মহা হিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক


মহা হিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক  রাষ্ট্রীয় তহবিলের ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনায় সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত ও রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগকৃত শীর্ষ নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক। বাংলাদেশের সংবিধানের ১২৭(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ১৯৭৩ সালের ১১ মে প্রথম মহা হিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক পদে নিয়োগ দেয়া হয়।

ভারত উপমহাদেশে ১৮৫৮ সালে গভর্নর জেনারেল কর্তৃক প্রথম মহা হিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক পদে নিয়োগ প্রদান করা হয়। ১৯১৯ সালের সাংবিধানিক পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে সেক্রেটারি অব স্টেট ফর ইন্ডিয়া কর্তৃক পরবর্তী মহা হিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক পদে নিয়োগ প্রদান করা হয়েছিল। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের আওতায় মহা হিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের দায়িত্ব ও কর্মের সার্বিক পরিধি নিয়ন্ত্রিত হয়। পাকিস্তান (অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস) অর্ডার ১৯৫২ এবং ১৯৬২ সালের পাকিস্তান সংবিধানের ১৯১-১৯৭ অনুচ্ছেদে সন্নিবেশিত সাংবিধানিক বিধানাবলির মাধ্যমে পাকিস্তানের মহা হিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক পদ সৃষ্টি হয় এবং এ পদের দায়িত্ব, কার্যকাল, কর্মের শর্তাবলি ইত্যাদি বিষয় সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর পাকিস্তানের মহা হিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের অধীনস্থ ‘অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল, পূর্ব পাকিস্তান’ পদকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট বিভাগের একটি আদেশ দ্বারা ‘অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল, বাংলাদেশ’ পদে রূপান্তর করা হয়।

সংবিধানের ১২৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশের মহা হিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সংক্ষেপে মহা হিসাবনিরীক্ষক) পদের চাকুরির বয়সসীমা ৬০ (ষাট) বছর। সুপ্রিম কোর্টের কোনো বিচারক যেরূপ পদ্ধতি ও কারণে অপসারিত হতে পারেন, সেরূপ পদ্ধতি ও কারণ ব্যতীত তাকে অপসারণ করা যায় না। রাষ্ট্রপতি বরাবরে পদত্যাগপত্র পেশ করে তিনি পদত্যাগ করতে পারেন। তবে কর্মের মেয়াদ পূর্তি, পদত্যাগ বা অপসারণজনিত যেকোন কারণে কর্মাবসানের পর প্রজাতন্ত্রের অন্য কোনো পদে তিনি নিযুক্ত হতে পারেন না।

কোনো সময়ে মহা হিসাবনিরীক্ষকের পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে তিনি দায়িত্ব পালনে অক্ষম, রাষ্ট্রপতির নিকট সন্তোষজনকভাবে এরূপ প্রতীয়মান হলে সংবিধানের ১২৭ অনুচ্ছেদের অধীনে নতুন কোনো নিয়োগদান না করা পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ১৩০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী অন্য কোনো ব্যক্তিকে অস্থায়ী মহা হিসাবনিরীক্ষক পদে নিয়োগ দান করতে পারেন। সাংবিধানিক পদধারী হিসেবে মহা হিসাবনিরীক্ষকের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুবিধাদি মহা হিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (পারিশ্রমিক ও বিশেষ অধিকার) অধ্যাদেশ ১৯৭৬-এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট করা হয়েছে।

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১২৭(২) অনুযায়ী এবং সংসদ কর্তৃক প্রণীত যেকোন আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে মহা হিসাবনিরীক্ষকের কর্মের শর্তাবলি রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নির্ধারিত হয়। অধিকন্তু মহা হিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (অতিরিক্ত কর্ম) আইন ১৯৭৪ এবং একই সঙ্গে মহা হিসাবনিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (অতিরিক্ত কর্ম) সংশোধনী আইন ১৯৭৫-এর মাধ্যমে প্রজাতন্ত্রের সরকারি হিসাবরক্ষণ ও যাবতীয় নিরীক্ষাকার্য পরিচালনাসহ সকল বিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার কর্তৃপক্ষের হিসাব নিরীক্ষাকার্য পরিচালনার ক্ষেত্রে মহা হিসাবনিরীক্ষকের কার্যাবলি, দায়িত্ব ও ক্ষমতা সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত হয়েছে।

মহা হিসাবনিরীক্ষক তার অধীনস্থ বাংলাদেশ অডিট ডিপার্টমেন্টের মোট ৯টি পৃথক ও স্বয়ংসম্পূর্ণ অডিট অধিদপ্তরের মাধ্যমে হিসাব নিরীক্ষাকার্য সম্পন্ন করেন। এসব অধিদপ্তর হলো: বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তর; স্থানীয় ও রাজস্ব অডিট অধিদপ্তর; পূর্ত অডিট অধিদপ্তর; প্রতিরক্ষা অডিট অধিদপ্তর; রেলওয়ে অডিট অধিদপ্তর; ডাক, তার ও টেলিফোন অডিট অধিদপ্তর; বৈদেশিক সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প অডিট অধিদপ্তর; দূতাবাস অডিট অধিদপ্তর এবং সিভিল অডিট অধিদপ্তর। প্রজাতন্ত্রের হিসাবরক্ষণ সম্পর্কিত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তিনটি প্রধান হিসাবরক্ষণ কাঠামো মহা হিসাবনিরীক্ষকের প্রত্যক্ষ নির্দেশনায় পরিচালিত হয়। এগুলি হলো মহা হিসাবরক্ষক, বেসামরিক হিসাবরক্ষণ তথা প্রজাতন্ত্রের হিসাবরক্ষণে মূল সমন্বয়ক হিসাব; কন্ট্রোলার জেনারেল, ডিফেন্স ফাইন্যান্স বা প্রতিরক্ষা বিভাগের হিসাবরক্ষণ এবং অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অর্থ), বাংলাদেশ রেলপথ বিভাগের হিসাবরক্ষণ।

সংবিধানের ১৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের হিসাব সম্পর্কিত মহা হিসাবনিরীক্ষকের বার্ষিক রিপোর্টসমূহ যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির নিকট দাখিল করার পর রাষ্ট্রপতি তা সংসদে পেশ করেন। সংবিধানের ১২৮(৪) অনুচ্ছেদের মাধ্যমে নিরীক্ষা ও হিসাব সম্পর্কিত কার্য পরিচালনায় মহা হিসাবনিরীক্ষকের কর্মের স্বাধীনতা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হয়েছে। তবে প্রশাসনিক বিষয়াবলি, যেমন বাজেট বরাদ্দ প্রাপ্তি ও কর্মী ব্যবস্থাপনায় তিনি সরকারের নির্বাহী বিভাগ তথা প্রশাসনিক মন্ত্রণালয় হিসাবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগের উপর নির্ভরশীল। [মাহমুদুল হক ভুঁইয়া]