যুক্তফ্রণ্ট


যুক্তফ্রণ্ট  ১৯৫৪ সালের ৮-১২ মার্চ তারিখে অনুষ্ঠিত পূর্ব বাংলার আইনসভার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য গঠিত বিরোধী রাজনৈতিক দল সমুহের নির্বাচনী মোর্চা। এ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে। যুক্তফ্রন্ট প্রধানত পূর্ব বাংলার চারটি বিরোধী দল নিয়ে গঠিত হয়েছিল। এ চারটি দল হলো আওয়ামী লীগ, কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলাম ও গণতন্ত্রী দল।

১৯৫৩ সালের নভেম্বর মাসে যুক্তফ্রন্ট একটি একুশ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করে এবং এটিকে নির্বাচনী ইশতেহারের অর্ন্তভুক্ত করে। পরিপূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের পাশাপাশি ২১-দফার ইশ্তেহারে প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক সম্পর্ক এবং অর্থ দপ্তর বাদে অন্যান্য সকল বিষয় কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক সরকারের নিকট হস্তান্তর করার দাবি উত্থাপন করা হয়। ইশতেহারে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতিদান, রাজবন্দিদের মুক্তি, পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন বর্ধমান হাউসকে বাংলা একাডেমী ভবনে রূপান্তর, ১৯৫২ সালে ছাত্রদের উপর পুলিশের গুলিবর্ষণের স্থানে শহীদ মিনার নির্মাণ, ২১ ফেব্রুয়ারিকে সরকারি ছুটির দিন ঘোষণা, ঢাকা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়কে অধিকতর স্বায়ত্তশাসন প্রদান, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার নীতিমালা অনুসারে কলকারখানার শ্রমিকদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার প্রবর্তন, পাটশিল্প জাতীয়করণ, পণ্যের মূল্যমানের যথার্থতা নিশ্চিতকরণ এবং সমবায়ী প্রতিষ্ঠান ও কুটিরশিল্পের উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকারি সহায়তা প্রদান ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত ছিল।

পাকিস্তানের প্রাথমিক পর্যায়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য, সরকারে বাঙালিদের অংশগ্রহণের সুযোগের স্বল্পতা এবং পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক বাঙালিদের রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে অবদমন পূর্ব বাংলায় রাজনৈতিক অসন্তোষ তীব্রতর করে। সত্যিকার অর্থে সিদ্ধান্তগ্রহণ প্রক্রিয়ায় বাঙালিদের অংশগ্রহণ প্রত্যাখ্যাত হওয়ার কারণে পূর্ব বাংলায় আঞ্চলিকতাবাদের রাজনীতির উদ্ভব ঘটে। ফলে পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক শক্তি পশ্চিম পাকিস্তান ভিত্তিক কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে একটি সংঘবদ্ধ রাজনৈতিক প্লাটফর্ম গঠন করে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন আন্দোলন সংগঠিত করে।

১৯৫১ সালে পূর্ব বাংলার আইনসভার যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল তা ১৯৫৪ সালের আগে হতে পারে নি। বিভিন্ন অজুহাতে কয়েকবার সাধারণ নির্বাচন স্থগিতকরণ ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের ক্ষমতালোভী অভিসন্ধি ও সাংগঠনিক দুর্বলতার প্রমাণ দেয়। মূলত মুসলিম লীগের সামগ্রিক ব্যর্থতা এবং অন্যান্য ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণে পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে যুক্তফ্রন্টের আবির্ভাব ঘটে। ১৯৫৩ সালের ১৪ নভেম্বর ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক কাউন্সিল সম্মেলনে যুক্তফ্রন্ট গঠনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়। একটি কার্যকর রাজনৈতিক প্লাটফর্ম হিসেবে পূর্ব বাংলার বিভিন্ন রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে একত্রিত করতে যুক্তফ্রন্টের ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য।

প্রাদেশিক পরিষদে মোট ৩০৯টি মুসলিম আসনের মধ্যে যুক্তফ্রন্ট ২২৩টি আসনে জয়লাভ করে। পক্ষান্তরে, ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ মাত্র ৯টি আসন লাভ করে। মুসলিম লীগ মন্ত্রিসভার মুখ্যমন্ত্রী নূরুল আমীনসহ প্রভাবশালী ৫ সদস্যের সকলেই নির্বাচনে পরাজিত হন। ৩০৪টি আসনে ১২৮৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ২২৮টি মুসলিম আসনের জন্য ৯৮৬ জন প্রার্থী, ৩০টি সাধারণ আসনের জন্য ১০১ জন প্রার্থী এবং ৩৬টি তফসিলী আসনের জন্য ১৫১ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। অমুসলিম আসনের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল পাকিস্তান ন্যাশনাল কংগ্রেস, ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ পার্টি এবং তফসিলী ফেডারেশন। উল্লেখ্য, মুসলিম নারীদের জন্য সংরক্ষিত ৯টি আসনে ৩৭ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। এই ৯টি আসনের সবগুলোতে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থীরা বিজয়ী হন।

মুসলিম আসনগুলোতে ভোট প্রদানের শতকরা হার ছিল ৩৭.৬। তৎকালীন সময়ের আন্তর্জাতিক মাপকাঠিতে ভোট প্রদানের এই হার কম হলেও যোগাযোগ ব্যবস্থার অনগ্রসরতা এবং মহিলা ভোটারদের রক্ষণশীল মনোভাবের কারণে এই হার গ্রহণযোগ্য ছিল। কৌশলগত কারণে কমিউনিস্টরা নিজেদের দলের ব্যানারে প্রচারণা না চালিয়ে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনে কমিউনিস্টরা ১৫টি আসনে বিজয়ী হয়।

১৯৫৪ সালের ৩ এপ্রিল পূর্ব বাংলার গভর্নর সরকার গঠনের জন্য যুক্তফ্রন্ট নেতা একে ফজলুল হককে আমন্ত্রণ জানান। এই নির্বাচন পূর্ব বাংলার রাজনীতিতে প্রথাগত এলিটদের আধিপত্য অবসানের সূচনা করে। পূর্ব বাংলায় রাজনৈতিক ক্ষমতা ভূস্বামীদের হাত থেকে আইনবিদ, সাংবাদিক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী তথা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আগত তুলনামূলকভাবে নূতন প্রজন্মের পেশাজীবী এলিটদের হাতে চলে যায়। নির্বাচিত সদস্যদের একটি বড় অংশ ছিল নবাগত, তুলনামূলকভাবে তরুণ এবং তাদের সরকার ও রাজনীতি সম্পর্কে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না। যুক্তফ্রন্টের ২২৩ জন নির্বাচিত সদস্যের মধ্যে ১৩০ জন ছিলেন আওয়ামী লীগের।

পূর্ব বাংলায় যুক্তফ্রন্টের এহেন বিজয়ের রূপকার ছিলেন এ.কে ফজলুল হক,  হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং মৌলানা  আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তাঁদের আকষর্ণীয় ব্যক্তিত্ব ভোটারদের ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল। কিন্তু এক বছর পার হতে না হতেই ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব, সমঝোতাহীনতা, মতানৈক্য এবং বহুমুখি দলীয় কর্মসূচির কারণে যুক্তফ্রন্টের ঐক্যে ভাঙ্গন দেখা দেয়।  [কামাল উদ্দিন আহমদ]