মুন্ডা


মুন্ডা  বাংলাদেশে বসবাসরত অন্যতম আদিবাসী জনগোষ্ঠী। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চল, সিলেট জেলার চা বাগান এবং বৃহত্তর যশোর এবং খুলনা জেলায় এদের বসবাস।

মুন্ডারা নিজেদের মধ্যে মুন্ডারী ভাষায় কথা বলে। সেটা মৌখিক। তাদের মধ্যে কেউ এই ভাষাকে খরটাই, কেউ আবার নাগরী ভাষা বলে। ভাষা বিজ্ঞানীরা তাদের সে ভাষাকে কোলারিয়ান দলভুক্ত এবং অস্ট্রিক ভাষার অন্তর্ভুক্ত  বলে মনে করেন। মুন্ডারা বহু গোত্রে বিভক্ত। তাদের মতে, গোত্র হলো বংশের পরিচয়। যেমন: টপ, কছুয়া, রাজফূত, উৎকুমার, নগড়ুয়া, বাঘ প্রভৃতি। গোত্রগুলির প্রধান দায়িত্বই হচ্ছে সামাজিক নিয়ম-শৃঙ্খলা বিধান এবং বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন নিয়ন্ত্রণ করা। মুন্ডা সমাজ অসমবর্ণ প্রথায় বিশ্বাসী। সামাজিক আচার অনুষ্ঠান এবং বিচার ব্যবস্থায় গোত্রের নিজস্ব নিয়ম-নীতি বিদ্যমান। গোত্রগুলি সম-মর্যাদা সম্পন্ন।

মুন্ডাদের পোশাকের নাম হাতকা। আগে বিয়েতে তারা লালপাড়ের সাসা শাড়ীতে হলুদ রং দিয়ে রং করে নিতেন। অবস্থাপন্ন মুন্ডারা কানে, নাকে, গলায় এবং হাতে স্বর্ণের অলংকার ব্যবহার করেন। আগে তারা চান্দির তৈরি বিভিন্ন রকমের গহনা যেমন হাতের বালা, বাজু, পায়ের-পাঁয়রি, ঝাটিয়া, বাঁক, কানের-কানফুলি, পিপর পাতা, মাথার চুর, গলার হাঁসুলি, মাদুলি ইত্যাদি পরতেন।

অভিভাবকদের পছন্দমাফিক প্রাপ্তবয়স্ক বিয়েই এ সমাজে প্রচলিত। স্বগোত্রে বিয়ে সমাজে নিষিদ্ধ। এ সম্প্রদায়ের মধ্যে কনেকে পণ দেওয়ার প্রথা রয়েছে। উনিশ শতকের শেষদিকের এক সমীক্ষা থেকে দেখা যায়, সে সময় কনেপণ ছিল ৪ টাকা থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত। সিঁদুরদান অর্থাৎ বর-বধূ উভয়ের কপালে সিঁদুর লাগানো ছিল বিয়ের একটি অত্যাবশ্যকীয় অংশ। মুন্ডা বিধবারা সাগাই নামক ধর্মীয় প্রথার মাধ্যমে আবার বিয়ে করতে পারে। বিবাহ বিচ্ছেদ হতে পারে উভয় পক্ষের সম্মতিতে, তবে বিপথগামী মহিলার ক্ষেত্রে ব্যভিচারী পুরুষটিকে মহিলার স্বামীর দেওয়া পণের পুরো টাকা ফেরত দিতে হয়।

বিয়ের পরে একজন মুন্ডা ছেলে তার স্ত্রীসহ দুই পরিবারেরই সদস্য হয়ে থাকে। মৃত্যুর পর মুন্ডাদের মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলাই রীতি। কিন্তু কাঠের দাম বেশি বলে এখন তারা প্রতীকীভাবে মুখাগ্নি করে এবং তারপর মৃতদেহ কবর দেয়।

ধর্ম বিশ্বাসে মুন্ডারা প্রকৃতি পূজারী। তাদের প্রধান দেবতা হচ্ছেন শিং বোঙ্গা। তাদের মতে, তিনিই এ বিশ্বব্রহ্মান্ড সৃষ্টি করেছেন এবং পরিচালনা করছেন। অন্য প্রধান দেবতা হচ্ছেন মারাংবুরু, যার দায়িত্ব হচ্ছে এ বিশ্বের সমস্ত সৃষ্ট জীবের মঙ্গল সাধন করা। আজকাল অনেকে বৈষ্ণব ধর্মের দীক্ষা নিয়ে থাকেন।

গ্রাম পূজা মুন্ডাদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব হলেও এখন আর খুব জাঁকজমক করে এটা করা হয় না। ভাদ্র মাসে হয় কারাম পূজা। যেখানে কারাম হয় সেখানে নারী ও পুরুষেরা এক অপরের হাত ধরে মাদল, জুড়ি ইত্যাদির তালে তালে ঘুরে ঘুরে নাচে ও গান গায়। একই মাসে হয় মনসা পূজা। এর বাইরে দূর্গাপূজা, স্বরস্বতী পূজা এবং লক্ষ্মী পূজাও হয়।  [এনামুল হক]