মানি-লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০০৯


Mukbil (আলোচনা | অবদান) কর্তৃক ১০:২৯, ৪ মার্চ ২০১৫ পর্যন্ত সংস্করণে

(পরিবর্তন) ←পুর্বের সংস্করণ | সর্বশেষ সংস্করণ (পরিবর্তন) | পরবর্তী সংস্করণ→ (পরিবর্তন)

মানি-লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০০৯  মানি-লন্ডারিং শব্দটি এখন বহুল প্রচলিত। সাধারণত শব্দটির অর্থ অবৈধভাবে এবং উৎস গোপন রেখে অর্জিত অর্থ যা বিদেশে স্থানান্তরিত অথবা বিনিয়োগকৃত হয়। এ ধরনের অর্থের আইনসম্মত কোনো হিসাব দাখিল করা হয় না। কালো টাকা শব্দটিও মোটামুটি একই অর্থে ব্যবহূত হয়। আইনের ভাষায় মানি-লন্ডারিং শব্দটির সংজ্ঞার পরিধি অধিকতর বিস্তৃত যা সাধারণের জন্য বোধগম্য নাও হতে পারে।

জাতীয় এবং আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে মানি-লন্ডারিং প্রতিরোধ করার পেছনে দুটি যুক্তি রয়েছে। এক, দুর্নীতির প্রতিরোধ; দুই, সন্ত্রাসী কার্যক্রমের অর্থযোগান বন্ধ করার অতি-প্রয়োজনীয়তা। এ দুটি কারণই বর্তমানে বিশ্বব্যাপী আশঙ্কার রূপ পরিগ্রহ করেছে।

বাংলাদেশে মানি-লন্ডারিং আইন প্রথম জারী করা হয় মানি-লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০০২ শিরোনামে (২০০২ সালের ৭ নং আইন)। এ আইনের বিধানাবলি অপর্যাপ্ত মনে করে ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এ লক্ষ্যে একটি অধ্যাদেশ জারী করে (অধ্যাদেশ নং ১২, ২০০৮)। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার গঠনের পর অধ্যাদেশটি সংবিধানের অনুশাসন অনুযায়ী পরীক্ষা করে ২০০৯ সালে আইনে রূপান্তরিত করে। আইনটির শিরোনাম হলো মানিলন্ডারিং আইন, ২০০৯ (২০০৯ সালের ৮নং আইন)। সংসদ অনুমোদিত আইনটি জনগণের অবগতির জন্য ২০০৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি গেজেটে প্রকাশিত হয়। এ আইনে ৩১টি ধারা রয়েছে এবং আইনটি পূর্ববর্তী অধ্যাদেশকে রহিত করে। তবে ঐ অধ্যাদেশের দ্বারা কৃত কার্যক্রমকে বৈধতা দেওয়া হয়। আইনের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং কোনো সম্ভাব্য আইনি জটিলতা এড়ানোই এ পদক্ষেপের কারণ ছিল।

আইনে ’মানি-লন্ডারিং’- এর সংজ্ঞা প্রদান করা হয় এবং এ প্রক্রিয়ায় মানি-লন্ডারিংকে ’সম্পৃক্ত অপরাধ’ (predicate offence)-এর ধারণার সাথে যুক্ত করা হয়। এর জন্য আইনে মোট ১৬টি সুনির্দিষ্ট সম্পৃক্ত অপরাধের তালিকাও সন্নিবেশিত রয়েছে। একই সাথে আরও অপরাধের সাথে সংযুক্ত করার ক্ষমতা সরকারকে প্রদান করা হয়। সম্পৃক্ত অপরাধের  সংজ্ঞায় কয়েকটি উপাদান বিদ্যমান। এক, সম্পৃক্ত অপরাধ সংঘটনের প্রক্রিয়ায় অর্থ বা অন্য সম্পত্তি অর্জন করে অবৈধভাবে উপার্জিত অর্থ বা সম্পদকে হস্তান্তর, রূপান্তর, বিদেশে প্রেরণ অথবা বিদেশ থেকে বাংলাদেশে প্রেরণ বা নিয়ে আসা। দুই, অর্থ লেনদেন বা এর প্রচেষ্টা যার জন্য এ আইনে কোনো প্রতিবেদন দেওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। তিন, এ সংক্রান্ত কোনো কার্যক্রমের মাধ্যমে অবৈধ অর্থ বা সম্পদের উৎস গোপন বা এর চেষ্টা করা বা এ প্রক্রিয়ায় অন্যকে সাহায্য বা ষড়যন্ত্র করা।

মানিলন্ডারিং আইন দ্বারা নির্ধারিত উপর্যুক্ত সংজ্ঞায় এ বিষয়টি স্পষ্ট যে, মানি-লন্ডারিং সংক্রান্ত অপরাধ প্রমাণের জন্য আইনে নির্ধারিত যেকোন ১৬টি সম্পৃক্ত অপরাধের সাথে সর্ম্পকিত হতে হবে। সম্পৃক্ত অপরাধের দীর্ঘ তালিকায় বড় ধরনের অপরাধ থেকে ছোট অপরাধ যথা চুরি বা যৌতুক গ্রহণ করার অপরাধও অন্তর্ভূক্ত। ১৬টি অপরাধের প্রতি অপরাধের শাস্তির জন্য পৃথক আইন প্রচলিত। মূল বিষয়টি হলো এ সব অপরাধের সাথে সম্পৃক্ততা যা এ আইনে নির্ধারিত হয়েছে।

এ কারণেই মানি-লন্ডারিং আইনে বিভিন্ন মাত্রার শাস্তি প্রদানের বিধান রয়েছে। ন্যুনতম ছয়মাস থেকে অনধিক সাত বছর কারাদন্ডসহ কৃত অপরাধের মাধ্যমে সৃষ্ট সম্পদকে বাজেয়াপ্ত করার শাস্তি এর পরিধির আওতাভূক্ত।

এ আইনে নির্ধারিত অন্যান্য সংশ্লিষ্ট অপরাধের জন্যও বিভিন্ন শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে (ক) আদালত কর্তৃক ডিক্রিকৃত সম্পদের বিক্রয় প্রক্রিয়ায় বাধা সৃষ্টি, (খ) তদন্তে বাধা সৃষ্টি বা প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে সংশ্লিষ্ট তথ্য ফাঁস করা, (গ) তদন্ত বিঘ্নিত করার জন্য চাহিত তথ্য প্রদানে ব্যর্থতা এবং (ঘ) মিথ্যা তথ্য প্রদান।

এ আইনের অপরাধ তদন্ত ও বিচার কার্যের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনকে বিশেষ ক্ষমতা ও এখতিয়ার প্রদান করা হয়েছে। এ আইন দ্বারা নির্ধারিত অপরাধ একমাত্র দুর্নীতি দমন কমিশন বা কমিশন কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত কোনো কর্মকর্তা তদন্ত করবে। দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুমোদন ব্যতিরেকে কোনো আদালত কৃত কোনো অপরাধের বিচার করতে ক্ষমতাবান নয়। এতে দেখা যায় যে, তদন্ত ও বিচার এ দুটি ক্ষেত্রেই কমিশনকে একচেটিয়া ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়া তদন্ত করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার জন্য আদালতে প্রতিবেদন দাখিলের বিষয়েও কমিশনের পুর্বানুমোদনের আবশ্যকতা বাধ্যতামূলক।

এ আইনের বিধানাবলি অন্যান্য আইনের উপর প্রাধান্য পাবে। এ আইনের অধীনে সকল অপরাধ আমলযোগ্য (cognizable), অ-আপসমূলক (non-compoundable) এবং অজামিনযোগ্য (non-bailable)। উচ্চ আদালত কর্তৃক জামিনের বিষয়ে কয়েকটি নিয়ন্ত্রণমূলক বিধানও এ আইনে রয়েছে। অবশ্য বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট ডিভিশনে আপিলের সুযোগ রয়েছে। অধিকন্তু এ আইনের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংককে কিছু ক্ষমতা ও দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে। আইনের অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংক একটি ফাইনান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিট প্রতিষ্ঠা করবে। এই ইউনিট এ আইনের বিধান অনুযায়ী অন্য দেশের সাথে চুক্তি বা ব্যবস্থার অধীন সংশ্লিষ্ট দেশের অনুরূপ ইউনিট মানি-লন্ডারিং বা সন্দেহজনক লেনদেনের কোনো তথ্য প্রদানের অনুরোধ করলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ইউনিট তা প্রদান করবে এবং একই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের ইউনিট অন্য কোনো দেশের কাছে কোনো সন্দেহজনক লেনদেন সর্ম্পকে যেকোন তথ্য প্রদান করার অনুরোধ জানাতে ক্ষমতাবান।

উপর্যুক্ত উদ্দেশ্যে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংককে বিদেশি রাষ্ট্রের সাথে এ সর্ম্পকিত চুক্তি করার ক্ষমতা এ আইনে দেয়া হয়েছে। এ ক্ষমতার আওতায় সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক অন্য দেশের সাথে সমঝোতা স্মারক, দ্বিপাক্ষিক বা বহুপাক্ষিক চুক্তি, কনভেনশন বা আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত অন্য কোনভাবে কোনো বিদেশী রাষ্ট্র বা সংস্থার সাথে চুক্তি করতে সক্ষম। এ ধরনের চুক্তিবদ্ধতার মাধ্যমে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক (ক) সংশ্লিষ্ট বিদেশি রাষ্ট্র বা সংস্থার কাছে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি চাইতে পারবে এবং (খ) ঐ রাষ্ট্র বা সংস্থা কর্তৃক যাচিত তথ্যাদি জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি হুমকি না হলে, সরবরাহ করবে। আইনে কোনো কোম্পানি কর্তৃক সংঘটিত কোনো অপরাধের বিধান সুরক্ষিত রয়েছে।

এ আইন বা বিধির অধীনে কোনো ব্যক্তির ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে তার জন্য সরকার বা সরকারের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী বা রিপোর্ট প্রদানকারী সংস্থার বিরুদ্ধে কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি বা অন্য কোনো আইনগত কার্যধারা দায়ের করা যাবে না। [এ.এম.এম শওকত আলী]

গ্রন্থপঞ্জি Bangladesh Gazette (Extraordinary), February 24, 2009.