রমনা কালী মন্দির


রমনা কালী মন্দির  ঢাকার সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের দক্ষিণ দিকে ২.২২ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল রমনা কালী মন্দির ও আনন্দময়ীর আশ্রম। সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের ভেতর বর্তমান দিঘিটির পাশেই ছিল প্রায় তিন শ’ বছর পূর্বে নির্মিত এই মন্দিরটি যা কালীবাড়ি নামেও পরিচিত। কথিত আছে, শংকরাচার্যের অনুগামী দর্শণার্থী সম্প্রদায় এ কালী মন্দির প্রতিষ্ঠা করে।  প্রায় পাঁচ শ’ বছর পূর্বে বদ্রী নারায়ণের যোশী মঠের সন্ন্যাসী গোপাল গিরি ঢাকায় এসে রমনায় প্রথমে একটি আখড়া স্থাপন করেন। তখন এ আখড়া কাঠঘর নামে অভিহিত হত। পরে (সম্ভবত সতেরো শতকের প্রথম পাদে) এ স্থানেই হরিচরণ গিরি মূল মন্দিরটি নির্মাণ করেন। কালিবাড়ী মন্দিরটি ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমনে বিধ্বস্ত হয়। তারা মন্দির ও আশ্রমটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। মন্দিরের সেবায়তসহ প্রায় এক শ’ সন্ন্যাসী, ভক্ত এবং সেখানে  বসবাসরত সাধারণ মানুষ নিহত হয়। এ সময় কালী মন্দিরের পুরোহিত ছিলেন শ্রীমৎ স্বামী পরমানন্দ গিরি।

রমনা কালী মন্দির

প্রাচীন আখড়ার পাশে হরিচরণ গিরি কর্তৃক নির্মিত মন্দিরটি বাঙালি হিন্দু স্থাপত্য রীতি বহন করলেও তাতে মুসলিম রীতির প্রভাব লক্ষণীয়। মূল মন্দিরটি ছিল দ্বিতল। এর দ্বিতল ছাদের উপর ছিল ১২০ ফুট উঁচু পিরামিড আকৃতির চূড়া। মূল মন্দিরটি চতুষ্কোণাকার,  ছাদ উঁচু এবং বাংলার চৌচালা রীতিকে অনুসরণ করে নির্মিত। নথিপত্র প্রমাণে দেখা যায় যে, ষোল শতকের শেষভাগে বিক্রমপুর ও শ্রীপুরের জমিদার কেদার রায় তাঁর গুরুর জন্য এ মন্দিরটি নির্মাণ করান। মন্দিরের কৌণিক আকৃতির  চূড়ার নিম্নভাগ ছিল ছত্রি ডিজাইন শোভিত। একে একরত্ন মন্দিরের সঙ্গেও তুলনা করা যেতে পারে। মন্দির চত্বরে পুরনো ও নতুন বেশ কয়েকটি সমাধি মন্দিরের কাঠামো ছিল। এই চত্বরে ছিল হরিচরণ ও গোপাল গিরির সমাধি।

কালীবাড়ির মন্দিরের ফটকের সবচেয়ে পুরনো যে আলোকচিত্রটি রয়েছে তা উনিশ শতকের শেষার্ধে তোলা। তখন মন্দিরটি পুরনো ইটের দেয়ালে ঘেরা ছিল। ভেতরে প্রবেশের জন্য দক্ষিণ দিকে একটি নতুন ফটক নির্মাণ করা হয়। অভ্যন্তরভাগে বামদিকে ছিল একটি চতুষ্কোণ ভিত্তির ধ্বংসাবশেষ। এর কেন্দ্রে ছিল একটি বেদী। এখানেই প্রাচীন মন্দিরটি অবস্থিত ছিল।

প্রাচীর ঘেরা মন্দিরে একটি সুদৃশ্য কাঠের সিংহাসনে স্থাপিত ছিল ভদ্রকালীর মূর্তি। এই মূর্তির ডানদিকে ছিল ভাওয়ালের কালী মূর্তি। মন্দিরের উত্তর-পূর্ব ও পশ্চিমে ছিল পূজারী, সেবায়েত ও ভক্তদের থাকার ঘর। পাশে একটি শিব মন্দিরও ছিল। আরও ছিল একটি নাট মন্দির ও সিংহ দরওয়াজা।

শ্রী মা আনন্দময়ী আশ্রম

কথিত আছে, কালীবাড়ির সামনের দিঘিটি খনন করান ভাওয়ালের রাণী বিলাসমণি। তবে ইংরেজ আমলের নথিপত্রে দিঘিটি ইংরেজ মেজিস্ট্রেট ড’স খনন করান বলে উল্লেখ আছে। সম্ভবত ভাওয়ালের রাণী দিঘিটির সংস্কার করান। বর্তমানে এই দিঘিটিই রমনা কালী মন্দিরের স্মৃতি ধারণ করে আছে। রমনা কালী মন্দিরের উত্তর পাশে ছিল আনন্দময়ী আশ্রম। আনন্দময়ী ছিলেন একজন সন্ন্যাসিনী যিনি ঢাকার নবাবের শাহবাগ বাগানের তত্ত্বাবধায়ক রমনীমোহন চক্রবর্তীর স্ত্রী। মা আনন্দময়ী আধ্যাত্মিক শক্তির ধারক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন এবং সাধিকা হিসেবে পূজিত হন। তাঁর ভক্তরা রমনা ও সিদ্ধেশ্বরী কালীবাড়িতে দুটি আশ্রম তৈরি করে দেন। আনন্দময়ী আশ্রমের প্রবেশদ্বার ছিল পূর্বদিকে। পশ্চিম দিকে ছিল একটি নাট মন্দির। এর উত্তর দিকের একটি কক্ষে সংরক্ষিত ছিল মা আনন্দময়ীর পাদপদ্ম। মন্দিরের বেদীর উপর স্থাপিত ছিল বিষ্ণু ও অন্নপূর্ণা বিগ্রহ। কালীমন্দির প্রাঙ্গণে সন্ন্যাসী ভক্ত ছাড়াও সাধারণ কর্মজীবি অনেকেই তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে বাস করতেন এবং মন্দির ও আশ্রমের অনুষ্ঠানাদিতে অংশ নিতেন।

বর্তমানে এখানে নতুন করে নির্মিত হয়েছে শ্রী শ্রী কালী মন্দির ও শ্রী মা আনন্দময়ী আশ্রম। মন্দিরের প্রধান ফটক দিঘির উত্তর-পূর্ব পাশে অবস্থিত এবং প্রধান ফটকের বাইরে রয়েছে ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞে শহীদদের তালিকা সম্বলিত একটি স্মৃতিফলক। প্রধান ফটকের পরেই রয়েছে আরও কয়েকটি মন্দির, যেমন শ্রী শ্রী দুর্গা মন্দির, শ্রী শ্রী রাধাগোবিন্দ মন্দির, শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী মন্দির (নির্মাণাধীন), শ্রী শ্রী আনন্দময়ী মন্দির আশ্রম (নির্মাণাধীন), শ্রী শ্রী হরিচাঁদ মন্দির (নির্মাণাধীন) এবং দুটি শিবের মূর্তি। [ফজিলাতুন নেছা]

গ্রন্থপঞ্জি Ahmad Hasan Dani, Dhaka A Record of its Changing Fortunes, Dhaka , 2009; রমনা কালী মন্দির ও মা আনন্দময়ী আশ্রম ধ্বংস ও হত্যাযজ্ঞ গণতদন্ত কমিশনের প্রাথমিক রিপোর্ট, ২০০০।