মূল্য সংযোজন কর


মূল্য সংযোজন কর (মূসক)  হচ্ছে কোন পণ্য বা সেবার ক্ষেত্রে তার উৎপাদন ও বণ্টনের প্রতিটি পর্যায় শেষে সংযোজিত মূল্যের ওপর শতকরা হারের কর। মূসককে তিনভাবে শ্রেণিবদ্ধ করা যেতে পারে: ১ পর্যায়সমূহের অন্তর্ভুক্তির পরিধির ভিত্তিতে  সমগ্র উৎপাদন ও বণ্টন পর্যায়, অথবা সীমিতসংখ্যক পর্যায়ে গন্ডিবদ্ধ উৎপাদন ও পাইকারি পর্যায় বা পাইকারি ও খুচরা পর্যায়; ২. গণনা পদ্ধতির ভিত্তিতে কর রেয়াত পদ্ধতি, বিয়োজন পদ্ধতি এবং যোজন পদ্ধতি; এবং ৩. কর ব্যবস্থায় চূড়ান্ত দ্রব্য হিসেবে মূলধনি দ্রব্য, যেমন  যন্ত্রপাতি, কলকব্জা এবং সংভরণের প্রয়োগভিত্তিতে ভোগ-ধরন, আয়-ধরন এবং উৎপাদ-ধরন। অন্যভাবেও মূসককে তিনটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা হয়ে থাকে স্থূল জাতীয় উৎপাদন ধরন, আয় ধরন এবং ভোগ ধরন। ভোগ ধরনের মূসক একটি পরোক্ষ কর, কিন্তু আয় বা উৎপাদন ধরনের মূসককে প্রত্যক্ষ কর মনে করা যেতে পারে, যদিও পণ্যের ওপর কর হিসেবে তা বিবেচনা করা যৌক্তিক নয়। ভোগ-ধরনের মূসককে প্রায়শ বিক্রয় করের একটি বিকল্প প্রকার হিসেবে ধরা হয়।

১৯৭৯ সনের এপ্রিলে প্রথম বাংলাদেশে তৎকালীন করারোপ তদন্ত কমিশন সরকারিভাবে বিক্রয় করের বিকল্প হিসেবে মূসক চালুর কথা ভেবেছিল। ১৯৮২ সন পর্যন্ত বিক্রয় কর আদায় করা হতো বিক্রয় কর আইন ১৯৫১ অনুসারে। ১৯৮২ সনে বিক্রয় কর অধ্যাদেশ জারি করে ১ জুলাই থেকে পূর্ববর্তী আইন বাতিল ও প্রতিস্থাপন করা হয়। বাংলাদেশে মূসক চালুর প্রক্রিয়া শুরুর ক্ষেত্রে বিশ্ব ব্যাংক পথিকৃৎ-এর ভূমিকা পালন করেছে। ১৯৮৬ সনের ডিসেম্বরে বিশ্বব্যাংকের এক মিশন কর সংস্কারের একটি আলোচ্যসূচি প্রস্ত্তত করতে বাংলাদেশ সফর করে। উক্ত মিশন ১৫ অক্টোবর ১৯৮৯ সালে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে। উক্ত প্রতিবেদনের মাধ্যমে পরবর্তী তিন বৎসরের মধ্যে একক প্রমাণ কর-হারের একটি উৎপাদন তথা আমদানি পর্যায়ের মূসক চালু করার সুপারিশ করা হয়। এরপর বাংলাদেশের একটি কর মিশন ১৯৮৯ সনের ১৩ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন এবং থাইল্যান্ড সফর করে। উক্ত মিশনের কাছ থেকে ১৯৯০ সনের জানুয়ারিতে সুপারিশ পেয়ে সরকার মূসক চালুর ব্যাপারে বিভিন্ন সময়ে শীর্ষস্থানীয় শিল্প ও বণিক সমিতিসমূহসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাসমূহের সাথে ব্যাপক আলোচনা করে।

১৯৯০ সনের মধ্য জুনের কিছু আগে মূল্য সংযোজন কর আইন ১৯৯০ (খসড়া) তৈরি করা হয়। উক্ত আইনের চূড়ান্ত রূপ তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ৩১ মে ১৯৯১ তারিখে একটি অধ্যাদেশ হিসেবে জারি করেন। অধ্যাদেশের আটটি ধারা (যেগুলি মূসক পদ্ধতিতে নিবন্ধিত হওয়া এবং মূসক কর্তৃপক্ষের নিয়োগ ও ক্ষমতা সংক্রান্ত ছিল) ২ জুন ১৯৯১ থেকে এবং বাকি ধারাগুলি ১ জুলাই ১৯৯১ থেকে কার্যকরী করা হয়। জাতীয় সংসদে মূল্য সংযোজন কর বিল ১৯৯১ উত্থাপন করা হয় ১ জুলাই ১৯৯১ তারিখে এবং তা সংসদে পাস হয় ৯ জুলাই ১৯৯১ তারিখে। বিলটি পরদিন রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভ করে এবং মূল্য সংযোজন কর আইন ১৯৯১ হিসেবে কার্যকরী হয়। মূসক আইন জারির মাধ্যমে: ক. ১ জুলাই ১৯৯১ থেকে কারবারি টার্নওভার কর অধ্যাদেশ ১৯৮২ এবং বিক্রয় কর অধ্যাদেশ ১৯৮২ বাতিল করা হয়; খ. ১৯৯১-৯২ সালে করযোগ্য দ্রবের আমদানিকারক বা সরবরাহকারী (উৎপাদক) এবং করযোগ্য সেবা প্রদানকারীর বার্ষিক বিক্রয়ের পরিমাণ ৫ লাখ টাকা বা তার বেশি (১৯৯৩-৯৪ সালে ৭ লাখ ৫০ হাজার, ১৯৯৮-৯৯ সালে ১৫ লাখ, ২০০৭-০৮ সালে ২৪ লাখ এবং ২০০৯-১০ সালে ৪০ লাখ টাকা বা তার বেশি) হলে তার ওপর ১৫% হারে মূসক আরোপ করা হয়; গ. করযোগ্য দ্রব্যের সরবরাহকারী বা করযোগ্য সেবা প্রদানকরীর বার্ষিক বিক্রয়ের পরিমাণ ১৫ লাখ টাকার কম হলে (বর্তমানে ৪০ লাখ টাকার কম হলে) ২% হারে (বর্তমানে ৪% হারে) টার্নওভার কর আরোপ করা হয়; ঘ. নতুন আইন অনুযায়ী যে কোন দ্রব্য বা সেবার রপ্তানির ক্ষেত্রে শূন্যহারের মূসক আরোপ করা হয়; ঙ. আবগারি শুল্কের আওতা খুবই নিম্নপর্যায়ে নিয়ে আসা হয় এবং আবগারি শুল্কযোগ্য দ্রব্য ও সেবাসমূহকে মূসকের আওতায় স্থানান্তর করা হয়; এবং চ. বিলাসদ্রব্য ও আবশ্যক নয় এবং সামাজিকভাবে অনভিপ্রেত দ্রব্য বা সেবার ওপর ১০-৮৫% হারে সম্পূরক শুল্ক আরোপ করা হয়।

যে সব লক্ষ্য সামনে রেখে বাংলাদেশে মূসক চালু করা হয়, সেগুলি হলো: ক. করারোপ পদ্ধতিতে স্বচ্ছতা আনয়ন, খ. উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে করের ওপর করারোপ বা জলপ্রপাত করারোপ বন্ধকরণ, গ. কর প্রশাসনকে সুসংহতকরণ, ঘ. অধিকতর অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণের মাধ্যমে সমগ্র অর্থনীতিকে সক্রিয়করণ, এবং ঙ. কর-স্থূল দেশজ উৎপাদন অনুপাতে সামঞ্জস্য আনয়ন।

১ জুলাই ১৯৯১ চালু হওয়া মূসক হলো প্রাথমিকভাবে এক ধরনের ভোগ কর (মূলধনি দ্রব্যের ক্রয়কে উপকরণ হিসেবে অনুমোদন করার মাধ্যমে), যার ব্যাপ্তি ছিল আমদানি, উৎপাদন বা প্রস্ত্ততকরণ এবং সেবাপ্রদান পর্যায় পর্যন্ত। সেক্ষেত্রে রপ্তানি (যা ছিল শূন্য করহারের), পাইকারি ও খুচরা পর্যায় কর-বহির্ভূত ছিল। ১৯৯৬-৯৭ অর্থবৎসর থেকে বাংলাদেশে প্রচলিত মূসক পাইকারি ও খুচরা পর্যায়কে অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে একটি ব্যাপকভিত্তিক ভোগব্যয় কর-এ পরিণত হয়েছে।

যে সমস্ত পণ্য ও সেবার উপর মূসক আরোপ করা হয় তা হলো: জারিকৃত মূসক অধ্যাদেশের প্রথম তফসিলে উল্লেখিত পণ্য ছাড়া আমদানিকৃত সকল পণ্যের উপর মূসক অধ্যাদেশের তফসিলে উল্লেখিত পণ্য ছাড়া সকলদেশে সরবরাহকৃত সকল পণ্যের উপর, জারিকৃত মূসক অধ্যাদেশের দ্বিতীয় তফসিলে উল্লেখিত ছাড়া বাংলাদেশের সকল সেবা খাতে।

মূসকের প্রমাণ কর-হার অপরিবর্তিতভাবে ১৫%-এ স্থিরীকৃত রয়েছে (করযোগ্য দ্রব্য ও সেবার জন্য), যদিও শূন্য কর-হারও আছে (রপ্তানিকৃত দ্রব্য এবং বাংলাদেশের বাইরে ভোগের জন্য বাংলাদেশ থেকে বহির্গামী যানবাহনে সরবরাহকৃত খাদ্য ও অন্যান্য দ্রব্যের জন্য)। নির্ধারিত সেবার ক্ষেত্রে সংকুচিত মূল্যভিত্তি ব্যবহারের কারণে বাস্তবে কার্যকরী করহারের সংখ্যা অনেক হলেও, মূসক হার একটি একক সমহারের কর-হার। টার্নওভার করের হারও সমরূপ, যা ৪% (১১ জুন ১৯৯৭ পর্যন্ত ছিল ২%)। কিন্তু সম্পূরক শুল্ক হারের সংখ্যা অনেক। শুরুতে ১৯৯১-৯২ অর্থবৎসরে সম্পূরক শুল্ক হারের সংখ্যা ছিল ৫টি (সর্বনিম্ন ১০%, সর্বোচ্চ ৮৫%)। ২০০১-০২ সালে সম্পুরক শুল্কহার ছিল ১২ স্তর বিশিষ্ট ২.৫% থেকে ৩০%। ২০০০-০১ অর্থবছরে সর্বোচ্চ ১৮টি স্বরে সম্পুরক ৩৫% থেকে ৩৫০% পর্যন্ত শুল্ক ছিল। ২০০০-০১ অর্থবছরে সম্পুরক শুল্ক ছিল ২৯টি (কফির উপর সর্বনিম্ন ২.৫% থেকে সিগারেটের উপর সর্বোচ্চ ৩৫০%)। তারমধ্যে ১১টি মৌলিক শুল্কহার যুক্ত করে ১.৫% থেকে ৩০%। ২০০৭-০৮ ও ২০০৮-০৯ অর্থবৎসরে সম্পূরক শুল্ক হারের সংখ্যা ছিল ২টি (সর্বনিম্ন ২০% এবং সর্বোচ্চ ৬০%)। তবে ২০০৮-০৯ অর্থবৎসরে সম্পূরক শুল্ক হারের সংখ্যা ৪টিতে বৃদ্ধি করা হয় (২০%, ৩০%, ৪৫% এবং ৬০%) যেখানে উচ্চহারে যথা ১০০%, ২৫০% এবং ৩৫০% পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা হয়। সম্পুরক শুল্ক সাপেক্ষে করযোগ্য সেবা তিনটি (২০০৮-০৯ অর্থবছরে ১০%, ১৫%, এবং ৩৫%; ২০০৯-১০ অর্থবছরে ১৫%, ২৫% এবং ৩৫%)।

প্রকৃত মূল্য সংযোজন গণনার জন্য দ্রব্য বা সেবা সংক্রান্ত লেনদেনের বিস্তারিত হিসাব রাখা দরকার, যেটা বাংলাদেশে সাধারণভাবে অনুপস্থিত বলা যায়। সেবার ওপর মূসক আরোপের জন্য প্রশাসনিক ঝামেলা এড়াতে নির্ধারিত ক্ষেত্রে তাই উপকরণ কর-রেয়াত পরিহার সাপেক্ষে সংকুচিত মূল্যভিত্তি স্থির করে দেওয়া হয়েছে, যেক্ষেত্রে উক্ত ভিত্তির ওপর প্রমাণ কর-হার প্রয়োগ করে চূড়ান্ত কর-দায় গণনা করা হয়। মূসক পদ্ধতিতে করারোপ বিন্দু নির্ভর করে উৎপাদন ও বণ্টন পর্যায়ের ওপর। আমদানিকৃত দ্রব্যের ক্ষেত্রে বহিঃশুল্ক আইন ১৯৬৯-এর অধীনে আমদানি শুল্ক প্রদানের সময়ই মূসক প্রদান করতে হয়। কোন মূসক নিবন্ধিত ব্যক্তি তার ব্যবসায় পরিচালনা বা সম্প্রসারণকালে উৎপাদিত বা প্রস্ত্ততকৃত অথবা আমদানিকৃত, ক্রীত, অর্জিত বা অন্যকোনভাবে সংগৃহীত দ্রব্যের জন্য নিম্নে উল্লেখিত যে কাজটি আগে সংঘটিত হবে, সে সময়ে মূসক প্রদেয় হবে:

ক. যখন পণ্য অর্পণ করা বা সরবরাহ করা হয়; খ. যখন পণ্য সরবরাহ সংক্রান্ত চালানপত্র প্রাদান করা হয়; গ. যখন পণ্য ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করা হয়; এবং ঘ. যখন আংশিক বা পূর্ণ মূল্য পাওয়া যায়।

কোন মূসক নিবন্ধিত ব্যক্তি কর্তৃক ব্যবসায় পরিচালনা বা সম্প্রসারণ কালে প্রদত্ত সেবার ওপর পরে উল্লেখিত যে কাজটি আগে সংঘটিত হবে সে সময়ে মূসক প্রদেয় হবে:

ক. যখন সেবাপ্রদান করা হয়; খ. যখন সেবাপ্রদান সংশ্লিষ্ট চালানপত্র প্রদান করা হয়; এবং গ. যখন আংশিক বা পূর্ণ মূল্য পাওয়া যায়।

কোন দ্রব্য বা দ্রব্যশ্রেণীর জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা যদি আদেশ দেয় যে উক্ত দ্রব্যের মোড়ক, বাহন বা আধারের ওপর নির্ধারিত মূল্যের নিরাপত্তা পদ্ধতিবিশিষ্ট স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোল বা বিশেষ প্রতীক বা চিহ্ন ব্যবহার করতে হবে, তবে উক্ত স্ট্যাম্প বা ব্যান্ডরোল বা বিশেষ প্রতীক বা চিহ্নের মূল্যমানকে প্রদেয় মূসক হিসেবে ধরা হবে। নির্মাণ সংস্থা, ইনডেন্টিং সংস্থা, ট্রাভেল এজেন্সি, মোটরযান-শালা ও কারখানা, পোতাঙ্গন এবং সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা নির্ধারিত অন্যকোন সেবার ক্ষেত্রে মূসক দেওয়া হয় আটকে-রাখা কর হিসেবে। সেবা গ্রহণকারী বা, ক্ষেত্রমতো মূল্য বা কমিশন পরিশোধকারী ব্যক্তিকে সেবামূল্য বা কমিশন পরিশোধকালে মূসক উৎসে আদায়, কর্তন ও সরকারি কোষাগারে জমা করতে হবে।

করের মাধ্যমে যথেষ্ট সম্পদ সংগ্রহে বাংলাদেশ অক্ষম। দক্ষিণ এশিয়ায় কর-স্থূল দেশজ উৎপাদ অনুপাত এমনিতে কম, সেক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থা আরও নাজুক। বাংলাদেশের কর-স্থূল দেশজ উৎপাদিত পণ্যের ৯%-এর সামান্য বেশি, যা দক্ষিণ এশিয়ার গড় ১১%, উন্নয়নশীল দেশসমূহের গড় ১৫%, শিল্পায়িত দেশসমূহের গড় ৩০% ও উচ্চ আয়সম্পন্ন দেশসমূহের গড় ২৪%-এর চেয়ে কম। মূসক প্রবর্তনের ফলে বাংলাদেশের কর রাজস্ব সংগ্রহ তথা কর-স্থূল দেশজ উৎপাদ অনুপাত তাৎপর্যপূর্ণভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ১৯৯০-৯১ অর্থবছরে মোট আদায়কৃত বিক্রয়কর এবং আবগারি শুল্কের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ৫ শত ৫০ কোটি টাকা (২৫.৫ বিলিয়ন টাকা)। মূসক চালুর প্রথম বছরে (১৯৯১-৯২) মূসক ও আবগারি শুল্ক একত্রে আদায়ের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ১ শত ৪০ কোটি টাকা (৩১.৪ বিলিয়ন টাকা) যা পূর্ববর্তী বছরের বিক্রয়কর ও আবগারি শুল্কের চাইতে ২৩.৩% বেশি এবং মূসক অধ্যাদেশের আওতায় আদায়কৃত কর ও আবগারি শুল্ক একত্রে ৩ হাজার ১ শত ৯০ কোটি টাকা (৩১.৯ বিলিয়ন টাকা) যা পূর্ববর্তী বছরের বিক্রয় ও আবগারি শুল্কের তুলনায় ২৫.৩% বেশি। মূসক প্রবর্তনের পূর্বে পাঁচ বছরে (১৯৮৬-৮৭ থেকে ১৯৯০-৯১) আদায়কৃত করের বিক্রয় কর ও আবগারি শুল্কের অংশ ছিল গড়ে ৩৮.৯%। মূসক প্রবর্তনের পরে মূসক আইনের আওতায় (মূসক এস.ডি ও টি.টি) সামগ্রিকভাবে কর আদায়ের পরিমাণ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পায়। ১৯৯১-৯২ থেকে ১৯৯৫-৯৬ সময়কালে আদায়কৃত করের মধ্যে শুধুমাত্র মূসকের অংশ ছিল ২৮.৫% এবং মূসক আইনে মোট করের (মূসক এস.ডি ও টি.টি) অংশ ছিল গড়ে ৩৯.৮%। ২০০৬-২০০৭ থেকে ২০০৯-১০ সময়কালে গড়ে এই হার শুধু মূসকের ক্ষেত্রে ছিল ৩৫.৭% এবং মূসক এ.ডি ও টি.টি’র অংশ ছিল ৫১.৭%।

টাকার অঙ্কে মূসক ও আবগারি শুল্কের যৌথ বার্ষিক বৃদ্ধি পূর্বের বিক্রয় কর ও আবগারি শুল্কের যৌথ বার্ষিক বৃদ্ধির তুলনায় অনেক বেড়েছে। কিন্তু আপেক্ষিক বিচারে আশির দশকে মোট করের শতাংশ হিসেবে বিক্রয় কর ও আবগারি শুল্কের পরিমাণ মূসক চালুর পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত মোট করের শতাংশ হিসেবে মূসক ও আবগারি শুল্কের পরিমাণ মোটামুটি একই ধরনের। বিভিন্ন নির্দেশ-এর (অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য কর, বৈদেশিক বাণিজ্য কর, পরোক্ষ কর, মোট কর, মোট স্থূল দেশজ উৎপাদ এবং অ-কৃষিজ স্থূল দেশজ উৎপাদ) শতকরা হিসেবে মূসকের হার ক্রমবর্ধনশীল এবং শতকরা হারও লক্ষণীয়। গড়ে মোট করের ৭৫% ভাগ (২০০৯-১০ সালের বাজেটে ৭০%) আসে পরোক্ষ কর থেকে, আবার পরোক্ষ করের অর্ধেকেরও বেশি আসে মূসক থেকে (২০০৯-১০ সালের বাজেটে ২২৭.৯ বিলিয়ন টাকা লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে যা আদায়যোগ্য করের ৫০.২%)। অ-কৃষি খাতই হলো প্রধানত মূসকের অধীন, কিন্তু ১৫% প্রমাণ করহারে মূসক অ-কৃষিজ স্থূল দেশজ উৎপাদের মাত্র ৩-৪%।

বাংলাদেশে মূসক চালু করা হয়েছে করভিত্তি (বা মূল্য সংযোজন) নির্ণয়ের সময় উৎপাদন মূল্য (করযোগ্য দ্রব্য ও সেবার বিক্রয়লব্ধ অর্থ) থেকে মূলধনি দ্রব্যের পূর্ণ মূল্য উপকরণ হিসেবে বাদ দেওয়ার অনুমোদন দিয়ে এবং এ কারণে মূসক একটি ভোগ কর। যদিও মূসকের প্রাথমিক আওতা ছিল আমদানি ও উৎপাদন পর্যায় পর্যন্ত, তবে ১৯৯৬-৯৭ থেকে মূসক নেটওয়ার্ক পাইকারি ও খুচরা পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত। জুলাই ২০১০ সালের তথ্য অনুযায়ী মূসক আরোপযোগ্য সেবার সংখ্যা হলো ২৯ (২৪টি শিরোনামা সংখ্যার অধীনে), কিন্তু বর্তমানে এ সংখ্যা তত্ত্বীয়ভাবে অসীম, যদিও ব্যবহারিক উদ্দেশ্যে মূসক আরোপের জন্য ৭১টি শিরোনামা সংখ্যার অধীনে ৯৩টি সেবার আওতা সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে (জুলাই ২০১০)। মূসক আইনের পথম তফশিলে তালিকাভুক্ত প্রাথমিক অপ্রক্রিয়াজাত কৃষিজ দ্রব্য ও খাদ্যদ্রব্যকে (জীবন্ত প্রাণী বা হাঁস-মুরগি, মানুষের বা প্রাণির চুল, প্রাণীর অঙ্গের অংশ, প্রাণিজ দ্রব্য, গাছের অংশ, কাঁচা বা শুষ্ক শাকসবজি, ফল, অপ্রক্রিয়াজাত মসলা, খাদ্যদ্রব্য, তৈল বীজ, প্রাকৃতিক আঠা বা ঐ ধরনের দ্রব্য, কাঠ, অপরিষ্কৃত উল বা তুলা এবং কাঁচা পাট) শুধু মূসকের আওতা বহির্ভূত রাখা হয়েছে। ফলে প্রায় সমগ্র অর্থনীতি এখন মূসক নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত এবং আশা করা হয়, ভোগ-কর হিসেবে মূসক অর্থনৈতিক কার্যক্রমকে সুশৃঙ্খল করবে। সম্পূরক শুল্ক আরোপের মাধ্যমে উক্ত শৃঙ্খলা অর্জনের ক্ষেত্রে আরও সংশোধনী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। [রফিকুল ইসলাম এবং স্বপন কুমার বালা]