মুক্তিবাহিনী


মুক্তিবাহিনী  বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সংগঠিত সশস্ত্রবাহিনী। শুরুতে এর নাম ছিল মুক্তিফৌজ। ১৯৭১ সালের মার্চের শুরু থেকে দেশের শহর ও গ্রাম এলাকায় ছাত্র ও যুব নেতৃবৃন্দের উদ্যোগে গঠিত সংগ্রাম পরিষদের কর্মীরাই পরবর্তী সময়ে সংগঠিত হয়ে মুক্তিফৌজ ও মুক্তিবাহিনী গঠন করে। তবে কখন কিভাবে এর সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে ওঠে এবং কিভাবে এর নাম মুক্তিবাহিনী হয়, সেসব বিষয়ে সুস্পষ্ট দালিলিক তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। মুক্তিবাহিনীর সদস্যদের মূলত দুই শ্রেণীতে ভাগ করা যায়: প্রথম শ্রেণীর সদস্যরা ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয়তাবাদী সেনাবাহিনীর সদস্যবৃন্দ, অন্যভাগ আসে ইতিপূর্বে শহর ও গ্রামে সংগঠিত সংগ্রাম পরিষদের বিভিন্ন শাখার সদস্য ও তাদের অনুসারী বেসামরিক জনগণ থেকে।

মুক্তিযোদ্ধার দল

১৯৭১ সালের ১২ এপ্রিল কর্নেল (পরবর্তীকালে জেনারেল) এম.এ.জি ওসমানী তেলিয়াপাড়ায় বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ১৭ এপ্রিল তারিখে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে সশস্ত্র বাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি ঘোষণা করা হয়। বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীকে সংগঠিত করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় জুলাই মাসের ১১ থেকে ১৭ তারিখের মধ্যে। কলকাতায় অনুষ্ঠিত সেক্টর কমান্ডারদের এক সভায় যুদ্ধের বিভিন্ন দিক, বিদ্যমান সমস্যাবলি এবং ভবিষ্যৎ কৌশল বিবেচনায় চারটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এই সিদ্ধান্তসমূহ ছিল:

১.  যোদ্ধাদের দল গঠন এবং যুদ্ধের কৌশল হবে নিম্নরূপ: (ক) ৫ থেকে ১০ জন প্রশিক্ষিত সদস্যকে নিয়ে গঠিত গেরিলা দল তাদের উপর অর্পিত সুনির্দিষ্ট কাজের দায়িত্বসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নির্ধারিত এলাকায় প্রেরণ করা হবে; (খ) যোদ্ধারা শত্রুর বিরুদ্ধে সম্মুখ আক্রমণ পরিচালনা করবে এবং তাদের শতকরা ৫০ ভাগ ও তদূর্ধ্ব অস্ত্রশস্ত্র বহন করবে। শত্রুবাহিনী সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করার জন্য স্বেচ্ছাসেবী গোয়েন্দা নিয়োগ করা হবে এবং তাদের ৩০ শতাংশকে অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত করা হবে।

২.  নিয়মিত সৈন্যদের বিভিন্ন ব্যাটালিয়ন ও সেক্টরে সংঘবদ্ধ করা হবে।

৩.  শত্রুর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনার সময় নিম্নবর্ণিত কৌশলসমূহ প্রয়োগ করা হবে: (ক) ঝটিকা বা অতর্কিত আক্রমণ এবং লুকিয়ে থেকে শত্রুর উপর আক্রমণ পরিচালনার জন্য বিপুলসংখ্যক গেরিলা যোদ্ধা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রেরণ করা হবে; (খ) শিল্প-কারখানা অচল করে দেওয়া হবে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন করা হবে; (গ) তৈরি পণ্য অথবা কাঁচামাল রপ্তানিতে পাকিস্তানীদের বাধা দেওয়া হবে; (ঘ) শত্রুর চলাচলে বাধা সৃষ্টির জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থা ধ্বংস করে দেওয়া হবে; (ঙ) কৌশলগত সুবিধা লাভের লক্ষ্যে শত্রুবাহিনীকে বিক্ষিপ্তভাবে ছড়িয়ে দিতে হবে এবং (চ) বিচ্ছিন্ন শত্রু সেনাদের নির্মূল করার লক্ষ্যে তাদের উপর আক্রমণ পরিচালনা করা হবে।

৪.  বাংলাদেশের সমগ্র অঞ্চলকে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করা হবে।

নিয়মিত এবং অনিয়মিত বাহিনী  প্রতিরক্ষা বাহিনীর নিয়মিত সদস্যদের নিয়ে তিনটি বাহিনী গঠন করা হয়: মেজর জিয়াউর রহমানের অধীনে জেড ফোর্স, খালেদ মোশারফের অধীনে কে ফোর্স এবং কে.এম শফিউল্লাহর নেতৃত্বে এস ফোর্স। সৈনিকদের অধিকাংশই এসেছিল পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস্ এবং ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট থেকে। পূর্ব পাকিস্তান রাইফেল্স, পুলিশ এবং সেনাবাহিনীর  যেসব সদস্যকে এই বাহিনীগুলিতে অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি, তাদের বিভিন্ন সেক্টরে যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য কয়েকটি ইউনিট এবং সাব-ইউনিটে বিভক্ত করা হয়। যাদের গেরিলা যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য প্রশিক্ষণ দান করা হয়, তারা ছিল অধিকাংশই অনিয়মিত বাহিনীর সদস্য। এছাড়া, কতিপয় স্বতন্ত্র বাহিনীও  বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এবং অনেক এলাকা মুক্ত করে। এগুলির মধ্যে ছিল মুজিব বাহিনী, কাদেরিয়া বাহিনী, আফসার ব্যাটালিয়ন এবং হেমায়েত বাহিনী।

বাংলাদেশ নৌবাহিনী  ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশ নৌবাহিনী গঠন করা হয়। প্রাথমিক অবস্থায় এই বাহিনীর ছিল দুটি জাহাজ এবং ৪৫ জন নৌসদস্য। জাহাজ দুটি পাকিস্তানি নৌবহরের উপর বেশ কয়েকটি সফল আক্রমণ পরিচালনা করে। কিন্তু দুটি জাহাজই ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর ভুলবশত ভারতীয় জঙ্গী বিমান দ্বারা আক্রান্ত ও ধ্বংস প্রাপ্ত হয়। এই সময় জাহাজ দুটি মংলা সমুদ্র বন্দরে একটি বড় ধরনের আক্রমণ পরিচালনা করতে যাচ্ছিল।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনী  ভারতের নাগাল্যান্ড রাজ্যের ডিমাপুরে ২৮ সেপ্টেম্বর এয়ার কমোডর এ.কে খোন্দকারের অধিনায়কত্বে এর কর্মকান্ড শুরু হয়। প্রারম্ভিক অবস্থায় এটি ১৭ জন কর্মকর্তা, ৫০ জন কলাকুশলী এবং ২টি উড়োজাহাজ ও ১টি হেলিকপ্টারের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল। বিমানবাহিনী পাকিস্তানি লক্ষ্যবস্ত্তসমূহের উপর বারোটির অধিক ঝটিকা আক্রমণ চালায় এবং ডিসেম্বর মাসের গোড়ার দিকে ভারতীয় আক্রমণের প্রাথমিক পর্যায়ে যথেষ্ট সফলকাম হয়।

চূড়ান্ত পর্যায়ে মুক্তিবাহিনী ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাস থেকে মুক্তিবাহিনী শত্রুর বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে ঝটিকা আক্রমণ শুরু করে। ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসে ভারত-সোভিয়েত চুক্তি স্বাক্ষরের পর বাংলাদেশ যুদ্ধে ভারত অধিকতর আগ্রহ দেখাতে শুরু করে। অবশেষে, ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ ভারত সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত হয়। বস্ত্তত নভেম্বর মাস থেকেই ভারতীয় সৈন্যরা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়ে আসছিল। এ সময় মুক্তিযোদ্ধারা বেলুনিয়া অভিযান পরিচালনা করে।

বাংলাদেশের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে খুব দ্রুত যুদ্ধ জয় সহজ ছিল না। তা সত্ত্বেও মাত্র দুই সপ্তাহ সময়ের মধ্যে ঢাকাকে  মুক্ত করা সম্ভব হয়। পূর্ববর্তী কয়েক মাসে মুক্তিযোদ্ধাদের সাফল্য ছিল এর অন্যতম সহায়ক কারণ।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর চতুর্দশ ডিভিশনের অধিনায়ক মেজর জেনারেল জমশেদ মিরপুর ব্রিজের নিকট ভারতীয় জেনারেল নাগরার কাছে আত্মসমর্পণ করে। ঐ দিন সকাল দশটা চল্লিশ মিনিটে ভারতীয় মিত্রবাহিনী এবং কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনীর একটি সেনাদল ঢাকা নগরীতে প্রবেশ করে। এটি ছিল নয় মাস দীর্ঘ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পরিসমাপ্তির সংকেত। দেশের বিভিন্ন স্থানে তখনও বিচ্ছিন্নভাবে যুদ্ধ চলছিল।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক লে. জেনারেল আমীর আব্দুল্লাহ খান নিয়াজী ভারত-বাংলাদেশ যৌথবাহিনীর অধিনায়ক এবং ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের প্রধান লে. জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরার নিকট আত্মসমর্পণ করে। আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ বাহিনীর প্রতিনিধিত্ব করেন গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ.কে খোন্দকার। [হেলাল উদ্দিন আহমেদ]