মাহীসন্তোষ মসজিদ


মাহীসন্তোষ মসজিদ  নওঁগা জেলার ধামইর হাট থানা সদর থেকে প্রায় ১৩ কিমি উত্তর-পশ্চিমে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের নিকটবর্তী এলাকায় অবস্থিত। প্রাক মুসলিম আমল থেকেই পরিচিত মাহীসন্তোষ এলাকাটি সুলতান রুকনুদ্দীন বারবক শাহ এর আমলে (১৪৫৯-১৪৭৪) গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সুলতান রুকনুদ্দীন বারবক শাহ এখানে একটি টাকশাল স্থাপন করেন এবং এটি তাঁর নামানুসারে বারবকাবাদ নামে পরিচিতি লাভ করে। এই শহরটির বিভিন্ন অংশে এখনও অনেকগুলি প্রত্নতাত্ত্বিক সম্ভাবনাময় ঢিবি দেখতে পাওয়া যায়। ১৯১৬ সালে বরেন্দ্র রিসার্চ সোসাইটি এই মসজিদটির ধ্বংসাবশেষ যুক্ত ঢিবিটিতে উৎখনন করে। তখন মসজিদটির সামান্য অংশ উন্মোচিত হয়েছিল। অতি সম্প্রতি স্থানীয় লোকজন জঙ্গল এবং মসজিদের ঢিবির ধবংসাবশেষ সরিয়ে ফেলে পুরানো মসজিদটির উপরে জুমার নামায পড়ার উদ্দেশ্যে নতুন একটি চৌচালা টিনের ছাদে আবৃত মসজিদ নির্মাণ করেছে। বর্তমানে টিকে থাকা বৈশিষ্ট্য থেকে এই মসজিদের আদি পরিকল্পনা সম্পর্কে ধারণা করা সম্ভব।

২.২৫ মি পুরু দেওয়াল বিশিষ্ট আয়তাকার (বাইরে থেকে পরিমাপ ২৪ মি × ১৬.২০ মি) মসজিদটির চারকোণে চারটি অর্ধ অষ্টভুজাকার পার্শ্ববুরুজ ছিল। এগুলি ইট এবং পাথর দিয়ে নির্মিত। অভ্যন্তরভাগে ইট দিয়ে নির্মিত মসজিদটির ভেতর এবং বাইরের দেওয়ালের সম্মুখভাগ পাথরের ফলক দ্বারা আবৃত। মসজিদে প্রবেশের জন্য সম্মুখভাগে পাঁচটি প্রবেশপথ ছিল। খুব সম্ভবত কেন্দ্রীয় প্রবেশপথটি পাশের প্রবেশ পথগুলি অপেক্ষা বৃহদাকারের ছিল। উত্তর ও দক্ষিণের প্রতিপার্শ্বে তিনটি করে প্রবেশ পথ ছিল। প্রতি সারিতে চারটি করে দুই সারি প্রস্তর স্তম্ভের সাহায্যে মসজিদের অভ্যন্তর ভাগ (১৯.৫০ মি × ১১.৭০ মি) বিভক্ত করা হয়েছিল। ঘনক (cube) আকৃতির পাথরের ভিত্তির উপর প্রতিটি স্তম্ভ ছিল দন্ডায়মান। বর্গাকার প্রতিটি স্তম্ভের দন্ড (Shaft) তিনটি অংশে বিভক্ত। সর্বনিম্নের অংশের পরিমাপ ০.৪০ মি এবং এর গায়ে ছিল ত্রিকোণাকার নকশা। মাঝের অংশের পরিমাপ ১.৫৫ মি। এখানে শিকল এবং ঘণ্টার নকশা দেখা যায়। সবচেয়ে উপরের বহুভুজ (১৬ বাহু বিশিষ্ট) আকৃতির অংশটির পরিমাপ ০.৯৬ মি। এই অংশে শিকল ও ঘণ্টার নকশা এবং অর্ধ বৃত্তাকার ঝুলন্ত মুক্তার নকশা রয়েছে।

মসজিদের কেন্দ্রীয় ‘নেভ’ পাশের অংশ অপেক্ষা বড় এবং তিনটি আয়তাকার প্রকোষ্ঠে বিভক্ত। এগুলির ছাদ সম্ভবত বাংলা চৌচালা রীতির খিলান ছাদে (Vault) আচ্ছাদিত ছিল। আর এর দুপাশের অংশ দুটি সম্ভবত আচ্ছাদিত ছিল সর্বমোট ১২টি অর্ধগোলাকার গম্বুজে। আচ্ছাদনের এই ব্যবস্থা বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ এর (১৪৫৯ খ্রি) সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

সম্মুখভাগের প্রবেশ পথের সমান্তরালে কিবলা দেওয়ালে রয়েছে পাঁচটি মিহরাব। কেন্দ্রীয় মিহরাবটি পাশেরগুলি অপেক্ষা সামান্য বড়। মিহরাবটি বর্তমানে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। মূলত এই মিহরাবটি একটি পাথরখন্ড দিয়ে নির্মিত এবং সুন্দর অলংকরণে সজ্জিত। শিকল ও ঘণ্টা, পদ্ম এবং তালপত্র নকশা (Palmette) প্রধান মোটিফ হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে। উত্তর দিকের শেষ মিহরাবটির অভ্যন্তরে সুন্দরভাবে খোদাইকরা নকশা এখনও দৃশ্যমান। এটি দেখে মনে হয় পাথরের তিনটি টুকরো দিয়ে এটি নির্মিত। মিহরাবের কুলুঙ্গির কেন্দ্রীয় অংশ শিকল এবং ঘণ্টা নকশায় অলংকৃত। শিকল নকশার পাশে একটি ঝুলন্ত পুতির মালার নকশা ছিল। শিকল নকশার নিম্নাংশে ছিল ঝুলন্ত প্রস্ফুটিত পদ্মের নকশা। পাথরের টুকরাগুলির পার্শ্ববর্তী প্রান্তে গোলাকার এবং বর্গাকৃতির জ্যামিতিক নকশা আছে। মিহরাবের উপর এবং নিম্নভাগে সংযুক্ত গোলাপ নকশা এর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। এখানে ব্যবহূত শিকল এবং ঘণ্টার নকশার সঙ্গে দরসবাড়ি মসজিদ, ছোটসোনা মসজিদ এবং কুসুম্বা মসজিদ এর শিকল ও ঘণ্টা নকশার ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য রয়েছে।

মসজিদের আশে পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা পাথরখন্ডের গায়ে অলংকরণের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়। এই অলংকৃত পাথরখন্ড প্রমাণ করে যে, মসজিদের বাইরের দেওয়ালে পাথরে খোদাই করা অলংকরণ ছিল। আলংকারিক অংশগুলি মূলত জ্যামিতিক আকারের ফুলের নকশা, তালপত্র, খোটা (Nailheads), ত্রিভুজাকৃতির, প্যাঁচানো, শিকল ও ঘণ্টার নকশা এবং অর্ধবৃত্তাকার ঝুলন্ত হারের নকশা প্রভৃতি মোটিফ দিয়ে অলংকৃত ছিল। এখান থেকে বেশ কিছু পোড়ামাটির অলংকৃত ফলকের ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। গম্বুজের ড্রামের অভ্যন্তরে অলংকরণ হিসেবে এই পোড়ামাটির অলংকৃত ফলক ব্যবহূত হয়েছে। অলংকরণের এই পদ্ধতিও দরসবাড়ি, ছোটসোনা এবং  কুসুম্বা মসজিদ এ দেখা যায়।

এই প্রত্নস্থল উৎখনন করতে গিয়ে বরেন্দ্র রিসার্চ সোসাইটি একটি শিলালিপি আবিষ্কার করে। এই শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, ৯১২ হিজরি/১৫০৬ খ্রিস্টাব্দে আলাউদ্দীন হোসেন শাহ এর আমলে মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল। অতি সম্প্রতি মসজিদের ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে নেওয়ার সময় আরেকটি শিলালিপি পাওয়া যায়। বর্তমানে এটি নতুন করে নির্মিত কাঁচা মসজিদের সম্মুখে স্থাপিত রয়েছে। শিলালিপিটি দুই সারিতে কালো কষ্টি পাথরে খোদাই করা। এটি সুলতান রুকনুদ্দীন বারবক শাহের আমলে জনৈক উলুগ খান হাসান কর্তৃক ৮৬৭ হিজরি/১৪৬৩ খ্রিস্টাব্দে একটি মসজিদ নির্মাণের স্মারক। দুটি শিলালিপি থেকে ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদটির নির্মাণকাল সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন উত্থাপিত হয়- মসজিদটি কি সুলতান বারবক শাহ এর আমলে, নাকি আলাউদ্দীন হোসেন শাহ এর আমলে নির্মিত; এটি কি সুলতান বারবক শাহের সময়ে নির্মিত এবং আলাউদ্দীন হোসেন শাহের সময়ে পুনঃনির্মাণ করা হয়েছিল; অথবা এই দুটির মধ্যে একটি শিলালিপি কি বাইরে থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল এবং এটা কি মসজিদের ভিতরের সুরক্ষিত অবস্থায় রাখা ছিল? উপরিউক্ত কোন সম্ভাবনার পক্ষে যুক্তি দেখানোর উপায় নেই। তবে এটা খুবই সম্ভব যে মসজিদটি সুলতান রুকনুদ্দীন বারবক শাহের আমলে ৮৬৭ হিজরিতে (১৪৬৩ খ্রি) নির্মিত এবং সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহের আমলে এটি ৯১২ হিজরিতে (১৫০৬ খ্রি) পুনঃনির্মিত হয়েছিল।  [সুলতান আহমেদ]