মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, কবিকঙ্কন


মুকুন্দরাম চক্রবর্তী, কবিকঙ্কন  (আনু. ১৫৪০-১৬০০)  মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের কবি। তাঁর পৈতৃক নিবাস ছিল পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার দামুন্যা গ্রামে। পিতা রাঢ়ীয় বংশজাত ব্রাহ্মণ হূদয় মিশ্র (মিশ্র তাঁদের নবাব প্রদত্ত উপাধি) এবং মাতা দৈবকী।

মধ্যযুগের বাঙালি কবিদের সম্পর্কে তথ্য প্রায়ই জনশ্রুতি বা পুরুষানুক্রমিকভাবে প্রাপ্ত কাহিনী, বিশ্বাস বা প্রথার ওপর নির্ভরশীল। এ সম্পর্কে সঠিক তথ্য যাচাই করা অসম্ভব। চন্ডীমঙ্গলের রচয়িতা মুকুন্দরাম এবং অন্যান্য পাঁচালি (বিশেষত দেব-দেবীর মহিমা কীর্তন করে রচিত গাথা) লেখকদের সম্পর্কে তাঁদের রচিত গাথায় যে আত্মজীবনীমূলক তথ্য পাওয়া যায়, সেগুলিই তাঁদের জীবনীর অধিকতর যথার্থ উৎস প্রদান করে। মুকুন্দরামের রচনাবলিতে এরূপ দুটি সংক্ষিপ্ত-বিবরণী (notes) পাওয়া যায়। এসব বিখ্যাত সংক্ষিপ্ত বিবরণী মধ্যযুগের বাঙালি অধ্যুষিত গ্রামের, বিশেষ করে সেসব গ্রামের কৃষি নির্ভরশীল জীবিকা নির্বাহী ব্রাহ্মণ পরিবারের জীবন্ত জীবনচিত্র প্রদান করে।

আমরা দুটি বিবরণীর মধ্যে একটি অধিকতর কম পরিচিত বিবরণী থেকে জানতে পারি যে, বর্ধমান জেলার রত্না নদীর তীরবর্তী দামুন্যা (স্থানীয় উচ্চারণে দামিনিয়া) গ্রামে দেবতা শিব চক্রাদিত্য নামে আবির্ভূত হন। এখানে জনৈক দুষ দত্ত তাঁর সম্মানে একটি মন্দির স্থাপন করেন। কিন্তু দেবতা শিব পিপুল গাছের নিচে বসবাসের জন্য এ মন্দির ত্যাগ করেন। শিবের উপাসনার জন্য জনৈক হরি নন্দী এ জমি দান করেন এবং এ তীর্থস্থান দেখাশুনার জন্য কবির পূর্বপুরুষ মাধব ওঝাকে নিযুক্ত করেন। দক্ষিণ রাঢ়ের এ গ্রামটি পূর্ব থেকে বিখ্যাত ছিল। কারণ তিনটি উচ্চবর্ণের সকলেই এখানে বসবাস করতেন। শিবের আশীর্বাদে কবি বাল্যকালেই তাঁর সম্মানে কবিতা লেখেন। তিনি তাঁর বংশের কুলপঞ্জি নিম্নরূপে প্রদান করেন: মাধব শর্মার নয় পুত্রের মধ্যে একজন জগন্নাথ মহামিশ্র। মাধব শর্মা ছিলেন উমাপতির পুত্র, আর উমাপতি ছিলেন তপন ওঝার পুত্র। কবি ছিলেন জগন্নাথের পুত্র গুণরাজ মিশ্রের (ডাকনাম গুণীরাজ ওরফে হূদয়) সর্ব কনিষ্ঠ পুত্র ও তাঁর বড় ভাই ছিলেন কবিচন্দ্র। কবি আমাদের জানান যে, সাত পুরুষ ধরে এ পরিবার দামুন্যা গ্রামে বসবাস করতেন এবং জমি-জমা চাষাবাদই ছিল তাঁদের জীবিকা নির্বাহের প্রধান অবলম্বন। অবশ্য এ বিষয়ে পাওয়া তথ্যটি কিছুটা দ্ব্যর্থবোধক। এ বিষয়টি সুস্পষ্ট নয় যে, এ পরিবার নিজেরাই জমি-জমা চাষাবাদ করতেন (অবশ্যই কৃষকদের সহায়তায়) বা জমি বরগা দিতেন। অন্য একটি তথ্যে একথাও বলা হয়েছে যে, দিগর দত্ত নামে জনৈক কায়স্থ জমিদার মাধব ওঝাকে দামুন্যা গ্রামে নিয়ে আসেন এবং তাকে এখানে বসবাসের ব্যবস্থা করেন। সম্ভবত দেবতা শিবের সেবার জন্য তিনি মাধব ওঝার অধীনে কিছু কার্যালয়ও স্থাপন করেন। কিন্তু কবির ঠাকুরদা জগন্নাথ কৃষ্ণের ভক্ত হন এবং গোপাল হিসেবে কৃষ্ণের আরাধনা শুরু করেন।

দামুন্যার জমিদার গোপীনাথ নন্দী নিয়োগী সেলিমাবাদ শহরে বসবাস করতেন। ফলে নিয়োগী পরিবারের জমি-জমার রক্ষক হিসেবে মুকুন্দরামের পরিবার কয়েক পুরুষ ধরে তাদের গ্রামের জমি-জমা ভোগ করতেন। রাজা মান সিংহ বাংলা, বিহার ও ওড়িষ্যার গভর্ণর নিযুক্ত হলে (বা তার রাজা হওয়ার অব্যবহিত পরেই) মুকুন্দরামের পরিবারে দুঃসময় নেমে আসে। জনৈক মামুদ শরিফ সে এলাকার জমিদার নিযুক্ত হন। তাঁর সময়ে এলাকায় চরম অত্যাচার নির্যাতন শুরু হয়। উপায়ন্তর না দেখে মুকুন্দরাম, তাঁর স্ত্রী, শিশুপুত্র ও এক ভাইসহ কৃষকদের সঙ্গে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যান। বাড়ি থেকে তিন মাইল দূরে বালিয়া গ্রামে জনৈক রূপ রায় নামে একজন ডাকাত মুকুন্দরামের সর্বস্ব লুঠ করে নিয়ে যায়। একটি নদী তীরবর্তী জলাশয়ের নিকট অস্থায়ীভাবে বসবাসের পূর্ব পর্যন্ত সেখানে পরিচিত কিছু লোকের সহায়তায় তাঁরা কোনো প্রকারে জীবনধারণ করতে সক্ষম হন। এ পর্যন্ত তাঁরা কোনো প্রকার খাবার খেতে পাননি এবং ক্ষুধার্ত শিশুটিকে শাপলা খেয়েই শান্ত থাকতে হয়েছে। ক্লান্ত কবি ঘুমিয়ে পড়লে দেবী চন্ডী স্বপ্নে দেখা দেন: দেবী চন্ডী তাঁর নামে একটি পাঁচালি রচনার নির্দেশ দেন। পরে পরিবারটি শিলাই নদী অতিক্রম করে ব্রাহ্মণ অধ্যুষিত আড়রা গ্রামে পৌঁছান। এ এলাকার রাজা বীর বংকুর রায় এখানে একটি কোর্ট স্থাপন করেছিলেন। কবিকে তাঁর পুত্রের গৃহশিক্ষক নিযুক্ত করা হয়। রঘুনাথ তাঁকে গুরুরূপে গ্রহণ করেন এবং তাঁর অনুরোধে বিখ্যাত পাঁচালি চন্ডীমঙ্গল রচনা করেন। যুবরাজের পৃষ্ঠপোষকতা ও আনুকূল্যে জনৈক প্রসাদ দেব এ কাব্য সঙ্গীতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করেন। তিনি কবি এবং সঙ্গীতশিল্পী উভয়কেই প্রচুর অলংকার সামগ্রী, বিলাসবহুল পোষাক-পরিচ্ছদ এবং ভ্রমণের জন্য ঘোড়া দিয়ে পুরস্কৃত করেন। এজন্য কবিকে তিনি বিশেষভাবে ‘কবিকঙ্কণ’ উপাধিতে ভূষিত করেন। করুণ রসের এ কাব্যখানি প্রাচীন বঙ্গসমাজের একটি সর্বাঙ্গসুন্দর আলেখ্যস্বরূপ।

সুকুমার সেন কবি-জীবনের ধারাবাহিকতার অনিশ্চয়তার বিষয়ে সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, ১৫৪৪ সালের কাছাকাছি কোনো এক সময়ে মুকুন্দরামকে সম্ভবত তাঁর পৈতৃক গ্রাম ত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়।

পাঁচালিতে বর্ণিত ঘটনা তিনটি অংশে বিভক্ত: দেবী চন্ডী হচ্ছেন দেবতা শিবের স্ত্রী উমা, দক্ষের বিরাট যজ্ঞ এবং উমার মৃত্যু-এ পরিচিত পৌরাণিক কাহিনী পাঁচালির প্রথম অংশের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। দ্বিতীয় অংশে রয়েছে শিকারী কালকেতু এবং তার স্ত্রী ফুল্লরার জীবন কাহিনী এবং শিকারী কালকেতু কীভাবে পৃথিবীতে দেবী চন্ডীর পূজার প্রচলন করেন তার বর্ণনা। কিছু কিছু জাতক কাহিনি, এমন কি ফ্রিজিয় অশ্বারোহী দেবীর উপাসনার ধারণা থেকে এ কাহিনির উৎস পাওয়া যায়। কাব্যের তৃতীয় অংশে রয়েছে পদ্মফুলের উপর উপবেশনরত দেবতার শ্রীলঙ্কার নিকটবর্তী একটি সাগরে আবির্ভাব এবং ধনপতি বণিকের ব্যবসা উপলক্ষে সমুদ্রপথে দীপরাজ্যে আগমন। এ কাহিনির উৎস রয়েছে বিজয় সিংহের লঙ্কা বিজয় উপখ্যানে।

সুকুমার সেন মুকুন্দরামের পাঁচালিকে একটি দুর্লভ শ্রেষ্ঠ পাঁচালি হিসেবে বর্ণনা করেন এবং এটি এ শ্রেণীর কাব্যের মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট। চন্ডীদেবীর মাহাত্ম্য প্রচার মুখ্য বিষয় হলেও সমকালীন সমাজ ও পারিপার্শ্বিকতা তিনি উপেক্ষা করতে পারেননি। তিনি পৌরাণিক কাহিনির মধ্য দিয়ে ধনী-দরিদ্র উভয় শ্রেণীর জীবন-পদ্ধতি এবং একই সঙ্গে যৌথ পরিবারের সমস্যার বস্ত্তনিষ্ঠ বর্ণনা করেছেন। কাব্যে সে সময়কার গণজীবনের করুণ চিত্র বিশ্বস্ততার সঙ্গে অঙ্কন করার জন্য তিনি দুঃখবাদের কবি হিসেবে আখ্যায়িত হন। তবে তাঁর কাব্যে দুঃখবাদের সুর থাকলেও গুজরাট নগরপত্তনে আদর্শ রাষ্ট্র ভাবনার পরিচয় দিয়ে তিনি এক প্রকার আশাবাদও ব্যক্ত করেছেন।

মুকুন্দরামের কাব্য মানবজীবনরসে পূর্ণ। স্বভাবগত কবিত্ব শক্তির প্রসাদে তাঁর কাব্যে উপন্যাসের বর্ণনা-নৈপুণ্য, নাটকের দ্বন্দ্ব-সংঘাত এবং বিচিত্র জীবনরসের প্রকাশ ঘটেছে। বস্ত্ততান্ত্রিক ঔপন্যাসিকদের অগ্রদূত মুকুন্দরামের মুরারি শীল, ভাঁড়ুদত্ত ও ফুল্লরা চরিত্র বাংলা সাহিত্যের অমর সৃষ্টি। এসব কারণে তাঁর চন্ডীমঙ্গল মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে এক অভিনব সৃষ্টি।

সাম্প্রতিক গবেষণায় পাঁচালি সাহিত্যের অন্য একটি নতুন দিক হলো-চৌদ্দ শতকের পূর্বে বাংলার নিম্নবর্গের মানুষ হিন্দু বা মুসলিম ধর্মের অনুসারী ছিলেন না। একটা সময়ে পূর্ববঙ্গের একটি বিপুল সংখ্যক জনগণ পীরদের সংস্পর্শে এসে মুসলিম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়। এ পীর সম্প্রদায় পূর্ববঙ্গে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। অনুরূপভাবে পশ্চিম বাংলায় অনগ্রসর শ্রেণীর বহু দেব-দেবীর উপাসকগণ হিন্দুধর্ম গ্রহণ করে। দরিদ্র ব্রাহ্মণেরা সকল প্রকার পাঁচালির রচয়িতা এবং তাঁরা স্থানীয় দেব-দেবীকে উচ্চ পৌরাণিক মর্যাদা দান করে। ধর্মান্তর প্রক্রিয়ায় এ দরিদ্র ব্রাহ্মণগণ মুখ্য ভূমিকা পালন করে। বাংলার অনগ্রসর শ্রেণীর মধ্যে এ ধর্মান্তর প্রক্রিয়া ব্রাহ্মণদের একটি নতুন সুযোগ এনে দেয় এবং এক শ্রেণীর মানুষ তাঁদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করে। ফলে তাঁরা হিন্দুধর্মের ব্রাহ্মণ্যধারার মধ্যে স্থানলাভ করে। মুকুন্দরামের চন্ডীমঙ্গল এ প্রক্রিয়ায় একটি মুখ্য ভূমিকা পালন করে।  [তপন রায়চৌধুরী]