মোস্তফা, এ.এন.এম গোলাম


মোস্তফা, এ.এন.এম গোলাম (১৯৪২-১৯৭১)  সাংবাদিক, শহীদ বুদ্ধিজীবী। আবু নাসের মোহাম্মদ গোলাম মোস্তফা ১৩৪৮ সনের (১৯৪২ খ্রি) ২৪ অগ্রহায়ণ নীলফামারি জেলার পঙ্গাগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা জহিরউদ্দিন আহমদ ছিলেন উকিলের একজন মুহুরি।

এ.এন.এম গোলাম মোস্তফা

গোলাম মোস্তফা মেলাপাঙ্গা মাদ্রাসায় প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। তিনি দিনাজপুর জেলা স্কুল থেকে ১৯৫৮ সালে প্রবেশিকা এবং ১৯৬০ সালে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। তিনি সুরেন্দ্রনাথ কলেজ থেকে ১৯৬৩ সালে স্নাতক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬৫ সালে বাঙলা ভাষা ও সাহিত্যে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন।

ছাত্রজীবনেই গোলাম মোস্তফা রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হন এবং দিনাজপুরে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে তাঁর উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। তিনি দিনাজপুর জেলা স্কুলে ছাত্র-সংসদের সেক্রেটারি ছিলেন। মোস্তফা ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের জেলা শাখার জয়েন্ট সেক্রেটারি। ১৯৬২ সালে আইউব বিরোধী ছাত্র আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য তিনি গ্রেফতার হন এবং আটমাস কারা ভোগ করেন। মুক্তিলাভের এক মাস পরেই তিনি পুনরায় গ্রেফতার হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে গোলাম মোস্তফা পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংস্কৃতিক সম্পাদক ছিলেন (মেনন গ্রুপ)।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায়ই গোলাম মোস্তফা দৈনিক সংবাদ পত্রিকার বার্তা বিভাগে একজন সাংবাদিক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি দৈনিক আজাদ পত্রিকায় সাহিত্য সম্পাদক পদে যোগ দেন এবং যুগপৎ আজাদ গ্রুপের মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বে নিয়োজিত হন। এ সময় তিনি অন্তরঙ্গ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। গোলাম মোস্তফা ১৯৬৯ সালে দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকায় সিনিয়র সাব-এডিটর পদে যোগ দেন এবং পত্রিকাটির সাহিত্য বিভাগ সম্পাদনার দায়িত্বে নিয়োজিত হন। তিনি ১৯৭১ সালে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত পূর্বদেশ পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন।

গোলাম মোস্তফার বেশসংখ্যক সাহিত্য নিবন্ধ ও ফিচার পত্র পত্রিকা ও সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। সে সময়ের কতিপয় বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে গৃহীত তাঁর সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে তিনি সংকলন করেন অন্তরঙ্গ আলোকে গ্রন্থটি। তাঁর অনুবাদ গ্রন্থ শ্বেত কুন্তলা।

গোলাম মোস্তফা ছিলেন প্রগতিশীল চিন্তার অধিকারী। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের একজন একনিষ্ঠ ও সক্রিয় সমর্থক। ঢাকা অঞ্চলে অপারেশনে নিয়োজিত মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে তাঁর গোপন যোগাযোগ ছিল এবং নানাভাবে তিনি তাদের সহায়তা করতেন। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বিভিন্ন উৎস থেকে নগদ অর্থ এবং ওষুধপত্র সংগ্রহ করতেন। পাক হানাদার বাহিনীর স্বার্থের অনুকূলে কোনো সংবাদ ও রিপোর্ট যাতে পূর্বদেশ পত্রিকায় ছাপা না হয় এ লক্ষ্যে বরাবরই তিনি ছিলেন সোচ্চার। তাঁর এ মনোভাবের ফলে পাকিস্তানপন্থী সাংবাদিকরা তাঁর প্রতি বিরূপ ছিলেন। এ সব পাকিস্তানপন্থী সাংবাদিক গোলাম মোস্তফাসহ মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক সাংবাদিকদের বিরোধী কার্যকলাপের তথ্য পাক বাহিনীর গোচরীভূত করতেন।

১৯৭১ সালের ১১ ডিসেম্বর প্রত্যুষে গোলাম মোস্তফা যখন তাঁর গোপীবাগের বাসার লনে তাঁর শিশু সন্তানকে কোলে নিয়ে পায়চারি করছিলেন, তখন আলবদর বাহিনীর কয়েকজন সশস্ত্র কর্মী একটি জিপে করে গেটের সামনে এসে নামে। গোলাম মোস্তফার বাড়ি শনাক্ত করার জন্য তারা জোর করে তাদের সঙ্গে নিয়ে এসেছিল মোস্তফার সম্বন্ধি শামসুজ্জোহাকে। এদের দু’জন গেট পার হয়ে ভেতরে ঢোকে এবং গোলাম মোস্তফাকে বিশেষ কাজে তাদের সঙ্গে পূর্বদেশ অফিসে যাওয়ার অনুরোধ জানায়। তারা মোস্তফাকে জিপে করে কোনো অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। এরপর গোলাম মোস্তফার কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। বদর বাহিনীর লোকেরা তাঁকে হত্যা করে বলে জানা যায়।

বাংলাদেশ সরকারের ডাক বিভাগ জাতির জন্য তাঁর আত্মদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯১ সালের ১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে গোলাম মোস্তফার নামে স্মারক ডাকটিকিট প্রকাশ করে।  [মুয়ায্‌যম হুসায়ন খান]