিটি পূর্ব আরাকানে ‘সাঁই থং পাট্টু দগ্রিতে’ সংরক্ষিত রয়েছে। উত্তর ভারতের আদি ব্রাহ্মী লিপি থেকে রাখাইন বর্ণমালার উৎপত্তি। ভাষা তাত্ত্বিকগণের মতে এটি ইন্দু-মঙ্গোলিয়েট ভাষা। মগধিরা আরাকানে এই ভাষা-বর্ণমালা নিয়ে আসলে বর্মীরা এই ভাষা-বর্ণমালার অধিকারী হয়। আরাকানে প্রথম ও দ্বিতীয় ধন্যবতী যুগে, বৈশালী যুগের শুরু এবং শেষের দিকে, লেম্রু যুগে ও ম্রাউ যুগে বর্ণলেখনে সামান্য পরিবর্তন আসে।

কাপড় বুননরত রাখাইন নারী

হাজার বছর ধরে প্রা-ঝে (ঐতিহাসিক নাটক), ওয়াচ্ছার নাচ (শুকুরের নৃত্য) জে-চাববাং (যাত্রাপালা), ও-থো (গল্প), পুংবাং (উপন্যাস), ছড়া, কাব্যিয়া (কবিতা) ও পেং ওয়ে টেং, যার অর্থ ‘ফুল লুকোচুরি খেলা’ (লোক ধাঁধা)র প্রচলন রয়েছে। কক্সবাজারের স্থানীয় জনগণ ও রাখাইনরা একটি নতুন লোক ভাষার উদ্ভব ঘটায়, যা দুই তিনশত বৎসর থেকে চলে আসছে। যেমন ‘তুমি মানু বে খায়েনি?’, ‘মগিমানু মরিয়ে জাং গুলা খাইয়ে’, মুসুমমান মানু মরিয়ে কেলা পাতা দি বেরাইয়ে’, ইত্যাদি প্রায় দেড়শত মুখাশ্রিত লোক কাব্যিয়া (কবিতা) বাংলা বর্ণমালায় মুর্তায়ন, সনাক্তকরণ ও কাব্যানুবাদ হয়েছে। এতে লোক সংগীতও রয়েছে। ১৫৩৮ থেকে ১৭০৩ সালে পর্যন্ত আরাকান রাজসভায় মহাকবি আলাওলসহ প্রভৃতি কবিগণ বাংলা সাহিত্য চর্চা করেন।

পূর্বে রাখাইনরা বলপাতা, তালপাতায় কালি ব্যবহার না করে কাঁটা অথবা লোহার শলাকা দিয়ে লোক কাহিনী, নীতিকথা, যাদুবিদ্যা, চিকিৎসা, ত্রিপিটক, জ্যোতিষবিদ্যা ইত্যাদি লিখে যান। ঐ পাতায় পান্ডুলিপির নাম পিজং। যা বিভিন্ন কিয়াং-এ সংরক্ষিত রয়েছে।

রাখাইন আন্নু-লামুং পাইঞা বা চারু ও কারুকলাকে বারো প্রকারে বিভক্ত করেন। রাখাইনদের মধ্যে শিল্পকলা ও নান্দনিক সংস্কৃতির সুপ্রাচীন ঐতিহ্য রয়েছে। বিশেষত স্থাপত্যকলা, চারু ও কারুকলা, চিত্রকলা, ভাস্কর্য শিল্প, সংগীত, নাট্য ও নৃত্যকলায়। রাখাইনরা বাংলাদেশ, আরাকান, মায়ানমার ও মালেশিয়ায় ধার্ম্মার, উদ্দেশ্য, দাটু ও পেরিবগা জাদিসমূহ নির্মাণ করে। বাংলাদেশে প্রায় আড়াইশত বছরের পুরানো ৩২টি জাদি রয়েছে। এগুলির চূড়ায় একখন্ড পাথর থাকে। যা সমুদ্র পথ নির্দেশ করে। এসব জাদিতে আর্য্য চিহ্ন রয়েছে।

রাখাইন সমাজে প্রচলিত নৃত্যের মধ্যে চি.মি আকাহ্ (প্রদীপ নৃত্য), সিং-দাই আ-কাহ্ (শিশু নৃত্য), পেং-খাও (পুষ্পনৃত্য), রাখাহ্ পেং ইয়াই (রথ নৃত্য), রি-চোয়ে পো-য়ে আ-কাহ্ (জলকেলি নৃত্য), ছাতা নৃত্য, পাখা নৃত্য, রাখাল নৃত্য প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

রাখাইনদের সুর তৈরির বাদ্যযন্ত্রের মধ্যে তাইয় (বেহলা), বাউনজো (বেঞ্জু), চ-উ (মেন্ডলিন) ১২ স্কেলের বাদ্যযন্ত্র। তাছাড়া নে (বাঁশি), পুলুই-প্রাই (ভিন্নধর্মী বাঁশি), পেটেলা (সেক্সোফোন), কোলংমই, ছাইওয়াই, ক্রিওয়াই বা ছে, সাইলোং মউ (১৮টি মউ যুক্ত), হিয়ং (বাঁশি জাতীয়), তুময় এসব ৭ স্কেলের সুরের বাদ্যযন্ত্র। তালের বাদ্য যন্ত্র বুমউয়াই, ছে (মন্দিরা) চেঁ-য়ে (ঢোল), ওঁজে, পেনজাউ প্রভৃতি।

নারী-পুরুষেরা দুই ধরনের শরীরাঙ্কন করে থাকে। ম্যাংন থু-চো-মান্ছি মারা বা উল্কি অাঁকা। যুবা তরুণেরা ঐতিহ্যগতভাবে শরীরের বিভিন্ন অংশে সুঁই দিয়ে ত্বকের নিচে নীল রঙের বৈচিত্রপূর্ণ স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি দুই প্রকারের শরীরাঙ্কন করে থাকে। মাঁন নর-নারীরা সুঁই দিয়ে বাহুর নিম্নাংশে চামড়ার নীচে মন্ত্র পাঠ করে লাল রঙের বিন্দুচিত্র অঙ্কন করে শরীর বন্ধকী বা ব্রত নিয়ে থাকে।

রাখাইনরা অন্তত ছয় প্রকারের সুগন্ধি জাতীয় শেকড় বা কাঠ ঘষে মুখমন্ডলে ও শরীরের বিভিন্ন অংশে নিয়মিত মেখে থাকে। এগুলি হচ্ছে চেনেখা, প্রমিনা, তংচেনগ্রি, চন্দন, ক্যারামা, চেখাম্রাই প্রভৃতি। এসবের মধ্যে তংচেনগ্রি গরম প্রকৃতির। এটি প্রসূতি নারীরা ব্যবহার করে। সব কটিতেই ঔষধি গুণ রয়েছে।

রাখাইন নৃত্য

নারীরা ঐতিহ্যগতভাবে চৌষট্টি প্রকারের খোঁপা বাঁধে। যার নিদর্শন ম্রাউ নগরীর প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন পাথরাংকনে রয়েছে। যা বর্তমানে ক্রিয়াত মহামনিতে সাই থং পাট্টু টগ্রিতে সংরক্ষিত রয়েছে।

মাথায় ও খোপায় ব্যবহূত অলংকার সুইপেংগু (স্বর্ণের ফুলকাটা), গমফ্রি (রাখা স্বর্ণের চিরুনী), কেয়াম্ভি (গোলাকৃতির চিরুণী সেট), চেনজো (ঝুমকা সমেত স্বর্ণ কাটা)। কর্ণের অলংকার চিন্দু নাদ্দাও (ঝুমকা) পেলেই নাদ্দাও (ঝুমকা), রেঞ্জিকেও নেদ্দাও (কর্ণ টিপ)। গলার অলংকার বাঁইয়ে (পাথরের হার), লেন্দু (চিক্), টেঙ্গাচিং (একাধিক স্বর্ণমোহর যুক্ত চেইন), বুঁদ্ধি (মটর মালা), আছাউদী (চেইন), সোয়ে বুদ্ধং (তাবিজ চেইন), ইঞ্জিগ্রো (পুরুষের লকেটযুক্ত চেইন); হাতের অলংকার আফ্ইয়াক্যাং-লাকোও (কাঁকন), পেংলাকো (ব্রাসলেট)। আঙ্গুলের আংটি রেনজি লায়াচোয়ে (পাথরযুক্ত), নোরাইল্যাচয়ে (পেচানো), ক্রিলজওয়ে (ঔষধি), নাওয়ারে-লায়চোয়ে (নবরত্ন)। কোমরে ব্যবহূত অলংকার সোয়াগ্রো (পাথরযুক্ত রূপার কোমর বন্ধনী)। পায়ের অলংকার ক্রিসাং (স্বর্ণ কারু) ইত্যাদি।

পুরুষেরা দায় খায়াও (রঙিন লুঙ্গি), আন্জি (জামা), গং-পাওং (পাগড়ী), কুদং বা কোতাং (৯ হাত লম্বা সেলাই বিহীন রঙিন ধুতি) গাংজি (গেঞ্জি), কো-ডাং (উত্তরীয়), প্রাংখে (কটি), খাকগ্রো (কোমর বন্ধনী), সং (বিয়ের মুকুট) এবং নারীরা আ- থোংখে (৯ হাত লম্বা ৩ স্তর রঙিন সেলাইবিহীন নিম্নাংশের পরিধেয়), থামি (রঙিন থামি), রাংখে (বক্ষ বন্ধনী), আংজি অথবা ভেঃ দে (ব্লাউজ), পাচ্ছু বাইন (রঙিন ওড়না), খাগ্রো বা লাকো বাতালি (কোমর বন্ধনী) পরিধান করে।

রাখাইনদের আবাসগৃহ ৩ প্রকার: ওয়াএঁই (বাঁশের), পিয়াই থাঁও (কাঠের) এবং চিয়াও-গো (পাথরের তৈরি গুহা)। চিয়াও- গো’র এখন ব্যবহার নেই। নিচ তলা খালি রেখে দ্বিতল বিশিষ্ট (মাচাং)। ঘরের অংশের বিভিন্ন নাম রয়েছে। তারমধ্যে প্রথেখেং (অতিথিদের কক্ষ), ২য় প্রথেখেং (কর্তার কক্ষ), ঞং ব্রাং (বারান্দা), ৩য় প্রথেখেং (পুত্রদের কক্ষ), ৪র্থ প্রথেখেং (যুবতী কন্যাদের কক্ষ)। এটি শেষের কক্ষ। এই কক্ষে দুইটি ৬´´-৮´´ ছিদ্র (মুখ) থাকে। যাতে যুবতীরা রাত্রিকালে প্রেমিকের সাথে সংগোপনে কথা বলতে পারে।

রাখাইনরা কৃষি ও মৎস্য শিকার ছাড়াও ব্যবসা-বাণিজ্য, নৌকা নির্মাণ, কারিগর, ব্যবসা, বৃক্ষ কর্তন, তাঁত বুনন ইত্যাদির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। তাছাড়া পেং থিং (স্বর্ণকার), পেং ফে (কামার), পেং পু (কাঠের নক্সাকার), পেং চোয়ে (রঙের নক্শাকার), পেং রে (রাজমিস্ত্রি), পেং সী (চিত্রকর), পেং বো-য়ে (গোলাকৃতি কাঠের নক্সাকার), পেং থে ম (ধাতব মিস্ত্রি) ইত্যাদি পেশায়ও তারা জড়িত।

সামাজিক অনুষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে: ছামাদা (বিবাহ রীতি), সাংগ্রেং (জলকেলি উৎসব), নাই চাই-কূ (বর্ষ বিদায় ও বর্ষবরণ উৎসব), পাইলং পোয়ে (নৌকা বাইচ ও মেলা), চিয়াং-পোয়ে (বলি খেলা ও মেলা), রাঠাহ্ পোয়ে (রথ মেলা), চা-ছো-দ পোয়ে (বয়ান মেলা), নাহ্ থো মাংগালা (কন্যা ও পুত্র শিশুর কর্ণ ছেদন অনুষ্ঠান), লো থোয়ে মাংগালা (চাষ উৎসব), কাও-ছাই-ছাহ্ পোয়ে (নবান্ন উৎসব), মাহ-ইং (ফানুস উড্ডয়ন উৎসব), বর্ষাবরণ উৎসব ইত্যাদি।

প্রকৃতি উপাসক রাখাইনরা তৃতীয় ধন্যাবতী যুগের প্রথম রাজা ছাইদ্যা সুরিয়া (চন্দ্র-সূর্য)র সময়ে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করে। ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে: শ্রামনে মও সাং বা সাম্প্রো পোয়ে (প্রবাজ্য গ্রহণ), আখাগ্রী বা রা-ক্রী (বর্ষ শেষের ৩ দিনের অনুষ্ঠান), কাচ্-চুং নিউ-রী পোয়ে (বৌদ্ধ পূর্ণিমা), চা-পেং পোয়ে (যৌথ বৌদ্ধবাণী পাঠানুষ্ঠান), ওয়া-ছো (বর্ষা সংযম), ওয়া-ঝোয়ে পোই (প্রবারণা পূর্ণিমা), তাচ্ছাও-দাই (জাহাজ ও প্রদীপ ভাসান), কাঠিং পোয়ে (কঠিন চীবর দান), শেষকৃত্য অনুষ্ঠান ইত্যাদি।  [কামরুল হাসান]