রহিম, আবদুর


রহিম, আবদুর (আনু. ১৭৮৫-১৮৫৩)  যুক্তিবাদী চিন্তাবিদ। তিনি আনুমানিক ১৭৮৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে উত্তর ভারতের গোরক্ষপুরে জন্মগ্রহণ করেন। পেশায় তাঁতি হলেও তাঁর পিতা মুসাহিব আলী ফারসি ভাষার প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। তাই তিনি চাইতেন যে, তাঁর ছেলে আরবি ভাষা শিক্ষার সাথে সাথে ফারসি ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করুক। বাল্যকালে রহিম ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে গিয়ে বাম হাতে আঘাত পান। এ দুর্ঘটনা তাঁকে পারিবারিক পেশা গ্রহণ করতে অযোগ্য করে তোলে, ফলে তিনি শিক্ষা চালিয়ে যেতে পারেন। পনেরো বছর বয়সের মধ্যেই তিনি ফারসি ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন এবং শীঘ্রই তিনি আরবি ভাষায়ও দক্ষতা অর্জন করেন। তখন তাঁর পিতা তাঁকে গোরক্ষপুরের নিকটবর্তী তান্ডায় নিয়ে যান এবং তাঁকে আধ্যাত্মিক পথনির্দেশকের অভিভাবকত্বে রেখে আসেন। রহিম সেখানে তিন বছর অবস্থান করেন এবং বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেন।

১৮০৪ সালে উচ্চ শিক্ষার জন্য তিনি লক্ষ্ণৌতে যান। লক্ষ্ণৌর বৈচিত্র্যময় বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশে আবদুর রহিমের মানসিক জগতে পরিবর্তন আসে। তিনি কবিতা লিখতে শুরু করেন। শিয়া ও  সুন্নি সম্প্রদায়ের মধ্যে খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে সংঘটিত ঘন ঘন ধর্মীয় বিবাদ তাঁকে মর্মাহত করে। লক্ষ্ণৌতে এক বছর অতিবাহিত করে তিনি দিল্লিতে চলে আসেন। সেখানে তিনি ঐ সময়কার দুজন নেতৃস্থানীয় ইসলামী চিন্তাবিদ, শাহ আবদুল আজিজ ও তাঁর ভাই মোল্লা রফিউদ্দীনের তত্ত্বাবধানে ইসলামের ধর্মীয় গ্রন্থসমূহ অধ্যয়ন করেন। সেখানে তাঁর সহপাঠী ছিলেন রায়বেরেলীর সৈয়দ আহমদ। দিল্লিতে আবদুর রহিম দর্শনশাস্ত্র ও বিজ্ঞানের ওপর ক্লাসিক্যাল গ্রন্থসমূহও অধ্যয়ন করেন, যেগুলি তখন আরবি ও ফারসি ভাষায় পাওয়া যেত। প্রাচ্যের স্বদেশজাত চিকিৎসায় তিনি কিছুটা দক্ষতা অর্জন করেন।

প্রথম জীবনে আবদুর রহিম ধর্মপ্রাণ মুসলমান ছিলেন এবং শরিয়ার বিধান অনুযায়ী উদ্যমের সাথে ধর্মীয় অনুশাসন কঠোরভাবে পালন করতেন। কিন্তু দিল্লির সর্বসঙ্কীর্ণতামুক্ত পরিবেশে বিভিন্ন ধর্মের পবিত্র গ্রন্থসমূহ পাঠের পর ও দর্শনশাস্ত্রের বিভিন্ন মতের ওপর গবেষণামূলক গ্রন্থসমূহ পাঠের ফলে তাঁর মন সকল রকম ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে মুক্ত হয়। তাঁর পূর্বের ধর্মীয় বিশ্বাস ও কুসংস্কারসমূহ পুরোপুরি ত্যাগ করে তিনি মুক্তচিন্তাবিদ ও যুক্তিবাদী হয়ে ওঠেন। তাঁর প্রচলিত ধর্মমতবিরোধী ধ্যান-ধারণার জন্য তিনি‘দাহরি’ অর্থাৎ জড়বাদী অথবা নাস্তিক বলে পরিচিতি লাভ করেন। আবদুর রহিমের মতে, ঈশ্বর অথবা পরম সত্তার ধারণা ইমামদের (ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ) উদ্ভাবন। তিনি প্রকৃতির আইনে বিশ্বাস করতেন এবং তাঁর মতে, সূর্য সকল সৃষ্টির উৎস।

১৮১০ সালে পঁচিশ বছর বয়সে, আবদুর রহিম কলকাতা চলে আসেন এবং জীবনের অবশিষ্ট সময় সেখানেই অতিবাহিত করেন। কলকাতায় তিনি অনেক স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন, কারণ কসমোপলিটান রাজধানী শহর সব রকম চিন্তাধারার অধিকারী সকল ধরনের লোকজনকে আকৃষ্ট করত এবং ধর্মীয় অনুগামী ও প্রচলিত ধর্মমতের বিরুদ্ধ মতাবলম্বী ব্যক্তিদের জন্য এ শহর ছিল অভয় আশ্রম।

কলকাতায় আসার অব্যবহিত পর আবদুর রহিম ইংরেজি শিখতে শুরু করেন। অল্প কয়েক বছরের মধ্যে তিনি এ ভাষায় এতটা দক্ষতা অর্জন করন যে, জনশিক্ষা  কমিটি  তাঁকে ইংরেজি  ভাষায় লিখিত বিভিন্ন পুস্তক আরবি ও ফারসিতে অনুবাদের কাজে নিয়োজিত করেন। কারণ কলকাতা মাদ্রাসার শিক্ষা কার্যক্রমে ইউরোপীয় বিজ্ঞান প্রবর্তনে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সরকারের নীতি বাস্তবায়নের জন্য এ অনুবাদ গ্রন্থের প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

কলকাতা থাকাকালে আবদুর রহিম বেশ কয়েক বছর টালিগঞ্জে টিপু সুলতানের পুত্র সুলতান শুকরুল্লাহ্র গৃহে অবস্থান করেন এবং তার দু’ছেলেকে শিক্ষা দান করেন। এ গৃহে কবি ও সাহিত্যামোদীরা মাঝেমধ্যে জমায়েত হতেন এবং আবদুর রহিম বিদ্বৎমহলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। তাঁর প্রিয় ছাত্রদের অন্যতম ছিলেন সুপরিচিত প্রাচ্যবিদ্যার পন্ডিত, শিক্ষাবিদ ও সমাজ সংস্কারক ওবায়দুল্লাহ্-এল ওবায়দি।

আবদুর রহিম ১৮১০ সালে মাওলানা ওবায়দির সাথে যৌথভাবে ’মাশরিকুল আনোয়ার’ নামে গিব্সের ইংরেজি কল্পকাহিনী (fables) ফারসি ভাষায় অনুবাদ করেন। ঢাকায় কেন্দ্রীয় পাবলিক গ্রন্থগারে তাঁর আত্মজীবনী আফসানায়ে দিরিন রোজাগার (Afsanye Dereene Rozagar) সংরক্ষিত আছে। তাঁর অন্যান্য প্রকাশনাগুলো হলো-Farhangee Dabistan, Shegarf Bayan Ibrat Toaman, Tarikh-i Hindustan, Karnam-i-Haidari, Pandnama-i-Bahrami এবং একটি উপদেশমূলক ফারসি প্রচারপত্র (booklet)। তিনি অঙ্কশাস্ত্রের কিছু প্রবন্ধ ইংরেজি Encyclopedia Britannica থেকে ফাতিহাতুত তরজমা (Fatihatuttarjama) শিরোনামে একটি আরবি অনুবাদও সম্পন্ন করেন।

তাঁর মৃত্যু ১৮৫৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর। [এ.এফ সালাউদ্দীন আহমেদ]

গ্রন্থপঞ্জি  Alfred Guillaume, Philosophy and Theology in Sir Thomas Arnold and Alfred Guillaume (ed) The Legacy of Islam, Oxford 1931; ABM Habibullah, Samaj, Sangskriti O Itihas, Dhaka, 1974; AF Salahuddin Ahmed, Bangladesh: Tradition and Transformation, Dhaka 1987; Muhammad Abdullah, Paschim Bangey Farsi Sahitya, Dhaka 1994.