রাঁজোয়াড়


NasirkhanBot (আলোচনা) কর্তৃক ০৪:৫২, ৫ মে ২০১৪ পর্যন্ত সংস্করণে (Added Ennglish article link)

(পরিবর্তন) ←পুর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ→ (পরিবর্তন)

রাঁজোয়াড়  জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি থানার নাকরিয়া গ্রামে বসবাসরত বাংলাদেশের অন্যতম ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠী। রাঁজোয়াড়দের মধ্যে ১০টি গোত্র দেখা যায়। গোত্রগুলি হচ্ছে: শাঁক, কড়হড়, কাঁচ, নাগ, চন্দ্র, সূর্য, অগ্নি, কচ্ছপ, ডুমুর এবং মৎস।

রাঁজোয়াড়দের ঘরবাড়ি সাধারণত মাটির দেয়াল ও খড়ের ছাউনি দিয়ে তৈরি এবং তারা রান্নঘর, শোবার ঘর, গোয়াল ঘর, পূজার ঘর এরকম পৃথক পৃথক ঘর বানিয়ে থাকে।

রাঁজোয়াড়রা মূলত কৃষিজীবী। রাঁজোয়াড় নারীপুরুষ উভয়ই কৃষিকাজে অংশগ্রহণ করে। কৃষি কাজের পাশাপাশি তারা সবজি, গবাদিপশু, মাছ প্রভৃতির ব্যবসাও করে।

রাঁজোয়াড়দের পরিবার পিতৃতান্ত্রিক। ছেলে সন্তান সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়। তবে মায়ের নামে যদি কোনো সম্পত্তি থাকে এবং তিনি যদি তা ছেলের নামে লিখে না দেন তাহলে মেয়ে সন্তান সেই সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হয়। রাঁজোয়াড়দের মধ্যে একক ও যৌথ উভয় ধরণের পরিবারই বিদ্যমান। তবে দরিদ্র পরিবারগুলিতে একক পরিবার ব্যবস্থাই বেশি লক্ষ্যণীয়।

রাঁজোয়াড়দের কাছে ছেলে সন্তানই অধিক কাম্য। সন্তান জন্ম সংক্রান্ত নানা আচারের মধ্যে রয়েছে ৯ বা ১৩ দিনের দিন চুল কামানো এবং ঐদিন বাচ্চার নানাবাড়ি থেকে আসা চাল, ডাল ও মুরগি এবং অন্যান্য মশলা দিয়ে বাড়ির সবাইকে এবং সম্ভব হলে আত্মীয় ও প্রতিবেশীদেরকে খাওয়ানো হয়। দাইমাকে চাল, নগদ অর্থ এবং শাড়ি দিতে হয়। দাদু বা মায়ের নামে ছেলের এবং বাবার নামে মেয়ের নাম রাখা হয়। ছেলে হলে ৭ মাসে আর মেয়ে হলে ৬ মাসে মুখে ভাত দেওয়া হয়। একে অন্নপ্রাশন বলে। এ অনুষ্ঠানে পাড়ার লোক ডেকে খাওয়ানো হয়, নাচ-গান করা হয়।

বিভিন্ন অনুষ্ঠানে রাঁজোয়াড় ছেলেরা ধুতি-পাঞ্জাবি এবং মেয়েরা বাঙালি পোশাক পরে। রাঁজোয়াড় মহিলারা বাজু, কোমরের বিছা, আঙ্গুলে ঝুটিয়া, ধান তাবিজ, পায়ের পয়লি বা পায়েল, গলার হাঁসুলি, কানের ফুল, নাকচনা, কানের চুড় প্রভৃতি অলঙ্কার ব্যবহার করে।

রাঁজোয়াড়রা দুর্গাপূজা, কালীপূজা, গোয়ালপূজা, লক্ষ্মীপূজা, নারায়ণপূজা, ডালপূজা ও বিষহরিপূজা করে থাকে। এছাড়া তারা কিছু উৎসব পালন করে যেমন পৌষনা, লাবন, সন্ন্যাসীমেলা প্রভৃতি। পৌষ মাসের শেষে নতুন চালের বিভিন্ন রকম পিঠা বানিয়ে সবাইকে খাওয়ানো হয় এবং চালের গুঁড়া দিয়ে ঘরে ও উঠানে বিভিন্ন রকম আল্পনা অাঁকা হয়। লাবন উৎসবে অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম দিন নতুন চালের গুঁড়া, দুধ, কলা, মিষ্টি দিয়ে মুক্ষিত তৈরি করে আত্মীয় পাড়া-প্রতিবেশীকে খাওয়ানো হয়। এ সময় গীতা পাঠ ও কীর্তন হয়। এছাড়া রাতে আত্মীয় পাড়া-প্রতিবেশীদের ডেকে ৯ রকম তরকারি, নতুন চালের ভাত ও পায়েস রান্না করে খাওয়ানো হয়। সাথে পানীয়ের (হাঁড়িয়া) ব্যবস্থা থাকে।

রাঁজোয়াড়দের মধ্যে স্বগোত্রে বিয়ে হয় না। ছেলে মেয়ে পছন্দ হওয়ার পর যৌতুকের পরিমাণ নির্ধারণ হয়। এরপর আশীর্বাদ এবং বিয়ের তারিখ ঠিক হয়। বিয়ের আগেই যৌতুকের টাকা পরিশোধ করতে হয়। বিয়ের ৩/৫ দিন আগে মেয়েকে এনে ছেলের পাশের কোনো বাড়িতে রাখা হয়। তিথি অনুযায়ী রাতে বিয়ে হয়। ব্রাহ্মণ বিয়ে পড়ান এবং মেয়ের বড় ভাই/মামা/খালু/চাচা মেয়েকে ছেলের হাতে সম্প্রদান করেন। ছেলে বাম হাতের তিন আঙ্গুলের সোনার আংটি ধরে অথবা লোহার খাড়ু দিয়ে সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দেয়। বিয়ের পরদিন বাসীবিয়ে হয় এবং ঐদিন বৌভাত হয়। বিয়ের তৃতীয় দিন পান, সুপারি, পানীয় (হাঁড়িয়া) ও মিষ্টিসহ কনেকে নিয়ে, বর ও বরের ভগ্নিপতি কনের বাবার বাড়ি যায় এবং ৮ দিন সেখানে থাকে। এটাকে অষ্টাহার বলে। অষ্টাহার শেষে সবাই বাড়িতে ফিরে আসে। রাঁজোয়াড়দের মাঝে বহুবিবাহ ও বিধবা বিবাহের প্রচলন নেই। তবে কোনো যুবতী মেয়ের স্বামী মারা গেলে সে কোনো সামাজিক বাধা ছাড়াই বিয়ে করতে পারে।

শারীরিক অসুস্থতার জন্য রাঁজোয়াড়রা ডাক্তার, কবিরাজ, ফকির ও ওঝার কাছে যায়। রাঁজোয়াড় প্রধানকে মন্ডল বলা হয়। বংশানুক্রমিকভাবে মন্ডল নির্বাচিত হয়। যে কোনো সমস্যা বা অপরাধ হলে মন্ডল ও সমাজের অন্যান্যদের ডেকে বিচার করা হয়। মৃত্যু ও বিবাহ এ সকল ক্ষেত্রে মন্ডলের সিদ্ধান্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচিত হয়।

রাঁজোয়াড়রা সাধারণত মৃতদেহ দাহ করে, তবে জ্বালানি কাঠের মূল্যবৃদ্ধির কারণে অনেকেই মাটি দেয়। শ্মশান ঘাটে যারা মৃতদেহ বহন করে তাদের কাঠরিয়া বলে। বড় ছেলে মৃতের মুখাগ্নি করে। দাহ করার পরে হাঁড়িতে করে দেহভস্ম নদীতে বিসর্জন দেয়। মৃত্যুর চতুর্থ দিন থেকে হবিষ্য করা (ফলমূল, নিরামিষ প্রভৃতি ভোজন) শুরু হয় এবং তা ১২ দিন পর্যন্ত চলে। ১৩তম দিনে কারিয়া অনুষ্ঠান হয় এবং এইদিন কাঠরিয়াদের দই, মিষ্টি এবং রাতে মাছ-ভাত খাওয়ানো হয়। ১৪তম দিনে ব্রাহ্মণ দিয়ে শ্রাদ্ধ হয় এবং ১৫তম দিন গ্রামের লোক ও আত্মীয়দের ডেকে মাছ-ভাত খাওয়ানো হয়। কোন মহিলার স্বামী মারা গেলে মৃত ব্যক্তির হাত বা পায়ের আঙ্গুল দিয়ে সিঁথির সিঁদুর তুলে নেওয়া হয়।  [খন্দকার ফাতেমা জোহরা]