যুগান্তর পার্টি


যুগান্তর পার্টি  উপনিবেশিক আমলে বাংলার ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী দলগুলির পুরোধা। কলকাতা অনুশীলন সমিতির ভেতরেই একটি আন্তবূহ্য হিসেবে বারীন্দ্রকুমার ঘোষ ও ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত (নেপথ্যে পরামর্শদাতা ছিলেন অরবিন্দ ঘোষ) ১৯০৬ সালের এপ্রিলে সাপ্তাহিক যুগান্তর প্রকাশ শুরু করেন। সশস্ত্র জাতীয়তাবাদীদের মুখপত্র হিসেবে প্রকাশিত যুগান্তর-এর নামানুসারে দলটির নামকরণ হয়। বারীন্দ্রকুমার ব্রিটিশ উপনিবেশিক অধীনতাপাশ থেকে ভারতকে মুক্ত করার জন্য ছিলেন বদ্ধপরিকর। ধর্মীয় অনুপ্রেরণায় অনুপ্রাণিত বারীন্দ্রকুমার বিশ্বাস করতেন, মানুষের বৃহত্তর কল্যাণে প্রয়োজন হলে সন্ত্রাস ও হত্যা বিধেয়। তিনি বিপ্লবের ঢঙে ব্যাপক আকারে বঙ্গভঙ্গ (১৯০৫) বিরোধী আন্দোলন শুরু করেন। তিনি এবং তাঁর একুশজন অনুসারী অস্ত্রশস্ত্র ও বিস্ফোরক সংগ্রহ এবং বোমা তৈরির মাধ্যমে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের মাধ্যমে উপনিবেশিক শাসনের অবসানের লক্ষে বিপ্লবী দল যুগান্তরের জন্ম দেন। ৯৩/এ বাবুবাজার স্ট্রীটে ছিল দলের প্রধান কার্যালয়।

প্রথম দিকের বিপ্লবী প্রজন্মের বয়োজ্যেষ্ঠ সদস্যগণদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন হেমচন্দ্র কানুনগো। তিনি রাজনৈতিক ও সামরিক প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য বিদেশেও গমন করেন। হেমচন্দ্র প্যারিসে আশ্রয়গ্রহণকারী জনৈক রুশ নাগরিকের কাছ থেকে প্রশিক্ষণ লাভ করেন। ১৯০৮ সালের জানুয়ারি মাসে দেশে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি কলকাতার উপকণ্ঠে মানিকতলার একটি বাগান বাড়িতে ধর্মীয় স্কুলের পাশাপাশি বোমা প্রস্ত্ততকারী একটি কারখানাও গড়ে তোলেন। কিন্তু ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল ক্ষুদিরাম বসু কর্তৃক মিস ও মিসেস কেনেডী হত্যার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সমগ্র দলটি গ্রেফতার হয়।

বার্লিনে অবস্থানকারী বলশেভিক বিপ্লবী মানবেন্দ্রনাথ রায় ওরফে নরেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্যের সাথে যুগান্তর পার্টির যোগাযোগ ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে যুগান্তর পার্টি কর্তৃক সংঘটিত ‘জার্মান প্লট’ হিসেবে খ্যাত ঘটনায় তিনি প্রধান ভূমিকা রেখেছিলেন। সোয়ের এবং সুল কর্তৃক নির্মিত থার্টিটু বোর-এর জার্মান অটোমেটিক পিস্তল সর্বপ্রথম ভারতে আসে তার শিষ্য যুগান্তর দলের সদস্য অবনী মুখার্জীর ভারত সফরের সময়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ভারতে বিপ্লব সংঘটনের জন্য সোভিয়েত সরকার তাকে অর্থ সাহায্য করেছিল।

বিশ শতকের বিশের দশকের শেষ দিকে যুগান্তর দল কলকাতা ও এর আশেপাশের ডাকঘরসমূহ, ডাকগাড়ি, রেলস্টেশনের টিকেট কাউন্টারে নতুন উদ্যমে ত্রাসের সৃষ্টি করে। ১৯২৩ সালে ‘রেড বেঙ্গল’ লিফলেটের মাধ্যমে তাদের আত্মপ্রকাশ ঘটে। ধনীদের হত্যা এবং লুণ্ঠনের মাধ্যমেও তাঁরা অর্থ সংগ্রহ করতে থাকেন।

১৯২৩ সালের শেষের দিকে যুগান্তর দলের অনেক নেতা বাংলার জেলা ও প্রাদেশিক কংগ্রেসের, এমনকি জাতীয় কংগ্রেসের উঁচু পর্যায়ে পৌঁছুতে সক্ষম হয়। যুগান্তর দলের ভূপতি মজুমদার ও মনোরঞ্জন গুপ্ত যথাক্রমে ছিলেন বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস কমিটির সম্পাদক ও যুগ্ম সম্পাদক। অন্যান্য আরও অনেক নেতা, যেমন অমরেন্দ্র চ্যাটার্জী, উপেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, বিপিন বিহারী গাঙ্গুলী ও সতেন্দ্রচন্দ্র মিত্র বাংলা থেকে সর্ব ভারতীয় কংগ্রেস কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। অসহযোগ আন্দোলন এর সময় কংগ্রেস কর্তৃক গঠিত জাতীয় সেচ্ছাসেবী কোর নিয়ন্ত্রিত হতো বিপ্লবী দলগুলির মাধ্যমেই। এর মধ্যে যুগান্তরও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

মূল যুগান্তর দলের জ্যোতিষ ঘোষ, বিপিন গাঙ্গুলী ও অমরেন্দ্র চ্যাটার্জী কয়েকজন পুলিশ অফিসারকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। তাদের মধ্যে কলকাতার পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্টও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় তাঁদের সংগঠনটিকে ধ্বংস করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল।

১৯৩০ সালের মে মাসে কলকাতা যুগান্তর দলের নেতৃবৃন্দ ত্রাস সৃষ্টির এক ব্যাপক পরিকল্পনা করে এবং বোমা তৈরির যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। এই পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্য ছিল: (ক) হোটেল, ক্লাব ও সিনেমা হলগুলিতে ইউরোপীয়দের হত্যা, (খ) দমদমের (কলকাতা) বিমানঘাটিতে অগ্নিসংযোগ, (গ) গ্যাস ও বিদ্যুৎ কেন্দ্র ধ্বংস করে কলকাতায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করা, (ঘ) বজবজ-এর পেট্রোল ডিপোগুলি ধ্বংস করে কলকাতায় পেট্রোল সরবরাহ বন্ধ করা, (ঙ) ট্রাম সার্ভিসের যোগাযোগ রক্ষাকারী তারগুলি বিচ্ছিন্ন করে কলকাতায় ট্রাম ব্যবস্থা বিঘ্নিত করা, (চ) কলকাতার সাথে বাংলার অন্যান্য জেলাগুলির টেলিযোগাযোগ বিচ্ছিন্নকরণ এবং (ছ) ডিনামাইট ও হ্যান্ড গ্রেনেড দিয়ে সেতু ও রেলপথ উড়িয়ে দেয়া।

এর ফলে বাংলায় পুনরায় বিপ্লবী আন্দোলন শুরু হয়, বিশেষ করে চট্টগ্রামে। সমগ্র বাংলার বিপ্লববাদী সন্ত্রাসীদের ওপর চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন এর (১৯৩০) ঘটনার ব্যাপক প্রভাব পড়ে। ১৯৩৩ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি যুগান্তর দলের নেতা ও চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র লুটে নেয়ার পরিকল্পনার মূল সংগঠক মাস্টারদা সূর্যসেন পুলিশের হাতে ধরা পড়েন এবং বিচারে তাঁর ফাঁসির রায় হয়।  [মোহাম্মদ শাহ]