মাটি


মাটি (Soil)  স্থলজ গাছপালা জন্মানোর প্রাকৃতিক মাধ্যম। অন্যভাবে বলা যায় যে, অসংহত শিলা ও মণিকের ভগ্নাংশ এবং পৃথিবী পৃষ্ঠে উৎপন্ন জৈবপদার্থের সঞ্চয়ন, যা জীবন ধারণে সহায়তা করতে সক্ষম।

কঠিন, তরল ও গ্যাসীয় বস্ত্তর সমন্বয়ে গঠিত মাটি একটি তিন দশা বিশিষ্ট সিস্টেম। কঠিন দশা জৈব ও অজৈব পদার্থ দিয়ে গঠিত। অন্যদিকে তরল ও গ্যাসীয় দশাকে যথাক্রমে মৃত্তিকা পানি ও মৃত্তিকা বায়ু বলা হয়। মাটির জৈবপদার্থের মধ্যে গাছপালা, প্রাণী ও অণুজীবসমূহ এবং এদের মৃত দেহের অবশিষ্টাংশ অন্তর্ভুক্ত। মৃত অবশিষ্টাংশগুলো বিয়োজনের বিভিন্ন মাত্রায় অর্থাৎ অবিয়োজিত থেকে সম্পূর্ণ বিয়োজিত এ দুই অবস্থা এবং এদের মধ্যবর্তী স্বল্পস্থায়ী অবস্থায় অবস্থান করে। শিলাতে বিদ্যমান মণিকসমূহ অধিকাংশ অজৈব উপাদান সরবরাহ করে। আবহবিকারের (weathering) কারণে শিলা থেকে বিভিন্ন আকারের কণা উৎপন্ন হয়। এসব কণার মধ্যে বালিকণা, পলিকণা ও এঁটেল গাছপালাকে যান্ত্রিক ও পুষ্টিগত সহায়তা প্রদান করে। মাটিতে রাসায়নিক প্রভাব বিস্তারে বালিকণার অবদান অতি সামান্য। তবে রন্ধ্র পরিসর (pore space) উন্নত করতে এসব কণার ভৌত অবদান গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রন্ধ্র পরিসর মাটির মধ্য দিয়ে বায়ু ও পানির অবাধ যাতায়াতে সাহায্য করে। পলিকণা গাছপালাকে সামান্য পরিমাণে পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে। এদের বিপরীতে এঁটেলকণা সবচেয়ে বেশি সক্রিয় এবং মৃত্তিকাতে সংঘটিত সব বিক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দু। মাটির ভৌত এবং রাসায়নিক উভয় প্রকার ধর্ম সর্বাধিক মাত্রায় এঁটেল অংশ দ্বারা প্রভাবিত হয়। এঁটেলগুলো কলয়ডীয় প্রকৃতির এবং সাধারণত ঋণাত্মক আধান (negative charge) ধারণ করে। এ কারণে এদের বিনিময় স্থানের চারদিকে ধনাত্মক আয়ন, যেমন ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, পটাশিয়াম ও অ্যামোনিয়াম আয়ন ধরে রাখে।

মাটির পানি ও বায়ু মাটির রন্ধ্র পরিসরে অবস্থান করে। স্বাভাবিক অবস্থায় স্থূল রন্ধ্রে বায়ু এবং সূক্ষ্মরন্ধ্রে পানি থাকে। কোন একটি মাটিকে কৃষি কাজের জন্য উত্তম তখনই বলা হয় যখন এর রন্ধ্র পরিসর সমান অনুপাতে পানি ও বায়ু দ্বারা পূর্ণ থাকে।

মৃত্তিকা বায়ুর উপাদান সর্বদা পরিবর্তিত হচ্ছে এবং এর উপাদান বায়ুমন্ডলীয় বায়ুর উপাদানের প্রায় সদৃশ। তৎসত্ত্বেও বায়ুমন্ডলীয় বায়ুর তুলনায় মৃত্তিকা বায়ুতে কার্বন ডাইঅক্সাইড ও পানি বাষ্পের পরিমাণ অধিক এবং অক্সিজেনের পরিমাণ কম থাকে। পরিবেশগত অবস্থায় ব্যাপক পরিসরে ভিন্নতার কারণে বাংলাদেশে বিভিন্ন প্রকার মাটি পাওয়া যায়। পরিবেশগত ভিন্নতাগুলোর কারণ হলো: (১) উৎসবস্ত্ত, (২) জলবায়ু, (৩) ভূ-সংস্থান, (৪) নিষ্কাশন, (৫) গাছপালা এবং (৬) সময়। এসব অবস্থার উপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের মাটিকে কতকগুলো জেনারেল সয়েল টাইপে বিভক্ত করা হয়েছে: কালো তেরাই মাটি (হিমালয় পর্যন্ত পর্বত পাদদেশীয় সমভূমির উত্তরে অবস্থিত; চুনহীন বাদামি পললভূমি মাটি (হিমালয় পর্বত পাদদেশীয় সমভূমি); চুনযুক্ত বাদামি পললভূমি মাটি (গঙ্গা নদী দ্বারা অবক্ষেপিত পললে উৎপন্ন এবং যশোর জেলার পশ্চিম ও কুষ্টিয়া জেলার দক্ষিণাঞ্চলের মাটি); চুনহীন পলল (ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, মেঘনা এবং উত্তর ও পূর্বাঞ্চলীয় ছোট ছোট নদীর সম্প্রতিক অবক্ষেপ); চুনযুক্ত পলল (গঙ্গা ও লোয়ার মেঘনা নদীর সাম্প্রতিক অবক্ষেপ); ধূসর পললভূমি মাটি (চুনহীন পললে উৎপন্ন এবং কৃষিকাজে ব্যবহূত মাটির মধ্যে সবচেয়ে উৎপাদনশীল মাটি); চুনযুক্ত গাঢ় ধূসর পললভূমি মাটি (গঙ্গা নদী পললভূমির অধিকাংশ এলাকায় অবস্থিত); এসিড বেসিন এঁটেল (প্রধানত হাওর বেসিন এলাকাতে অবস্থিত); পিট (দেখুন জৈবমৃত্তিকা); অম্ল সালফেট মাটি (প্রধানত খুলনা, সুন্দরবন কটাল বনাঞ্চল ও এদের সন্নিকটস্থ কিছু এলাকা এবং চকোরিয়া); বাদামি পর্বত পাদদেশীয় মাটি (সিলেটের পাহাড় বরাবর হিমান্ত পলিভূমিতে উৎপন্ন এবং চট্টগ্রামের উপ-অঞ্চলের সমতলভূমি); ধূসর সোপান ও উপত্যকা মাটি (বরেন্দ্রভূমির অধিকাংশ সমতলভূমি); ধূসর সোপান ও উপত্যকা মাটি (বরেন্দ্র ভূমির অধিকাংশ এবং সুসং পাহাড়ের সানুদেশে অবস্থিত); গভীর লাল-বাদামি মাটি (মধুপুর অঞ্চলের তুলনামূলকভাবে সুনিষ্কাশিত অংশ, বরেন্দ্র ভূমির উত্তর-পূর্বাঞ্চল, লালমাই পাহাড়ের কোন কোন অংশ এবং স্থানীয়ভাবে সিলেটের টিলা ও চট্টগ্রামের উপ-অঞ্চলের পাহাড়ের মধ্যে উৎপন্ন); অগভীর লাল-বাদামি সোপান মাটি (মধুপুর অঞ্চলে ব্যাপকভাবে এবং অত্যন্ত স্থানীয়ভাবে বরেন্দ্রভূমির উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে উৎপন্ন); বাদামি কর্বুরিত (mottled) সোপান মাটি এবং বাদামি পাহাড়ি মাটি (সিলেটের পাহাড় ও পর্বত অঞ্চলে এবং চট্টগ্রামের উপ-অঞ্চলে পাওয়া যায়)।  [রামেশ্বর মন্ডল]

আরও দেখুন বাংলাদেশের মৃত্তিকা