মহাস্থবির, প্রজ্ঞালোক


মহাস্থবির, প্রজ্ঞালোক (১৮৭৯-১৯৭১)  বৌদ্ধ ধর্মপ্রচারক, শিক্ষাবিদ ও লেখক। ১৮৭৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর  চট্টগ্রাম জেলার বোয়ালখালী উপজেলার বৈদ্যপাড়া গ্রামে তাঁর জন্ম। শৈশবে তাঁর নাম ছিল ধর্মরাজ বড়ুয়া। একুশ বছর বয়সে তিনি আচার্য পুণ্ণাচার মহাস্থবিরের সান্নিধ্যে আসেন এবং তাঁর নিকট শাক্যমুনি বিহারে শ্রামণ্য ও  উপসম্পদা লাভ করেন। ১৯০৯ সালে নাইখাইনে গুরুর নিকট তিনি ধর্ম-বিনয়াদি শিক্ষা লাভ করেন এবং  পালি শিক্ষার জন্য পালি পঠম সিকখা এবং ভিক্ষু ও গৃহীদের নিত্যপ্রয়োজনীয় বিষয়ে জ্ঞানদান করার জন্য ভিক্ষু কর্তব্য ও গৃহী কর্তব্য নামক গ্রন্থ রচনা করেন।

প্রজ্ঞালোক ১৯১৩ সালে শ্রীলঙ্কা গিয়ে সদ্ধর্মোদয় মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ উপসেন মহাস্থবিরের নিকট  ত্রিপিটক অধ্যয়ন করেন। সেখান থেকে প্রত্যাবর্তনের পর তিনি সতীর্থ যুবক ভিক্ষুদের নিয়ে ‘জিনশাসন সমাগম’ নামক একটি সমিতি গঠন করে সদ্ধর্ম প্রচারে মনোনিবেশ করেন। ১৯২২ সালে তিনি পটিয়া থানার কানাইমাদারী গ্রামে বিদর্শনারাম এবং সীতাকুন্ড থানার মায়নী গ্রামে সুদর্শন বিহার প্রতিষ্ঠা করেন। এ সময় তিনি টীকা-টিপ্পনীসহ ভিকখু পাতিমোক্খ-এর বাংলা অনুবাদ করেন। এরপর তিনি আকিয়াবে গিয়ে সেখানকার বাঙালি বৌদ্ধদের সহায়তায় বঙ্গীয় বৌদ্ধ সমিতি ও বিহার প্রতিষ্ঠা করেন এবং ধর্মদূত বিহারের অধ্যক্ষ পদে আসীন হন।

আকিয়াবে অবস্থানকালে প্রজ্ঞালোক দানমঞ্জরী, কঠিন চীবরদানানিসংস, রত্নমালা বিশোধন প্রভৃতি গ্রন্থ সঙ্কলন ও প্রণয়ন করেন। এছাড়াও তিনি বৌদ্ধ মিশন ও প্রেস (১৯২৮) প্রতিষ্ঠা এবং জাতীয় মুখপত্র সংঘশক্তি পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি সটীক মিলিন্দপ্রশ্ন (অনুবাদ, ২ খন্ড), থেরগাথা, লোকনীতি, তেলকটাহ গাথা (অনুবাদ), পালি ত্রিপিটক (প্রচার-পুস্তিকা), প্রবাস সুহূদ, গৃহীনীতি, নামরূপ, বুদ্ধের ধর্ম পরিচয় প্রভৃতি গ্রন্থ সঙ্কলন ও প্রণয়ন করেন।

১৯৩৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর প্রজ্ঞালোকের জন্মবার্ষিকীতে বার্মার প্রবীণতম ভিক্ষুমন্ডলী এক মহাসংঘদানের আয়োজন করে তাঁকে ‘বুদ্ধ শাসন বীর্যস্তম্ভ শাসন ধ্বজ’ উপাধি প্রদান করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে বোমার আঘাতে বৌদ্ধ মিশন প্রেস ধ্বংস হয়ে গেলে তিনি পদব্রজে উত্তর ব্রহ্মদেশ ও আসাম হয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

১৯৪৫ সালের দুর্ভিক্ষ ও মহামারীর সময় বৌদ্ধদের কল্যাণার্থে প্রজ্ঞালোক একটি সেবা-সদন গঠন করেন; পটিয়ার তেকোটা গ্রামে এর স্থায়ী কার্যালয় অবস্থিত। ১৯৪৮ সালের শেষদিকে তিনি পুনরায় ব্রহ্মদেশে যান এবং সেখানে বুদ্ধের যোগনীতি, বিদর্শন ভাবনা, আর্যসত্য,  ধম্মপদ, সূত্তবিভঙ্গ প্রভৃতি গ্রন্থ সম্পাদনা করেন। ধর্মকর্ম ও সমাজসেবার জন্য ব্রহ্মদেশ সরকার তাঁকে ‘অগ্গমহাপন্ডিত’ (১৯৫৪) উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯৭১ সালের ১২ মে চট্টগ্রামে তাঁর মৃত্যু হয়।  [ভিক্ষু সুনীথানন্দ]