যৌন কর্মী


যৌনকর্মী  স্বাধীনভাবে জীবিকা বেছে নেওয়ার সুযোগে বাংলাদেশে যারা আভিধানিক অর্থে গণিকা তারা আনুষ্ঠানিকভাবে পতিতা বা নটি নামে অভিহিত না হয়ে পেশাজীবী যৌনকর্মী (পেযৌক) হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে। প্রাচীন ভারতে পেযৌকদের অস্তিত্ব ছিল এবং তাদের প্রতি হিন্দুসমাজের মনোভাব প্রতিফলিত হয়েছে খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ সনের কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে। এ গ্রন্থের একটি অধ্যায়ে পেশাগতভাবে যৌনকর্ম কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হবে তা আলোচিত হয়েছে। এই সূত্র অনুযায়ী একজন স্বীকৃত পেযৌক-এর বার্ষিক বেতন ছিল ১,০০০ ‘পণ’ এবং একজন প্রতিবন্ধী পেযৌক-এর তার অর্ধেক। মৃত্যু বা অন্যকোন কারণে এদের অনুপস্থিতি ঘটলে এদের কন্যা, ভগ্নী কিংবা মাতাদের শূন্যস্থান পূরণ করতে হতো। এই জীবিকা সরকারিভাবে স্বীকৃত হলেও এটি সম্মানজনক ছিল না। মহাভারতে উল্লেখ আছে যে, একজন বেশ্যা ভাল প্রকৃতির হলে উচ্চতর জীবনে পুনর্জন্ম লাভ করতে পারে। এই জীবিকা সম্বন্ধে বৌদ্ধ ধর্মেরও একই মত।

প্রাচীনকালে নারীর নৃত্য পরিবেশনাও পুরুষদের যৌনসেবার একটি অংশ ছিল। এ শ্রেণির নারীরা ছিল নটিনী, অর্থাৎ নর্তকী, গণিকা, পতিতা। ভারতের কোন কোন শ্রেণি ও আদিবাসীদের মধ্যে ঐতিহ্যগতভাবে পেযৌক জীবিকার রেওয়াজ ছিল। বেদে নারীরা পতিতা বৃত্তি করতো। এই গোষ্ঠীর পুরুষদের স্ত্রীর সন্ধান করতে হতো অন্য গোষ্ঠীতে। তবে বর্তমান বাংলাদেশে বেদেদের ক্ষেত্রে তেমনটি মনে করা হয় না। এখানে তাদের মধ্যে অনেকেই ইসলাম ধর্মাবলম্বী। কোলহাটিগণ ও বোম্বের যাযাবর কসরতবাজগণ তাদের সম্প্রদায়ের নারীদের বিয়ে করতে কিংবা পেযৌক হতে সম্মতি দিত। ভারতের অপরাধ সংঘটনকারী শ্রেণি হার্ণি ও মাং গারুদা পেশাজীবী যৌনকর্মের সাথে জড়িত ছিল এবং মক্কেলদের সর্বস্ব কেড়ে নেওয়ার ব্যাপারে তাদের কুখ্যাতি ছিল।

ভারতে পেযৌক ছিল অতি বিকশিত এক কলাবিদ্যা (দৃষ্টান্ত বাৎস্যায়নের কামসূত্র), এবং ভারতের অধিকাংশ শহরেই এ ব্যবসায় ছিল অত্যন্ত সুসংহত। ২০০-৪০০ খ্রিস্টাব্দে এর প্রবর্তন হয় এবং এতে ভোগসুখের নানা নীতিবাক্য আছে যেগুলিকে দেবোদ্ভূত মনে করা হয়। তবে সামাজিক জীবনে বিবাহ বিধান ও পারিবারিক বন্ধন গোষ্ঠী পর্যায়ে নারীর যৌনসম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করত।

রাষ্ট্র গণিকালয়ে পেযৌকদের যৌনকর্ম নিয়ন্ত্রণ-লক্ষ্যে তাদের নাম নিবন্ধন করে এবং তাদেরকে সুনির্দিষ্ট (নিষিদ্ধ) এলাকায় বসবাসে সীমাবদ্ধ রাখে। এসব বসতি স্থল, সাধারণত নটি পাড়া বা বেশ্যা পাড়া নামে পরিচিত। যৌনকর্মীকে নিবন্ধিত হবার আগে গণ লেখ্য-প্রমাণিকের (নোটারি পাবলিক) মাধ্যমে প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট হলফনামা (এফিডেবিট) দিয়ে অনুমতিপত্র নিতে হয়। এই হলফনামায় তাকে ঘোষণা করতে হয় যে, তার ভরণপোষণের অন্যকোন ব্যবস্থা না থাকায় এবং তাকে সাহায্য করার কেউ না থাকায় সে স্বেচ্ছায় এই জীবিকা বেছে নিয়েছে এবং এই নির্বাচনে কোন মহল হতে তার ওপর কোন প্রভাব বিস্তার বা চাপ সৃষ্টি করা হয়নি। তবে ভাসমান পেযৌকগণ অনিবন্ধিত থাকায় আনুষ্ঠানিক সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে। তাদের গতিবিধি কোন গণিকালয়ে বা নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে না।

গ্রামীণ এলাকার চেয়ে শহর এলাকায় পেযৌক জীবিকা স্পষ্টতর। উনিশ শতকের পূর্ববাংলায়, বিশেষ করে নদীপাড়ের শহর ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে, যথেষ্ট মাত্রায় পেশাজীবী যৌনকর্মের প্রচলন ছিল। বাংলাদেশে পেযৌক-এর সংখ্যা প্রায় ১,০০,০০০। তারা গণিকালয়ে, সমৃদ্ধ এলাকায় ভাড়াবাড়িতে, অতিথিশালায় এবং মেসে অবস্থান করে। অনেকে স্বাধীনভাবে ভাসমান পেযৌক হিসেবে কাজ করে। পতিতালয়ে অবস্থানকারী অনুমতিপ্রাপ্ত পেযৌকগণ পেশাদার হিসেবে চিহ্নিত। ভাসমান পেযৌকগণের ঘরে ফেরার সুযোগ থাকে, কিন্তুু পতিতালয়-ভিত্তিক পেযৌকগণের পেশাদার হিসেবে নিবন্ধনকৃত হওয়ার পর আর ঘরে ফেরা সহজ হয় না। প্রায়ই সুসংগঠিত সংঘসমূহ বেআইনিভাবে বাইরে, বিশেষত ভারত, পাকিস্তান এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে নারী ও শিশু পাচার করে। সেখানে তারা গৃহ পরিচারিকা ও যৌন সেবিকা হিসেবে কাজ করে।

পেযৌকদের যৌনবাহী অসুখে আক্রান্ত হবার প্রবণতা আছে। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বাংলাদেশের পেযৌকদের এক-চতুর্থাংশই গনোরিয়া বা ক্ল্যামিডিয়া রোগে ভুগছে। তাছাড়া বাংলাদেশে সিফিলিসের হারও বেশি। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের ১৯৯৭ সালের এইডস সংক্রান্ত কৌশলগত প্রকল্প প্রতিবেদনে দেখা যায়, জরিপ করা ৯৮৪ জন পেযৌক-এর মধ্যে ৫৪%-এর বর্তমানে বা পূর্বে সিফিলিস আছে বা ছিল। ১৯৮৯ সালে প্রাতিষ্ঠানিক ও ভাসমান পেযৌকদের যথাক্রমে ৩৯% ও ৫৬%-এরই এই অসুখ ছিল। যৌনবাহী রোগ এইচআইভি এবং এইডস এর এজেন্ট হিসেবে এদের টার্গেট গ্রুপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

পেযৌক পেশার ব্যাপারে বাংলাদেশ সংবিধানের বৈরিভাব সুস্পষ্ট। বাংলাদেশে পেযৌকদের পেশা সামাজিকভাবে সবচেয়ে ঘৃণ্য বলে বিবেচিত। প্রথাগতভাবে, কোন পেযৌক-এর মৃত্যুতে কেবল তার সহকর্মীই তার দেহ স্পর্শ করতে পারে। তাকে কোন সাধারণ সার্বজনীন গোরস্তানে দাফন করা সামাজিকভাবে নিষিদ্ধ। এসব বিধিনিষেধ সত্ত্বেও বাংলাদেশে প্রতিদিন পেযৌকদের সংখ্যা বেড়ে চলেছে। এই পেশা গ্রহণের প্রধান কারণ দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অবিবাহিতা তরুণীদের স্বল্প বেতনের চাকরির জন্য শহরমুখে ক্রমবর্ধমান অভিবাসন এবং পারিবারিক বিপর্যয়। পেযৌকদের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ পল্লীর কৃষিশ্রমিক, ক্ষুদ্র কৃষক বা মৎস্যজীবী পরিবার থেকে আসে এবং বাকি সবাই আসে ক্ষুদ্র আয়ভুক্ত রিকশা বা ঠেলাগাড়ি চালক ও মাঝি পরিবার থেকে। তবে বর্তমানে স্বচ্ছল পরিবারের মেয়েদেরও এ পেশায় দেখা যায়।

উনিশ শতকে পেযৌক পেশার বিরুদ্ধে এক বিশ্বব্যাপী আন্দোলন গড়ে ওঠে। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত পেশাজীবী যৌনকর্ম অবসানকল্পে এক আন্তর্জাতিক আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য ১৮৬৯ সালে ইংল্যান্ডে এক প্রচারাভিযান শুরু হয়েছিল। মধ্য-বিশ শতক হতে ইসলামপন্থীরা পেযৌক উৎপাটনের জন্য মাঝে-মধ্যে উদ্যোগ আরম্ভ করলেও তা তেমন সাফল্য অর্জন করেনি। বর্তমানে বাংলাদেশে মহিলাদের সংস্থাসমূহ পতিতালয়-ভিত্তিক পেযৌকদের উচ্ছেদের চেষ্টা চালাচ্ছে, তবে তার আগে এদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থার জন্য তারা দাবি জানাচ্ছে।  [কে.এম.এ আজিজ]