যৌতুক


যৌতুক  কোনো মেয়ের বিয়েতে বাবা-মা, আত্মীয়স্বজন এমনকি অনাত্মীয় অতিথি অভ্যাগতরা যেসব উপহার দেন তাকেই বলে যৌতুক। কাজেই যৌতুক হলো ঐ উপহার যা মেয়েকে তার বিয়েতে স্বজন-পরিজন ও অনাত্মীয় অতিথিরা সাধারণত স্বেচ্ছায় দিয়ে থাকে যাতে করে সে তার স্বামীর বাড়িতে এগুলো নিজের ইচ্ছামত তার সুবিধার্থে ও মঙ্গলের জন্য ব্যবহার করতে পারে। হিন্দু আইনে যৌতুককে নারীর সম্পত্তির (স্ত্রীধন) অন্যতম উৎস বলে উল্লেখ করা আছে, যে সম্পত্তি কোনো নারী তার স্বামীর সম্মতি ব্যতিরেকে হস্তান্তরের নিরঙ্কুশ অধিকার রাখেন।

হিন্দু সমাজে নারীরা পুরুষ আত্মীয়ের কাছ থেকে পুরুষ উত্তরাধিকারীদের সঙ্গে যুগপৎ সম্পত্তি লাভ করতে পারত না বিধায় স্মরণাতীত কাল থেকে সমাজে যৌতুক দেয়ার প্রচলন গড়ে উঠে। কিন্তু কালক্রমে যৌতুক বিয়ের পণ হিসেবে কনের বাবা-মা বা অভিভাবকের কাছ থেকে বর ও তার স্বজনদের নগদ অর্থ বা সামগ্রী কিংবা উভয়বিধ আকারে সম্পত্তি আদায়ের এক গুরুভার ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হয় এবং প্রথমে তা হিন্দু উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত সমাজে গড়ে উঠে। উপনিবেশিক আমলে ক্রমবর্ধমান যৌতুক সমস্যার রাশ টেনে ধরার বা যৌতুক নিরুৎসাহিত করার কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয় নি। তবে ব্যতিক্রম শুধু এই যে, এ সময় সম্পত্তিতে হিন্দু নারীর অধিকার আইন ১৯৩৭ পাশ করা হয়েছিল। সেই আইনে একজন হিন্দু বিধবাকে তার মৃত স্বামীর সম্পত্তি পুত্র সন্তান যতটুকু পাবে তার সমপরিমাণ অংশ পাওয়ার অধিকার দেওয়া হয়েছিল। তবে সে অধিকারও ছিল সীমিত এবং তা নিরঙ্কুশ কোনো অধিকার ছিল না। অবশ্য ভারতে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের অবসানের পর স্বাধীন দেশে হিন্দু উত্তরাধিকার আইন ১৯৫৭-তে সনাতন উত্তরাধিকার ব্যবস্থা বাতিল করে দেওয়া হয় এবং তখন হিন্দু সমাজে মৃত ব্যক্তির পুত্র ও কন্যারা পিতা বা মাতার সম্পত্তির সমান অংশ পাওয়ার অধিকার রাখে। কিন্তু এমন বিধান থাকা সত্ত্বেও ভারতে যৌতুক প্রথার অভিশাপ তিরোহিত হয় নি। সে কারণে ভারত সরকার বিবাহের পণ হিসেবে বিয়ের আগে বা পরে কিংবা বিয়ের সময় যৌতুক দাবি করা বা গ্রহণ করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ ঘোষণা করে যৌতুক নিষিদ্ধকরণ আইন ১৯৬১ বিধিবদ্ধ করতে বাধ্য হন।

যৌতুক প্রথার অভিশাপ বাংলাদেশের হিন্দু ও মুসলিম উভয় সমাজে এতটাই সংক্রমিত হয়েছে যে তা উচ্চ ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে দারিদ্রের সর্বনিম্ন স্তর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। তাই বাংলাদেশে এই সামাজিক সমস্যার রাশ টেনে ধরার জন্য যৌতুক নিষিদ্ধকরণ আইন ১৯৮০ বিধিবদ্ধ করা হয়, যা ভারতের ১৯৬১ সালের যৌতুক নিষিদ্ধকরণ আইন দ্বারা প্রভূতরূপে প্রভাবিত।

যৌতুক নিষিদ্ধকরণ আইন, ১৯৮০-তে যৌতুকের সংজ্ঞা এভাবে দেয়া হয়েছে যে, যৌতুক হলো বিবাহের এক পক্ষের বা বিবাহের যেকোন এক পক্ষের মাতা-পিতা কিংবা অপর কোনো ব্যক্তি কর্তৃক বিবাহের অপর পক্ষ বা অন্য যেকোন ব্যক্তিকে বিবাহের সময় কিংবা বিবাহের আগে বা পরের যেকোন সময় উক্ত পক্ষগুলির বিবাহের উপঢৌকন হিসেবে প্রত্যক্ষরূপে বা পরোক্ষভাবে প্রদত্ত কিংবা দেয়া হবে বলে স্বীকৃত যেকোন সম্পত্তি বা সম্পত্তির মূল্যবান নিদর্শন পত্র; তবে মুসলিম ব্যক্তি আইন শরীয়াহ যেখানে প্রযোজ্য তেমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে দেয়া মোহর এই যৌতুকের মধ্যে পড়বে না। আইনে বিয়ের সময় বিবাহের পক্ষ বাদে অপর কোনো ব্যক্তির দেয়া অনধিক পাচঁশত টাকা মূল্যের যেকোন সামগ্রীকে যৌতুকের সংজ্ঞার আওতার বাইরে রাখা হয়েছে।

আইনে যৌতুক গ্রহণ বা প্রদানকে শাস্তিযোগ্য করা হয়েছে যার জন্য ন্যূনতম এক বছর ও সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের জেল কিংবা জরিমানা হতে পারে অথবা উভয়বিধ শাস্তি দেয়া যেতে পারে। আইনে যৌতুক দেয়া বা নেয়ার জন্য যে সাজার ব্যবস্থা রয়েছে যৌতুক দাবি করার জন্যও সেই একই সাজার বিধান রাখা হয়েছে।

১৯৬১ সালের ভারতীয় আইনটির ২নং অনুচ্ছেদে বিবাহের সময় নগদ অর্থ, অলঙ্কার, পোশাক বা অন্য কোনো জিনিসের আকারে প্রদত্ত উপহার কেউ বিবাহের শর্ত হিসেবে না দিয়ে থাকলে সেগুলিকে যৌতুকের সংজ্ঞার বাইরে রাখা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের ১৯৮০ সালের আইনে বিবাহের পক্ষ ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তির দেওয়া অনধিক পাঁচশত টাকা মূল্যের উপহারকে যৌতুকের বাইরে স্থান দেওয়া হয়েছে। একইভাবে ১৯৬১ সালের ভারতীয় আইনে যৌতুক নেওয়া বা দেওয়া বা দাবি করার শাস্তি সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদন্ড বা পাঁচ হাজার রূপী জরিমানা কিংবা উভয়বিধ সাজা। অর্থাৎ ভারতীয় আইনে সাজার মাত্রা বাংলাদেশের ১৯৮০ সালের আইনে বর্ণিত সাজার চাইতে অনেক কম।

যৌতুক নিষিদ্ধকরণ আইন, ১৯৮০ এদেশে যৌতুকের অভিশাপ রোধ করতে ব্যর্থ হয়। ফলে যৌতুক দাবির পরিণতিতে কনের উপর নির্যাতন নেমে আসে। তারা শারীরিকভাবে নিগৃহীত হয়। এমনকি খুনও হয়ে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার যৌতুক দাবিকে কেন্দ্র করে কোনো মহিলা বা শিশুকে সামান্য বা গুরুতর জখম করা, হত্যার চেষ্টা করা বা হত্যা করার জন্য শাস্তির বিধান করে নারী ও শিশু নির্যাতন (বিশেষ বিধান) আইন ১৯৯৫ জারী করতে বাধ্য হয়। কিন্তু সেই আইনটিও এই অভিশাপ মোকাবিলায় যথেষ্ট প্রমাণিত না হওয়ায় আইনটি রহিত করে ২০০০ সালে বলবৎ করা হয় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (নির্যাতনমূলক শাস্তি) আইন ২০০০। আইনটিও ২০০৩ সালে সংশোধন করা হয়। সংশোধিত আইনের ১১ অনুচ্ছেদে যৌতুকের দাবি নিয়ে হত্যার দায়ে মৃত্যুদন্ড, হত্যার চেষ্টা চালানোর জন্য যাবজ্জীবন কারাদন্ড, মারাত্মক জখম করার দায়ে ৫ থেকে ১২ বছরের কারাদন্ড এবং সাধারণ বা মামুলী জখম করার দায়ে ১ থেকে ৩ বছরের কারাদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে।

যৌতুক প্রথার অভিশাপ মোকাবিলায় সরকার এতসব কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার পরও যৌতুক প্রতিহত করা সম্ভব হয়নি; বরং তা বেড়েই চলছে এবং এই অভিশাপের যারা শিকার তাদের অর্থনৈতিক কাঠামোকে কুঁড়ে কুঁড়ে ধ্বংস করে দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, যৌতুকের দাবি মেটাতে না পেরে নিরপরাধ গৃহবঁধুরা শারীরিক নির্যাতন ভোগ করছে। কখনও বা মারাত্মক জখমও হচ্ছে, এমনকি খুনও হয়ে যাচ্ছে।  [কাজী এবাদুল হক]