মুখোপাধ্যায়, হরিসাধন


মুখোপাধ্যায়, হরিসাধন (১৮৬২-১৯৩৮)  সাহিত্যিক। ১৬ আগস্ট ১৮৬২ সালে কলকাতার খিদিরপুরের ভূকৈলাসে এক সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ বংশে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্বপুরুষ রাজেন্দ্র বিদ্যাবাগীশ একজন ব্রহ্মদেশপূজ্য নৈয়ায়িক পন্ডিত ছিলেন। তিনি নদীয়াধিপত্য মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের বিশিষ্ট সভাসদ ছিলেন। হরিসাধনের পিতৃদেব গিরিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় আদিনিবাস শান্তিপুর ত্যাগ করে কাজের সুবাদে কলকাতার ভূকৈলাসে বাড়ি নির্মাণ করে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন।

১৮৭৫ সালের নভেম্বর মাসে হরিসাধন খিদিরপুর-স্কুল হতে বৃত্তি পরীক্ষা দিয়ে বৃত্তি লাভ করেন। ওই সময়ে তার বিয়ে হয়। ১৮৮২ সালের ডিসেম্বর মাসে তিনি হেয়ার স্কুল হতে প্রবেশিকা পরীক্ষা পাস করেন। তিনি এলএ পড়ার জন্য প্রথমে ডভ্টন কলেজে স্বল্পসময় অধ্যয়ন করেন। পরে সিটি কলেজে তাঁর কলেজ জীবনের অবসান হয়। তিনি প্রায় ৩৫ বৎসর সরকারি চাকরি করে ১৯১৯ সালে অবসর গ্রহণ করেন।

হরিসাধনের ২৩ বৎসর বয়সে অক্ষয়চন্দ্র সরকার সম্পাদিত উচ্চমানের মাসিকপত্র নবজীবন এ তাঁর প্রথম রচনা ‘প্রাচীন কলিকাতা’ ছাপা হয়। লেখাটি বাংলা ১২৯১ সনের ফাল্গুন-সংখ্যায় প্রথম প্রবন্ধরূপে মুদ্রিত হয়। এর পূর্বে তিনি বঙ্কিমচন্দ্র ও বঙ্কিমচন্দ্রের জামাতা প্রচার পত্রিকার সম্পাদক রাখালচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়ের সংস্পর্শে আসেন। হরিসাধনের দ্বিতীয় প্রবন্ধটি ‘ধ্বংসতরু’ নামে প্রচারে প্রকাশিত হয়। এ ধ্বংসতরু যেখানে ছিল, লর্ড কার্জন সে স্থানটি Duel Avenue বলে চিহ্নিত করে গেছেন। উক্ত প্রবন্ধটি পাঠ করে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ভুয়সী প্রশংসা করে বললেন-‘‘তোমার লেখায় বেশ Research আছে’’। পরে ওই প্রবন্ধটি পরিবর্তিতরূপে স্বর্ণকুমারী দেবীর ভারতী-তে প্রকাশিত হয়। বাংলা ১২৯২ সন হতে হরিসাধনের রচনা স্বর্ণকুমারী দেবী সম্পাদিত ভারতী ও বালকে নিয়মিত ছাপা হতো। তাছাড়া ভ্রমর, সাহিত্য, সাধনা, প্রদীপ, ঐতিহাসিক চিত্র প্রবাসী, ভারতবর্ষ, জাহ্নবী, অর্চ্চনা, মানসী, বসুধা প্রভৃতি মাসিকপত্রে তাঁর রচনা ছাপা হতো।

দীর্ঘ সাহিত্য জীবনে হরিসাধন পঞ্চাশটি উপন্যাস, তিনটি নাটক, কলকাতার ইতিহাসবিষয়ক সহস্রাধিক পৃষ্ঠার একটি গ্রন্থ এবং অসংখ্য প্রবন্ধ লিখেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ: পঞ্চপুষ্প (১৮৯২), শীশ্ মহল (১৯১২), ছায়াচিত্র (১৯০১), রঙ্গমহাল  (১৯০১), নূরমহল (১৯১৩), রঙ্গমহল রহস্য (১৯১৪), কলিকাতা-সেকালের ও একালের (১৯১৫), সতীলক্ষ্মী (১৯১৫), সুবর্ণ-প্রতীমা (১৯১৬), লাল-চিঠি (১৯১৬), কঙ্কণ-চোর (১৯১৬), মৃত্যু-প্রহেলিকা (১৯১৭), স্বর্ণ-প্রতিমা (১৯১৭), মরণের পরে (১৯১৭), কমলার অদৃষ্ট (১৯১৭), শাহজাদা খসরু (১৯১৮), শয়তানের দান (১৯১৯), সতীর সিন্দুর (১৯২০), ঔরঙ্গজেব (১৯০৪), বঙ্গবিক্রম (১৯০৬)। তাঁর ঐতিহাসিক নাটক বঙ্গবিক্রম ন্যাশনাল থিয়েটারে অভিনীত হয়ে ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করেছে। তাঁর মৃত্যু ২০ এপ্রিল, ১৯৩৮। [শামীমা আক্তার]