মহেশ্বরপাশা জোড়বাংলা মন্দির


মহেশ্বরপাশা জোড়বাংলা মন্দির  খুলনার দৌলতপুর উপজেলায় মহেশ্বরপাশা গ্রামে অবস্থিত। এটি বাংলার নানা লোকজ বৈশিষ্ট্য সম্বলিত মধ্যযুগীয় স্থাপত্য কীর্তির একটি অনুপম উদাহরণ। নওয়াব আলীবর্দী খানের আমলে ১৭৪৯ খ্রিস্টাব্দ (১৬৭১ শকাব্দ) মল্লিক বংশীয় গোপীনাথ গোস্বামী নামক এক খ্যাতনামা সাধক মন্দিরটি নির্মাণ করেন। নির্মাতার পরিচয় ও নির্মাণ তারিখ সম্বলিত একটি ইষ্টক লিপি মন্দিরের পূর্ব বহির্দেয়ালে লাগানো আছে।

ভূমি থেকে ০.৯১১ মিটার উঁচু এবং ৭.০১ মিটার বর্গাকার মঞ্চের উপর দক্ষিণ দুয়ারী মন্দিরটি অবস্থিত। মাঝখানে পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা একটি ১.০৭ মিটার পুরু দেয়াল টেনে মন্দিরের বর্গাকার কক্ষটিকে দুটি আয়তাকার কক্ষে বিভক্ত করা হয়েছে। উত্তরের ৫.৪৫ মি দৈর্ঘ্য ও ২.২৯ মি প্রস্থ বিশিষ্ট কক্ষটি গর্ভগৃহ এবং দক্ষিণের আঠারো ৫.৪৫ মি ও ১.৫২ মি প্রস্থ বিশিষ্ট কক্ষটি বারান্দা হিসেবে ব্যবহূত। মাঝের পুরুদেয়ালটিকে সাধারণ দেয়াল ধরে নিয়ে কক্ষ দুটির উপর বক্রকার্নিসযুক্ত বাংলার কুঁড়েঘরের ন্যায় দোচালা পদ্ধতিতে দুটি ছাদ নির্মাণ করা হয়েছে। বক্রচালা দুটির শিরোভাগের উপর দিয়ে তিনটি করে বহু গোলকযুক্ত ফিনিয়াল দন্ড স্থাপিত।

মহেশ্বরপাশা জোড়বাংলা মন্দির

মন্দিরের দক্ষিণের সম্মুখভাগে দুটি কলামের সাহায্যে তিনটি খিলান তৈরি করে মন্দিরের প্রবেশদ্বারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। খিলানগুলি চৌকেন্দ্রিক সুঁচালু, এদের বহিস্থ চাপজুড়ে অলংকৃত ইটের সাহায্যে সুদৃশ্য বহুফলার খাঁজকাটা নকশা রয়েছে। মন্দিরের সম্মুখভাগ টেরাকোটা দিয়ে পরিপূর্ণভাবে অলংকৃত। তবে খিলানগুলির স্প্যানড্রেলে ব্যবহূত টেরাকোটাগুলি বেশি আকর্ষণীয়। মাঝখানের প্রধান খিলানের স্প্যানড্রেল জুড়ে রয়েছে রাম ও রাবণের যুদ্ধ-দৃশ্য। পাশের দুটি খিলানের স্প্যানড্রেলে নগ্ন নারী ও রাজপুরুষ ভাস্কর্যের সাথে ছুটন্ত ঘোড় সওয়ার ও সশস্ত্র যোদ্ধাদের চিত্রফলক রয়েছে। এ মন্দিরের টেরাকোটা ফলকগুলিতে সমকালীন বাংলার সমাজ, সংস্কৃতি ও দৈনন্দিন কাজকর্মের নানা বৈশিষ্ট্য ছাড়াও পশু-পাখির চিত্রাদি প্রতিফলিত হয়েছে। মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রবেশের জন্য সম্মুখের খিলানগুলির সমান্তরালে মাঝের দেয়ালের কেন্দ্রস্থলে রয়েছে একটি খিলান প্রবেশপথ। এর উভয়পাশে একটি করে জানালা রয়েছে। মন্দিরের উভয় কক্ষের পূর্ব ও পশ্চিম দেয়ালে এক জোড়া করে গভীর কুলুঙ্গির ব্যবস্থা করা হয়েছে। গর্ভগৃহের উত্তর দেয়ালের কেন্দ্রস্থলে মেঝেতে রয়েছে বিগ্রহ রাখার মূল বেদি। গর্ভগৃহের উত্তর-পশ্চিম কোণায় একটি ছোট আকারের খিলান দরজা রয়েছে, যা দ্বারা মন্দিরের পেছন দিকে গমনাগমন করা যায়। স্থাপত্যটির সম্মুখভাগ ছাড়া অন্যান্য পার্শ্বে অলংকরণ তেমন নেই। আগুনে পোড়ানো লাল রঙের ছোট ছোট ইটের সাথে চুন-সুঁড়কির মর্টার সহযোগে মন্দিরটি নির্মিত।  [মোহাম্মদ আলমগীর]