মোহসীন ফান্ড


মোহসীন ফান্ড  হুগলির অধিবাসী হাজী মুহম্মদ মোহসীন কর্তৃক ১৮০৬ সালে প্রবর্তিত একটি তহবিল। মোহসীন ছিলেন সৈয়দপুরের জমিদার। তাঁর  জমিদারি খুলনা ও যশোর জেলায় বিস্তৃত ছিল। বৈপিত্রেয় বোন  মন্নুজান খানম এর নিঃসন্তান অবস্থায় মৃত্যু হলে তিনি উত্তরাধিকারসূত্রে বোনের জমিদারি লাভ করেন। চিরকুমার মোহসীন পারলৌকিক চিন্তায় নিবিষ্ট ছিলেন। ১৭৬৯-৭০ সালের সরকারি রেকর্ডপত্রে একজন মানবহিতৈষী ব্যক্তিরূপে তাঁর নামের উল্লেখ আছে, কারণ তিনি ১৭৬৯-৭০ সালের দুর্ভিক্ষের সময় বহু লঙ্গরখানা স্থাপন করেন এবং সরকারের দুর্ভিক্ষ তহবিলে অর্থ দান করেন। তাঁর নিজের তরফের অথবা তাঁর বৈপিত্রেয় বোনের পক্ষের কোন প্রত্যক্ষ উত্তরাধিকারী না থাকায় পরিবারের স্মৃতিরক্ষা এবং ইমামবারার ধর্মানুষ্ঠান পালনের স্থায়ী অর্থসংস্থানের লক্ষ্যে মোহসীন একটি ওয়াক্ফ বা দানপত্র সম্পাদনের সিদ্ধান্ত নেন। জমিদারির পুরো আয় ওয়াক্ফ-এর অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই আয় থেকে শিয়া ইমামবারা, ইমামবারা বাজার ও হাটের রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিবারের জীবিত পোষ্য ও ভৃত্যদের ভরণপোষণের ব্যয় নির্বাহের কথা দানপত্রে উল্লেখ করা ছিল।

কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ১৮১২ সালে মোহসীনের মৃত্যুর পর ওয়াক্ফের ব্যবস্থাপনার মান এতটা নেমে যায় যে, বছরের পর বছর জমিদারির খাজনা বাকি পড়ে এবং জমিদারি সম্পত্তি নিয়ে ট্রাস্টের মুতাওয়াল্লিদের কলহবিবাদ ও লুটপাটের ফলে জমিদারি ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এমনকি তারা পত্তনি বা স্থায়ী ইজারার মাধ্যমে নিজেদের নামে জমিদারি বন্দোবস্ত নিয়ে নেয়। এই পরিবারের একজন সদস্য ও মুতাওয়াল্লি এই ওয়াক্ফের আইনগত বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আদালতে মামলা দায়ের করেন। সদর দীউয়ানি আদালতে মোকদ্দমা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সরকার তার পাওনা রাজস্বের দাবিতে জমিদারি ক্রোক করে এবং ১৯ (১৮১০) বিধিবলে মুতাওয়াল্লিদের বরখাস্ত করে। মোকদ্দমা প্রিভি কাউন্সিল পর্যন্ত গড়ায় এবং ১৮৩৫ সালে ওয়াক্ফের অনুকূলে রায় দেওয়া হয়। এভাবে প্রায় ৩০ বছর সরকার কর্তৃক ওয়াক্ফের ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়। এই সময়ে মোহসীন ফান্ডের অর্থ ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। এর উদ্বৃত্ত আয় দাঁড়ায় দশ লক্ষ টাকারও ঊর্ধ্বে। মোহসীন ফান্ডের টাকায় ১৮৩৬ সালে হুগলি মোহসীন কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পূর্বেই ১৮১৭ সালে হুগলি মাদ্রাসা স্থাপন করা হয়েছিল। মুতাওয়াল্লিরা মোহসীন ফান্ডের বৈধতা নিয়ে আপত্তি তোলায় এবং তদুপরি তাদের তহবিল তছরুপের বহু ঘটনা আদালতে প্রমাণিত হওয়ায় মুতাওয়াল্লিদের এই ফান্ড পরিচালনার অধিকার নাকচ করে ফান্ডের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব স্থায়ীভাবে সরকারের উপর ন্যস্ত হয়।

সরকারি ব্যবস্থাপনার অধীনে মোহসীন ফান্ডের অর্থ মুসলমান ও হিন্দু ছাত্রদের শিক্ষা খাতেই ক্রমান্বয়ে বেশি ব্যয় করা হচ্ছিল। কিন্তু ১৮৭৩ সালে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে, এই তহবিল থেকে শিক্ষা সংক্রান্ত বরাদ্দ কেবল মুসলমান ছাত্রদের শিক্ষার জন্য ব্যয় করা হবে। এসময় থেকে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত মুসলিম ছাত্রদের জন্য ছাত্রবৃত্তির প্রচলন করা হয়। অনেক স্কুল ও কলেজে ছাত্রাবাস নির্মাণ করা হয়। অবশ্য এই তহবিলের মূল লক্ষ্য ইমামবারার রক্ষণাবেক্ষণ, ধর্মীয় উৎসব ও অনুষ্ঠানে অর্থ প্রদান এবং সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলিকে আর্থিক সহায়তা দানের ব্যাপারটি কখনই উপেক্ষিত হয়নি। মোহসীন ফান্ডের অর্থে একটি মনোরম ইমামবারা ভবন নির্মাণ করা হয়, পুরানো ভবনগুলি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা হয় এবং ধর্মীয় উৎসব ও অনুষ্ঠানেও উদারভাবে অর্থ প্রদান করা হয়। এভাবে মোহসীন ফান্ড বাংলার দরিদ্র মুসলিম জনগণের মধ্যে শিক্ষাবিস্তারের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে খ্যাত হয়ে আছে।  [সিরাজুল ইসলাম]