মৌমাছি

NasirkhanBot (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ২২:৪৯, ৪ মে ২০১৪ তারিখে সংশোধিত সংস্করণ (Added Ennglish article link)
মৌমাছি ও মৌচাক

মৌমাছি  মধু সংগ্রহকারী পতঙ্গবিশেষ। এরা ফুলে ফুলে বিচরণ করে ফুলের নির্যাস (nectar) সংগ্রহ করে এবং তা থেকে অর্ধতরল মিষ্টি, মধু প্রস্ত্তত করে। কর্মী বা শ্রমিক মৌমাছি এই নির্যাস খাদ্যনালীর ক্রপ বা হানি স্টমাকে (crop or honey stomach) সংগ্রহ করে এবং এখানেই উৎসেচকের বিক্রিয়ায় তা ডেক্সট্রোজ ও লিভিউলোজে পরিণত হয়। পরিবর্তিত এই অংশটুকু কর্মী মৌমাছি মৌচাকের বিশেষ প্রকোষ্ঠে জমা করে। জমা করা এ তরল অংশই মধু।

বাংলাদেশে মৌমাছির প্রধানত তিনটি প্রজাতি আছে, যথা: Apis indica, A. dorsata এবং A. florea। বেশ কিছুদিন আগে ইউরোপ থেকে Apis mellifera নামক একটি প্রজাতি বাংলাদেশে আনা হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য A. indica বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং কাঠের বাক্সে অর্থাৎ কৃত্রিমভাবে এদেরকে প্রতিপালন করা যায়। A. dorsata বন্য প্রকৃতির, জঙ্গল কিংবা বাড়ির চারদিকের বড় বড় গাছে এদের চাক দেখতে পাওয়া যায়, এমনকি ঘরের কার্নিসেও এরা বাসা বাঁধে। পেশাদার মধু সংগ্রহকারী A. dorsata-র কলোনিকে মধুর উৎস হিসেবে বেছে নিয়ে মধু সংগ্রহ করে। সে কারণে কোন কোন সময় এসব মৌচাক এবং মৌমাছির ক্ষতি সাধিত হয়। মধু সংগ্রহের এ ধরনের প্রাচীন পদ্ধতি বাংলাদেশে মৌমাছির সংখ্যা হ্রাসের অন্যতম কারণ। অর্থনৈতিকভাবে উপকারের দিক থেকে পতঙ্গদের মধ্যে মৌমাছিকে অন্যতম মনে করা হয়। মৌমাছি মধু ছাড়া মোম এবং আঠাও তৈরি করে। এছাড়া বিভিন্ন প্রকার শস্যের পরাগায়ণে মৌমাছির ভূমিকা অসামান্য।

'ক্ষুদে মৌমাছি' (Bee, stingless)  Apidae গোত্রের একদল অতি ছোট আকারের মৌমাছি। কার্যকর হুলবিহীন এসব মৌমাছি লম্বায় হয় মাত্র ২-৫ মিমি। এদের প্রায় ৫০০ প্রজাতি পৃথিবীর নানা দেশে ছড়িয়ে আছে। বাংলাদেশে Trigona fuscobaltiata নামের একটি প্রজাতি দেশের দক্ষিণ-পূর্ব পাহাড়ী এলাকায় বাস করে। এটি দৈর্ঘ্যে মাত্র ৩.৪ মিমি। গাছের ফাঁক-ফোঁকড়ে, খুঁটি হিসেবে ব্যবহূত বাঁশের ফাঁপা কান্ডে, শিলা বা দেয়ালের ফাটলে, অথবা বিভিন্ন ধরনের সরু গর্তে এরা বাসা বানায়। মৌমাছিদের মতো এদেরও জাতিভেদ (cast system) আছে এবং নিজেদের মধ্যে কাজের দায়িত্ব ভাগ করে নেয়। ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য সমাজবদ্ধ ক্ষুদে মৌমাছিরাও তাদের বাসায় মধু ও ফুলের রেণু জমা করে রাখে।  [মো. আবদুল হান্নান]

'মৌমাছিপালন' (Bee-keeping)  মধুর বাণিজিক উৎপাদনের জন্য মৌমাছির চাষ। এতে আছে কৃত্রিম বাক্সে মৌমাছি রক্ষণাবেক্ষণ, ব্যবস্থাপনা ও তাদের লালনপালন। পূর্বে প্রধানত বন-জঙ্গল থেকেই মধু আহরণ করা হতো। এ পদ্ধতিতে মৌমাছির চাক খুঁজে সেগুলি থেকে মধু সংগ্রহ করা হতো, যা আজও প্রচলিত। ত্রিশের দশকে মহাত্মা গান্ধী পরিচালিত স্বয়ম্ভরতা আন্দোলনের সময় থেকেই সম্ভবত উপমহাদেশে কাঠের বাক্সে মৌমাছি পালনের সূত্রপাত। তার আগে মানুষ কাঠের গুঁড়ি, মাটির পাত্র বা অন্যতর অনুরূপ কিছুর মধ্যে মৌমাছিপালন করত।

পাকিস্তান আমলে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মৌমাছি পালনের গৃহীত সরকারি প্রচেষ্টা সম্ভবত উৎসাহ এবং সুনির্দিষ্ট ও নিয়মতান্ত্রিক পরিকল্পনার অভাবে ব্যর্থ হয়ে যায়। সত্তরের দশকে কিছু লোক ও সংগঠন মৌমাছি পালনে আগ্রহ দেখায়। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (BSCIC) এবং একটি বেসরকারি সংগঠন প্রশিকা এ ব্যাপারে সর্বাধিক উদ্যোগী ছিল। ১৯৭৭ সালে কানাডার একটি স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান (Canadian Voluntary Organization CUSO of the CIDA) মৌমাছিপালন কার্যক্রমে আর্থিক সহায়তা প্রদান শুরু করে। লক্ষ্য করা গেছে যে, প্রশিক্ষণ ও সম্প্রসারণ কর্মের মাধ্যমে বাংলাদেশে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মৌমাছি চাষের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম বাস্তবায়ন সম্ভব। এই পর্যবেক্ষণ হিসাবে রেখেই ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ মৌমাছিপালন ইনস্টিটিউট (Bangladesh Institute of Apiculture) প্রতিষ্ঠিত হয়।

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে মৌমাছিপালন এখন সুপ্রতিষ্ঠিত। কারিগরি জ্ঞান, যন্ত্রপাতি, ফুলের পর্যাপ্ততা ও সর্বসাধারণের উৎসাহ সবই বাংলাদেশে মৌমাছি পালনের অনুকূল। ইতোমধ্যে কিছু বেসরকারি সংস্থা দেশের বিভিন্ন এলাকায় ৫টি গবেষণা ও প্রদর্শনী  কেন্দ্রের মাধ্যমে মৌমাছিপালন কার্যক্রমের বিস্তার ঘটিয়েছে।

প্রশিক্ষণ, সম্প্রসারণ, কিছু প্রায়োগিক গবেষণা ও বিপণনের মাধ্যমে বাংলাদেশ মৌমাছিপালন ইনস্টিটিউট মৌমাছিপালন প্রবর্তনে উল্লেখযোগ্য সফলতা লাভ করেছে। এ ইনস্টিটিউট থেকে মৌমাছি পালনে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মৌমাছিপালক সমিতিগুলি গ্রামের লোকজনদের মৌমাছি পালনে উদ্বুদ্ধ করছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্প কর্পোরেশন ও বাংলাদেশ মৌমাছিপালন ইনস্টিটিউট প্রায়ই নামমাত্র মূল্যে কৃত্রিম কাঠের মৌচাক সরবরাহ করে। মৌমাছিপালন, বিশেষত গ্রামীণ দরিদ্র জনগণের আয়ের একটি উত্তম উৎস হিসেবে গণ্য হতে পারে। গ্রামাঞ্চলে মৌমাছির সহায়ক পর্যাপ্ত গাছপালা, সবজিবাগান ও সরষে ক্ষেত আছে। মৌমাছিপালন শুধু আয়ের একটি উৎসই নয়, পুষ্টিকর মধুর জন্য এবং শখ হিসেবেও যথেষ্ট আকর্ষণীয়, যাতে তেমন খরচা নেই, বরং আছে উদ্ধৃত্ত কিছু আয়ের সুবিধা।  [মো. নূরুল ইসলাম]

আরও দেখুন বাংলাদেশ মৌমাছিপালন ইনস্টিটিউট।