মহাস্থবির, বংশদীপ


মহাস্থবির, বংশদীপ (১৮৮০-১৯৭০)  বৌদ্ধ ধর্মপ্রচারক। ১২৮৭ বঙ্গাব্দের ২৮ মাঘ (১৮৮০) চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া থানার নাইখাইন গ্রামে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতৃদত্ত নাম প্রাণহরি। এন্ট্রান্স পাস করে তিনি রেলওয়ের কাজে যোগ দেন এবং কিছুকাল পরে চাকরি ও সংসার ছেড়ে বার্মা যান। সেখানকার বৈজয়ন্তী বিহারের অধ্যক্ষ উ সাগরা মহাস্থবিরের নিকট তিনি শ্রামণ্য ধর্মে দীক্ষিত হন এবং সে সময় তাঁর নতুন নামকরণ হয় ‘বংশদীপ’।

বংশদীপ বার্মায় চার বছর বৌদ্ধশাস্ত্র ও  পালি অধ্যয়ন করে শ্রীলঙ্কা গমন করেন এবং সেখানে প্রায় পাঁচ বছর বিভিন্ন বৌদ্ধ পন্ডিতের তত্ত্বাবধানে থেকে পালি ভাষা,  ব্যাকরণ ও  ত্রিপিটক শাস্ত্রে পান্ডিত্য অর্জন করেন। স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি পটিয়া থানার বাকখালি গ্রামের বোধিসত্ত্ব বিহারে একটি পালি শিক্ষাকেন্দ্র স্থাপন করে অধ্যাপনায় নিযুক্ত হন।

সাধারণের মধ্যে বৌদ্ধ জীবনদর্শন শিক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে বংশদীপ এক ভিক্ষু মহাসভার আয়োজন করেন। ভিক্ষুদের বিনয়সম্মত ও গৃহীদের মিথ্যাদৃষ্টিমুক্ত জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে এই সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ‘জীনশাসন সমাগম’ নামে একটি সংগঠন স্থাপিত হয়। বংশদীপের প্রচেষ্টা ও আচার্য পূর্ণানন্দ স্বামীর সহায়তায় পালি ভাষা ও বৌদ্ধধর্মের শিক্ষণ পদ্ধতি সরকারি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত সংস্কৃত শিক্ষা বোর্ডের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং কর্তালা-রেলখাইন সদ্ধর্মালঙ্কার বিহারে সরকার অনুমোদিত একটি পালি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এছাড়া তাঁর প্রচেষ্টায় কলকাতার ধর্মাঙ্কুর বৌদ্ধ বিহারে নালন্দা বিদ্যাভবন নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও প্রতিষ্ঠিত হয়। সেখানে এক সময় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের সমাগম ঘটত।

১৯৫৬ সালে বিশ্বব্যাপী ২৫০০তম বুদ্ধাব্দ পূর্তি উপলক্ষে বার্মা সরকারের উদ্যোগে যে ষষ্ঠ  সঙ্গীতি অনুষ্ঠিত হয়, পাকিস্তান সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে বংশদীপ তাতে যোগদান করেন। একই বছর ভারতের দিল্লিতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক বুদ্ধজয়ন্তী অনুষ্ঠানেও তিনি অংশগ্রহণ করেন।

বংশদীপ বাংলা ভাষায় বহু পালি গ্রন্থ অনুবাদ ও মৌলিক গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর রচিত ধর্মসুধা, বুদ্ধবন্দনা, ভিক্ষু প্রতিমোক্ষ, প্রজ্ঞাভাবনা, পদমালা, বালাবতার ব্যাকরণ, কচ্চায়ন ব্যাকরণ প্রভৃতি সুধীসমাজে সমাদৃত হয়। এ গ্রন্থগুলি আজও উপমহাদেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠ্যপুস্তক হিসেবে পড়ানো হয়। ১৯৭০ সালের ৩০ ডিসেম্বর চট্টগ্রামে তাঁর মৃত্যু হয়।  [ভিক্ষু সুনীথানন্দ]