যজ্ঞ


যজ্ঞ হিন্দুধর্মের অন্যতম কৃত্যানুষ্ঠান। দেবতার অনুগ্রহ লাভের উদ্দেশ্যে বেদমস্ত্র উচ্চারণপূর্বক অগ্নিতে আহুতি প্রদান অনুষ্ঠানই যজ্ঞ। এর মাধ্যমে সম্পদ বা সমৃদ্ধি লাভ, শত্রু ক্ষয়, যুদ্ধ জয়, রোগারোগ্য ও স্বর্গ লাভ ইত্যাদি কামনা করা হতো। বৈদিক যুগে এর উদ্ভব ঘটে এবং ক্রমশ তা সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।

বৈদিক যুগে যজ্ঞই ছিল প্রধান ধর্মীয় অনুষ্ঠান। তাই যজ্ঞকর্মকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণসাহিত্য নামে এক বিশাল বৈদিক সাহিত্যের সৃষ্টি হয়। যজ্ঞকে মনে করা হয় সর্বপাপহর। যজ্ঞকর্মের সঙ্গে অগ্নির অবস্থান অপরিহার্য। অগ্নিকে বলা হয় দেবতাদের মুখ; তার মাধ্যমেই সকল দেবতা আহুতি দ্রব্য লাভ করে থাকেন। অর্থাৎ কোনো দেবতাকে উদ্দেশ্য করে সমন্ত্রক অগ্নিতে আহুতি প্রদান করলে  অদিক্ষ্ম তা উদ্দিষ্ট দেবতার নিকট পৌঁছে দেয়।

বৈদিক যজ্ঞে তিন প্রকার অগ্নির প্রয়োজন হয়: গার্হপত্য, আহবনীয় ও দক্ষিণাগ্নি। যজ্ঞশালা নির্মাণ করে তার তিনদিকে তিন অগ্নিকে স্থাপন করা হয়। পশ্চিম দিকে বৃত্তাকার স্থানে গার্হপত্য, পূর্বদিকে চতুষ্কোণ স্থানে আহবনীয় এবং দক্ষিণ দিকে অর্ধবৃত্তাকার স্থানে দক্ষিণাগ্নিকে স্থাপন করা হয়। গার্হপত্য অগ্নি গৃহস্থের প্রতিনিধিস্বরূপ। একে গৃহস্থের মঙ্গলের জন্য সর্বদা প্রজ্বলিত রাখা হয়। আহবনীয় ও দক্ষিণাগ্নিতে যথাক্রমে দেবতা ও পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে আহুতি প্রদান করা হয়।

যজ্ঞকর্ম সম্পাদনের জন্য চারজন ঋত্বিকের প্রয়োজন: হোতা, অধ্বর্যু, উদ্গাতা ও ব্রহ্মা। হোতা যজ্ঞদেবতাকে আহবানের জন্য ঋগ্বেদীয় মন্ত্র আবৃত্তি করেন, অধ্বর্যু আহুতিদান সংক্রান্ত কার্য সম্পাদন করেন, উদ্গাতা সামবেদীয় মন্ত্র গান করেন, আর ব্রহ্মা এই তিনজনের কর্মকান্ড পর্যবেক্ষণ করেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন। এঁদের প্রত্যেকের সঙ্গে আবার প্রয়োজনবোধে তিনজন করে সহকারী থাকতে পারেন। ফলে পুরোহিতের সংখ্যা হয় মোট ষোলো জন। যজ্ঞবিশেষে, যেমন সোমযাগে উক্ত ষোলো জন ঋত্বিকেরই প্রয়োজন হয়।

বৈদিক যুগে অনুষ্ঠেয় যজ্ঞকর্মকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায় : হোম, ইষ্টি, পশু, সোম ও সত্রযাগ। এছাড়া রাজ্যলাভ, আধিপত্য প্রতিষ্ঠা প্রভৃতি কর্মে সাফল্য লাভের জন্য রাজসূয়, বাজপেয়, অশ্বমেধ, নরমেধ প্রভৃতি যজ্ঞেরও ব্যবস্থা আছে। এর মধ্যে রাজসূয় ও অশ্বমেধ যজ্ঞ রামায়ণ-মহাভারতের যুগেও বিশেষ পরিচিত ছিল। যজ্ঞে দুগ্ধ, দুগ্ধজাত দ্রব্য এবং শস্যচূর্ণ দ্বারা প্রস্ত্তত পুরোডাশ আহুতি দেওয়া হয়। পশুযাগে ছাগ, গাভী, মেষ, অশ্ব প্রভৃতি উৎসর্গ করা হয়। নরমেধ যজ্ঞে প্রকৃতপক্ষে নরবলি দেওয়া হয় না, পর্যগ্নিকরণের পর যূপকাষ্ঠে বদ্ধ মানুষটিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। যজ্ঞানুষ্ঠানে নিযুক্ত ঋত্বিকগণকে স্বর্ণ, গো, বস্ত্র, অশ্ব ইত্যাদি দক্ষিণা প্রদানের রীতি আছে।

বর্তমানে বৈদিক যাগ-যজ্ঞের প্রাধান্য কমে এসেছে; সেস্থলে প্রাধান্য পেয়েছে ভক্তিশাস্ত্রানুমোদিত জ্ঞানযজ্ঞ, জপযজ্ঞ, নামযজ্ঞ ইত্যাদি। তবে বিশেষ বিশেষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানে (যেমন বিবাহ, মৃত্যু ইত্যাদি) আজও সংক্ষিপ্ত আকারে বৈদিক যজ্ঞকর্ম অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে।  [পরেশচন্দ্র মন্ডল]