মির্ধা মসজিদ


মির্ধা মসজিদ  লালবাগ দুর্গের পশ্চিমে অর্ধ কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে পুরানো ঢাকার আতিশখানা মহল্লায় অবস্থিত। বাংলাদেশে মধ্যযুগীয় নিদর্শনগুলির মধ্যে এটিই সবচেয়ে অক্ষত অবস্থায় সংরক্ষিত মসজিদ। কেন্দ্রীয় খিলানপথ এবং কেন্দ্রীয় মিহরাবের উপর স্থাপিত দুটি ফারসি শিলালিপি থেকে জানা যায়, খান মুহম্মদ মির্ধা নামধারী জনৈক ব্যক্তি ১৭০৪-০৫ খ্রিস্টাব্দে মসজিদটি নির্মাণ করেন এবং তাঁর নামানুসারেই মসজিদটির নামকরণ হয়।

খান মুহম্মদ মির্ধা মসজিদ, ঢাকা

ইট নির্মিত বিল্ডিং কমপ্লেক্সটিতে রয়েছে ভল্টেড প্লাটফর্ম, যার উপরে রয়েছে তিনগম্বুজ বিশিষ্ট একটি মসজিদ ও অন্য আর একটি ভবন কাঠামো। বিল্ডিং কমপ্লেক্সটি ২.৪৪ মিটার উচু বহির্দেওয়াল ঘেরা একটি প্রাঙ্গণের পশ্চিম অংশ জুড়ে স্থাপিত। পূর্ব ও দক্ষিণ প্রাচীরে একটি করে ছোট প্রবেশপথ (পুনঃসংস্কার করা) বর্তমানে মসজিদ অভ্যন্তরে প্রবেশের জন্য ব্যবহূত হয়। বিশাল প্লাটফর্মটি উত্তর-দক্ষিণে ৩৮.১০ মিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে ২৮.৯৬ মিটার বিস্তৃত। এটি ভূমি থেকে ৫.১৮ মিটার উঁচু এবং চারদিকের প্যারাপেট আরও ০.৭৬ মিটার উঁচু। প্লাটফর্মের নিচে পূর্বদিক ব্যতীত সব দিকেই রয়েছে ভল্টেড কক্ষ। পূর্ব ও দক্ষিণ দিকের কক্ষগুলি প্রায় বর্গাকার, কিন্তু উত্তর দিকেরগুলি পালাক্রমে বর্গাকার ও আয়তাকার। সবগুলি কক্ষের অভ্যন্তরীণ দেওয়াল জুড়ে রয়েছে তাক এবং বাইরের দিকে রয়েছে আড়াআড়ি খিলান সহযোগে ‘বে’তে বিভক্ত বারান্দা। উল্লেখ্য যে, উত্তর দিকের কক্ষগুলি দরজা দ্বারা একটির সাথে আর একটি সংযুক্ত। কিন্তু পশ্চিম ও দক্ষিণ দিকের কক্ষগুলি বারান্দার দিক দিয়ে একটি মাত্র প্রবেশপথ দ্বারা প্রবেশযোগ্য। কক্ষগুলির সিলিং এবং ‘বে’ সমতল হলেও দেওয়াল সংলগ্ন ছাদের অংশটি পিপাকৃতির।

পূর্বদিকে অবস্থিত মসজিদ প্রাঙ্গণের প্রবেশপথ বরাবর একটি সিঁড়ি উঠে গিয়েছে এবং তা সমাপ্ত হয়েছে মসজিদের প্রবেশপথে। এই পথ ধরেই মসজিদের প্লাটফর্মে পৌঁছানো যায়। প্রবেশপথের দুপার্শ্বে দুটি বিশাল অষ্টভুজাকার বুরুজ স্থাপিত। যদিও বর্তমানে বুরুজগুলি প্লাটফর্মের সমান উঁচু, তথাপি মনে হয় আদিতে মসজিদ কমপ্লেক্সটির সৌন্দর্যের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখেই এগুলি আরও উঁচু ছিল।

প্লাটফর্মের উত্তর-পূর্ব কোণে একটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ভবনকাঠামো রয়েছে, যাকে একটি মাদ্রাসা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। উভয় পার্শ্বে অপেক্ষাকৃত ছোট বর্গাকার কক্ষ-ঘেরা একজোড়া আয়তাকার হল নিয়ে এই ভবন কাঠামোটি নির্মিত। দরজা দ্বারা প্রতিটি কক্ষ একে অপরের সাথে সংযুক্ত। হল ঘরটিতে প্রবেশের জন্য দক্ষিণ দিকে রয়েছে খাঁজকাটা তিনটি খিলানপথ, যাদের উপরে রয়েছে বলিষ্ঠভাবে অভিক্ষিপ্ত ছাদের আচ্ছাদন। ছাদটির বাইরের দিক এবং অভ্যন্তরভাগের সিলিং সমতল হলেও পার্শ্বের অংশটি পিপাকৃতির।

মাদ্রাসার সামান্য দক্ষিণ-পশ্চিমে তিনগম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটির বাইরের দিকের পরিমাপ ১৪.৯৪ মিটার × ৭.৬২ মিটার। মসজিদের চার বহিস্থ কোণের অষ্টভুজাকার পার্শ্ববুরুজগুলি অনুভূমিক প্যারাপেটকে ছাড়িয়ে উপরে উঠে গেছে এবং এগুলির শীর্ষে রয়েছে ছত্রী ও ক্ষুদ্র গম্বুজ (cupola)। মসজিদে পাঁচটি প্রবেশপথ রয়েছে- তিনটি পূর্ব দেওয়ালে এবং উত্তর ও দক্ষিণ দেওয়ালে একটি করে। পূর্ব ফাসাদের তিনটি প্রবেশপথ একটি অর্ধগম্বুজ অবকাঠামোর নিচে উন্মুক্ত। খিলানপথগুলি পরপর দুটি খিলান সমন্বয়ে গঠিত; বাইরেরটি একটু উঁচু ও বহুখাঁজ বিশিষ্ট এবং ভেতরেরটি নিচু ও চতুষ্কেন্দ্রিক ধরনের। পশ্চিম দেওয়ালে তিনটি অর্ধ-অষ্টভুজাকার মিহরাব রয়েছে। কেন্দ্রীয় মিহরাবটি অপেক্ষাকৃত বড়। সবগুলি প্রবেশপথ এবং মিহরাব বাইরের দিকে অভিক্ষিপ্ত আয়তাকার কাঠামোর মধ্যে ন্যস্ত এবং কাঠামোগুলি তাদের সীমান্তবর্তী ক্ষুদ্র মিনার দ্বারা বৈশিষ্ট্যমন্ডিত। মসজিদ অভ্যন্তর তিন ভাগে বিভক্ত। মাঝের অংশটি বর্গাকার এবং পার্শ্ববর্তী আয়তাকার অংশ দুটির তুলনায় বড়। তিনটি অংশই উপরে অষ্টভুজাকার ড্রামের উপর স্থাপিত গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত। মাঝের গম্বুজটি আকারে বড় এবং কিছুটা চ্যাপ্টা, অনেকটা উবু হয়ে বসার মতো। তবে পার্শ্ববর্তী ছোট গম্বুজগুলি সামান্য বেলুনাকৃতির এবং কাঁধের কাছে খানিকটা চাপানো। গম্বুজগুলির ভার বহনের জন্য যে পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে তা অনেকটাই করতলব খান মসজিদএ ব্যবহূত পদ্ধতির অনুরূপ।

পার্শ্ববুরুজ এবং প্রবেশপথ ও মিহরাবের মিনারগুলি (turrets) মল্ডেড ব্যান্ড দ্বারা বিভক্ত। মসজিদের পূর্ব ফাসাদটি অসংখ্য প্যানেল সমৃদ্ধ। প্যারাপেট ও গম্বুজের নিচে ড্রামগুলি সারিবদ্ধ বদ্ধ মেরলোন দ্বারা অলঙ্কৃত। গম্বুজ শীর্ষ পদ্মচূড়া শোভিত এবং এর অভ্যন্তরভাগ পত্র নকশায় অলঙ্কৃত। সবগুলি গম্বুজের শীর্ষই আদিতে স্তরীকৃত রোসেট সমৃদ্ধ ছিল, যা এখনও কেন্দ্রীয় গম্বুজে বিদ্যমান। মিহরাবগুলিতে রয়েছে পলকাটা দেওয়াল অন্তরীস্থ স্তম্ভ (pilaster) থেকে উত্থিত বহুখাঁজ বিশিষ্ট খিলান, যা একটি আয়তাকার ফ্রেমের মধ্যে ন্যস্ত। আয়তাকার কাঠামোটির শীর্ষ বদ্ধ শীর্ষালঙ্কার ফ্রিজ নকশায় অলঙ্কৃত।

উল্লেখ্য যে, উঁচু ভল্টেড প্লাটফর্মের ওপর মসজিদ নির্মাণের উদাহরণ ঢাকার কয়েকটি মুগল মসজিদে দেখতে পাওয়া যায়। এ ধরনের মসজিদ নির্মাণ এবং প্লাটফর্মের নিচে ভল্টেড কক্ষ কি উদ্দেশ্যে নির্মিত হতো তা নিয়ে পন্ডিতদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। এটি মনে করা যুক্তি সঙ্গত হবে যে, দেওয়ালে সেলভসমৃদ্ধ এই কক্ষগুলি আদিতে সম্ভবত মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকদের ডরমিটরি হিসেবে ব্যবহারের জন্য নির্মিত হয়েছিল। এ কারণেই সম্ভবত ঢাকার এ জাতীয় অন্যান্য মসজিদগুলিসহ মির্ধা মসজিদটিকে ‘আবাসিক মাদ্রাসা-মসজিদ কমপ্লেক্স’ হিসেবে উল্লেখ করা যেতে পারে।

সুলতানি যুগে বাংলায় ভল্টেড প্লাটফর্মের উপর মসজিদ নির্মিত হয়নি। তাই মুগল এ মসজিদটির ধারণা অবশ্যই বাংলার বাইরে থেকে এসেছিল, সম্ভবত সরাসরি উত্তর ভারত থেকে; কেন না এখানে তুগলক ও লোদী যুগে নির্মিত এ জাতীয় মসজিদের বেশ কিছু নমুনা দেখতে পাওয়া যায়। এ ধরনের নমুনার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হলো দিল্লিতে অবস্থিত ফিরুজ শাহ তুগলকের কোটলা জামে মসজিদ (১৩৫৪ খ্রি) এবং বড় গম্বুজ মসজিদ (১৪৯৪ খ্রি)। আর উত্তর ভারতেও এ জাতীয় মসজিদের ধারণা এসেছিল সম্ভবত ইসলামি যুগের প্রাথমিক পর্যায়ে। কায়রোর শালিহ আল-তালাই-এর (১১৬০ খ্রি) ফাতেমীয় মসজিদ এ রকম উঁচু ভল্টেড প্লাটফর্মের উপরে নির্মিত হয়েছিল।  [এম.এ বারি]