যুদ্ধশিশু


যিুদ্ধশিশু  ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধাবস্থার সুযোগে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগী দুর্বৃত্তদের দ্বারা ধর্ষিতা হওয়ার পর বাঙালি মহিলারা যেসকল শিশুর জন্ম দেন, তাদের যুদ্ধশিশুরূপে চিহ্নিত করা হয়েছে। এদের ‘অবাঞ্ছিত শিশু’, ‘শত্রু সন্তান’, ‘অবৈধ সন্তান’, এমনকি আরও অবজ্ঞাভরে বলা হতো ‘জারজ সন্তান’। এদের জন্মদাত্রী মায়েরা ‘ধর্ষিতা রমণী’, ‘অপমানিতা রমণী’, ‘দুঃস্থ মহিলা’, ‘ধর্ষণের শিকার’, ‘সৈন্যদের নিপীড়নের শিকার’, ‘ক্ষতিগ্রস্ত মহিলা’ এবং ‘ভাগ্যবিড়ম্বিতা’ এমন বিভিন্ন অভিধায় অভিহিত হতেন। সমাজে কলঙ্কের ভয়ে অনেক জন্মদাত্রী মা আত্মহত্যা করেন, অনেকে অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় গর্ভপাত ঘটাতে কিংবা সন্তান জন্ম দিতে অন্যত্র চলে যান এবং অনেক শিশুর জন্ম হয় মায়ের নিজ বাড়িতে। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, কতজন মহিলা এহেন দুর্গতির শিকার হন সে বিষয়ে সঠিক বা মোটামুটি গ্রহণযোগ্য কোনো উপাত্ত পাওয়া যায় নি। এ পরিস্থিতিতে যুদ্ধশিশুদের সংখ্যা ও ভাগ্য সম্পর্কে অনুমান নির্ভর হওয়া ছাড়া উপায় নেই। সরকারি দপ্তর ও এনজিও-র রেকর্ডপত্রে এবং বিদেশী মিশন ও মিশনারি সংস্থাগুলোর নথিপত্রে যুদ্ধশিশুদের সম্পর্কে সীমিত আকারে হলেও বেশকিছু দলিলপত্র পাওয়া যায়।

উদাহরণ হিসেবে একটি ইতালীয় চিকিৎসক দলের সমীক্ষার উল্লেখ করা যায়। এতে যুদ্ধশিশু জন্মদানকারী মহিলাদের সংখ্যা চল্লিশ হাজার বলা হয়েছে। লন্ডন ভিত্তিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল প্ল্যান্ড প্যারেন্টহুড ফেডারেশনের (আইপিপিএফ) হিসাব অনুযায়ী এই সংখ্যা দু’লক্ষ। ঐ সময়ে যুদ্ধশিশুদের ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে নিয়োজিত একজন সমাজকর্মী ড. জিওফ্রে ডেভিসের যুক্তি ছিল যে, এ সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে। কতজন নির্যাতিতা মহিলার গর্ভসঞ্চার হয় এবং কতজন সন্তান জন্ম দেন সে সংখ্যা সম্পূর্ণ অনিশ্চিত বলা যায়। একটি সরকারি হিসাবে এ সংখ্যা তিন লক্ষ বলে উল্লেখ করা হয়। তবে এ সংখ্যা নির্ধারণে অনুসৃত পদ্ধতিকে সম্পূর্ণ নির্ভরযোগ্য বলা যায় না। ড. ডেভিসের মতে দু’ লক্ষ মহিলা গর্ভধারণ করেন। কিন্তু এ সংখ্যাটিও কোনো সমীক্ষার ফল নয়, নিতান্তই তাঁর অনুমান।

ঐ সময়ের সংবাদপত্রে যুদ্ধশিশুদের নিয়ে যত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়, সেগুলোর মধ্যে দুঃস্থ মহিলা পুনর্বাসন বোর্ডের সভাপতি বিচারপতি কে.এম সোবহান, মিশনারীজ অব চ্যারিটির সিস্টার মার্গারেট মেরি এবং আইপিপিএফ-এর ড. জিওফ্রে ডেভিস, ওডার্ট ফন শুল্জ প্রমুখের সাক্ষাৎকারও ছিল। তাঁদের সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায়, স্থানীয় বাঙালি চিকিৎসকদের সহায়তায় ব্রিটিশ, মার্কিন ও অস্ট্রেলীয় চিকিৎসকদের একটি দল ঢাকায় বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে ২৩ হাজার নির্যাতিতা মহিলার গর্ভপাত ঘটান। ১৯৭২ সালের শুরুতে প্রাপ্ত গর্ভপাতের এ তথ্যটি ছিল ব্যাপক ও গ্রহণযোগ্য। এরপর বিদেশ থেকে চিকিৎসক দল বাংলাদেশে আসতে শুরু করেন। তারা ঢাকায় গর্ভপাত করানো বা সন্তান জন্মদানের জন্য ‘সেবা সদন’ নামে পরিচিত বেশ কয়েকটি চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তোলেন।

সংবাদপত্রের একাধিক রিপোর্টে বলা হয় যে, দেশব্যাপী স্থাপিত ২২টি সেবা সদনে তিনশ থেকে চারশ শিশুর জন্ম হয়েছিল। কানাডার ইউনিসেফ কমিটির নির্বাহী পরিচালক অবরুদ্ধ বাংলাদেশ ও স্বাধীন বাংলাদেশে কয়েকবার সফর করেন। এ সফরকালে ঢাকায় ইউনিসেফের কর্মকর্তা এবং লীগ অব রেডক্রস সোসাইটিজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তাঁর কয়েকবার আলোচনা হয়। এ আলোচনার পর তিনি অটোয়ায় সদরদপ্তরে যে প্রতিবেদন পেশ করেন, তাতে বাংলাদেশের যুদ্ধশিশুদের সংখ্যা দশ হাজারের মতো বলে উল্লেখ করা হয়। যুদ্ধশিশুদের যেসকল সংখ্যা উল্লেখ করা হয়, তার যাথার্থ্য নিরূপণের কোনো নির্ভরযোগ্য রেকর্ড না থাকায় ঐ সংখ্যা অবিশ্বাস্য রকম বেশি ছিল এমন ধারণাটি সম্ভবত অপেক্ষাকৃত নিরাপদ। ১৯৭২ সালে জন্মগ্রহণকারী যুদ্ধশিশুদের উল্লিখিত দশ হাজার সংখ্যাটি যেকোন নথিভুক্ত রেকর্ডের মধ্যে সর্বোচ্চ।

সমস্যা নিরসনে সরকারি উদ্যোগ  সর্বপ্রথম সর্বোচ্চ গুরুত্বপূর্ণ যে পদক্ষেপ বাংলাদেশ সরকার গ্রহণ করে, সেটি হলো ১৯৭২ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি নির্যাতিতা মহিলাদের জন্য বাংলাদেশ মহিলা পুনর্বাসন বোর্ড (বিডব্লিউআরবি) গঠন। মহিলাদের পুনর্বাসনের এই কেন্দ্রীয় সংস্থা বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতির প্রশিক্ষণ, গবেষণা, মূল্যায়ন ও যোগাযোগ পরিদপ্তর এবং শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সমাজকল্যাণ পরিদপ্তরের সহায়তায় দুটি লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করে। এর প্রথমটি হলো, বাংলাদেশে যেসকল মহিলা ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, সম্ভাব্য ক্ষেত্রে তিন থেকে চার মাসের মধ্যে তাঁদের সবাইকে চিকিৎসা সেবা পৌঁছে দেওয়া। দ্বিতীয় লক্ষ্যটি ছিল, হাজার হাজার নির্যাতিতা মহিলার দ্রুত কার্যকর পুনর্বাসনের সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টির লক্ষ্যে কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মতো প্রতিষ্ঠান স্থাপনের পরিকল্পনা, কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন। নির্যাতিতা মহিলারা কেবল ধর্ষিতা রমণীই ছিলেন না, তাদের অনেকেই ছিলেন যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত। পাকিস্তানি সৈন্যদের হাতে তাদের স্বামী নতুবা পিতা কিংবা ভাইয়ের মতো কোনো নির্ভরযোগ্য উপার্জনশীল নিকটজন নিহত হয়েছেন অথবা যুদ্ধে তারা সহায়-সম্বল হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছেন।

ধর্ষিতা মহিলাদের জন্য গৃহীত পুনর্বাসন কর্মসূচির মাধ্যমে সরকার নির্যাতিতাদের মর্যাদা সমুন্নত করার অভিনব উপায় উদ্ভাবন করলেন। জাতীয় পর্যায়ে তাদের মহান অবদানকে গৌরবময় স্বীকৃতি দেওয়া হলো। এই অচ্ছুৎ বীর রমণীদের সম্মান জানিয়ে সরকার ঘোষণা করলেন যে, স্বাধীনতা যুদ্ধে তাদের বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার জন্য তারা জাতীয় স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য। এই নির্যাতিতাদের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার সংশ্লিষ্ঠ স্বার্থগোষ্ঠীর সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনার পর তাদের ‘বীরাঙ্গনা’ খেতাব প্রদান করে সম্মান জানালেন। বলা হলো, বীরাঙ্গনা কোনো অপমান ও অবমাননাকর সম্বোধন নয় বরং তা সম্মান ও সাহসিকতার প্রতীক। এভাবে তাদের সম্মান জানানোয় এ বিশ্বাস দৃঢ়তর হতে শুরু করল যে, তারা সকলের দৃষ্টিতে ‘যা কিছু সুন্দর সাহসিক ও মহৎ তারই প্রতিচ্ছবি ও প্রতীক’ হিসেবে প্রতিভাত হবেন। আত্মোৎসর্গের এহেন স্বীকৃতি প্রদান এই প্রত্যয়েরও সূচনা করল যে, এর ফলে বীরাঙ্গনাদের জন্য সকল দ্বার উন্মুক্ত হবে, সমাজে সকলের কাছে তারা বিজয় ও বেদনার মূর্তিমান প্রতীকরূপে অভিষিক্ত হবেন। পাশাপাশি সরকার পরিত্যক্ত যুদ্ধশিশুদের সম্পর্কে নীতি নির্ধারণের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সকল মহলের পরামর্শ গ্রহণ করতে শুরু করলেন।

যুদ্ধশিশুদের আন্তঃদেশীয় দত্তক গ্রহণ  বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যক্তিগত অনুরোধে প্রথম যে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানটি যুদ্ধশিশুদের সম্পর্কে সরকারকে পরামর্শ দিতে এগিয়ে আসে সেটি হলো জেনেভা ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সোস্যাল সার্ভিস (আইএসএস)-এর যুক্তরাষ্ট্র শাখা। দুটি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, ঢাকা ভিত্তিক বাংলাদেশ সেন্ট্রাল অর্গানাইজেশন ফর উইমেন রিহ্যাবিলিটেশন এবং বাংলাদেশ পরিবার পরিকল্পনা সমিতি, আইএসএস-এর সঙ্গে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পর্যায়ের পুরো সময় একত্রে কাজ করেছিল।

যুদ্ধশিশুদের দত্তক গ্রহণে কানাডীয় উদ্যোগ  বাংলাদেশের যুদ্ধশিশুদের দত্তক গ্রহণের ব্যাপারে বিশ্বের দেশগুলোর মধ্যে কানাডাই প্রথম আগ্রহ প্রকাশ করে। মাদার তেরিজা ও তাঁর মিশনারীজ অব চ্যারিটি সংস্থার সহকর্মীদের ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা এবং বাংলাদেশ সরকারের শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দুটি কানাডীয় সংগঠন দত্তক গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়। এ সংগঠন দুটির একটি হচ্ছে মন্ট্রিল ভিত্তিক আন্তঃদেশীয় দত্তক বিষয়ক সংস্থা ফ্যামিলিজ ফর চিলড্রেন এবং অন্যটি টরন্টো ভিত্তিক বিশ্বের নির্যাতিত শিশুদের কল্যাণে নিয়োজিত ত্রাণ প্রতিষ্ঠান কুয়ান-ইন ফাউন্ডেশন। পরবর্তী সময়ে যেসব দেশ এ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয় তার মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ড, সুইডেন ও অস্ট্রেলিয়া। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক হোল্ট অ্যাডপশন প্রোগ্রাম ইন্ক এবং টেরি ডেস হোমস-এর মতো অনেক সংগঠনও এগিয়ে আসে।

বিদেশী নাগরিকরা যাতে যুদ্ধশিশুদের সহজে দত্তক নিতে পারে সে লক্ষ্যে বাংলাদেশ পরিত্যক্ত শিশু (বিশেষ বিধান) আদেশ ১৯৭২ নামে একটি রাষ্ট্রপতি আদেশ জারি করা হয়। ১৯৭২ সালের ১৯ জুলাই ১৫ জন যুদ্ধশিশুর প্রথম দলটি বাংলাদেশ থেকে কানাডায় পৌঁছলে কয়েকদিন ধরে গণমাধ্যমে এ সংবাদটি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। গণমাধ্যমে প্রচারিত মূল বার্তাটি ছিল, এ আন্তঃবর্ণ দত্তক কর্মসূচি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ এবং বহু জাতি ও বর্ণের সমষ্টিতে গঠিত কানাডীয়দের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানানো উচিত।

যুদ্ধশিশু প্রশ্নের অবসান  যুদ্ধশিশুদের পুনর্বাসনে আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণের একটি বিতর্কিত দিকও ছিল। পশ্চিমের দত্তক গ্রহণকারী সংস্থাগুলো যুদ্ধশিশুদের পুনর্বাসনে বেশ আগ্রহ দেখায়, কিন্তু তাদের জন্মদাত্রী মায়েদের পুনর্বাসনে তেমন আগ্রহ দেখায় নি। যুদ্ধশিশুদের অধিকাংশই ছিল মুসলিম মহিলাদের সন্তান এবং তারা দত্তক গ্রহণকারী দেশগুলোতে খ্রিস্টান হিসেবে বেড়ে উঠবে জেনে বাংলাদেশের জনমত এই আন্তঃদেশীয় উদ্যোগের প্রতি বিরূপ হয়ে ওঠে। ১৯৭৪ সালে যুদ্ধশিশু প্রশ্নটির অবসান ঘটে। ততদিনে দত্তক হিসেবে বিদেশের মাটিতে যারা যাবার, তাদের অভিবাসন সম্পন্ন হয়; আর যারা স্বদেশে রয়ে যায় তারা স্বস্ব বাড়িতে বাংলাদেশের স্বাভাবিক সাধারণ নাগরিক হিসেবে বেড়ে উঠতে থাকে।  [মুস্তফা চৌধুরী]