মহাস্থবির, কৃপাশরণ


মহাস্থবির, কৃপাশরণ (১৮৬৫-১৯২৭)  বৌদ্ধ ভিক্ষু, পন্ডিত। অবিভক্ত বাংলায় বৌদ্ধধর্মের পুনর্জাগরণ ও বৌদ্ধদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারে যে কয়জন বৌদ্ধ ভিক্ষু বিশেষ অবদান রেখেছেন, কৃপাশরণ তাঁদের অন্যতম। ১৮৬৫ সালের ২২ জুন  চট্টগ্রাম জেলার  পটিয়া উপজেলার উনাইনপুরা গ্রামে তাঁর জন্ম। অতি অল্প বয়সে পিতৃহারা হয়ে তিনি স্বগ্রামস্থ বিহারের অধ্যক্ষ সুদন মহাস্থবিরের নিকট  প্রব্রজ্যা ও  উপসম্পদা গ্রহণ করেন। এ সময় তাঁর নাম রাখা হয় চন্দ্রজ্যোতি, কিন্তু আমৃত্যু তিনি কৃপাশরণ নামেই পরিচিত ছিলেন।

উপসম্পদা লাভের পর কৃপাশরণ বৌদ্ধ তীর্থস্থানগুলি ভ্রমণ করেন এবং সেখানকার দৈন্য দশা দেখে তখন থেকেই তিনি বৌদ্ধধর্মের পুনর্জাগরণের জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। এ লক্ষ্যেই তিনি কলকাতার মলঙ্গা লেইনে (পরে বৌবাজার স্ট্রিটে) একটি জরাজীর্ণ বাড়িতে প্রতিষ্ঠা করেন মহানগর বিহার। বৌদ্ধধর্মের প্রচার ও প্রসারের জন্য ১৮৯১ খ্রিস্টাব্দে তিনি  বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভা নামে একটি সমিতিও প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীকালে এ ধর্মাঙ্কুর সভার মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠিত হয় ধর্মাঙ্কুর বৌদ্ধ বিহার। এটিই ছিল এক সময় বৌদ্ধদের ধর্ম, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের কেন্দ্রবিন্দু। এ সময় কৃপাশরণ মহাবীর মহাস্থবিরের নিকট ধর্ম, বিনয় ও  পালি ভাষা শিক্ষা করেন।

কৃপাশরণ ছিলেন একজন কর্মযোগী পুরুষ। তিনি জীবনব্যাপী বাঙালি বৌদ্ধদের ধর্ম ও সমাজের উন্নতি, সদ্ধর্মের প্রচার ও প্রসার এবং পালি ও ধর্মীয় শিক্ষা বিস্তারের জন্য অসামান্য অবদান রাখেন। তাঁর স্বোপার্জিত সব অর্থ তিনি দান করেন সমাজ, ধর্ম ও শিক্ষার উন্নয়ন কাজে। বাঙালি বৌদ্ধদের ধর্মচর্চার সুবিধার্থে তিনি বাংলা ভাষায়  ত্রিপিটক অনুবাদ করেন। তিনি ব্রহ্মদেশ থেকে সমগ্র অট্ঠকথাসহ ত্রিপিটক এবং দুষ্প্রাপ্য বৌদ্ধ গ্রন্থসমূহ সংগ্রহ করে বিশিষ্ট বৌদ্ধ পন্ডিত গুণালংকার স্থবিরের স্মৃতি রক্ষার্থে একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেন, যার নাম রাখা হয় ‘গুণালংকার পাঠাগার’।

কৃপাশরণ ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে জগজ্জ্যোতি নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করেন। পত্রিকাটি বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভার মুখপত্র ছিল। এর মাধ্যমে বৌদ্ধদের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস, প্রত্নতত্ত্ব প্রভৃতি বিষয় তুলে ধরা হতো। অবিভক্ত বাংলায় এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকাগুলির একটি। দেশীয়দের পাশাপাশি তিববত, বার্মা, আরাকান ও শ্রীলংকার প্রবীণ ভিক্ষুমন্ডলীর সঙ্গেও কৃপাশরণের সুসম্পর্ক ছিল।

কৃপাশরণ মহাবোধি সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা  অনাগারিক ধর্মপাল কর্তৃক আমন্ত্রিত হয়ে ১৯১২ খ্রিস্টাব্দে সিংহল যান এবং সেখানে পালি ভাষা ও বৌদ্ধ শাস্ত্রসমূহ অধ্যয়ন করেন। তিনি ব্রহ্মদেশেও পালি ভাষা চর্চা করেন। তিনি বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর বিহারে বালক-বালিকাদের জন্য অবৈতনিক এবং শ্রমজীবীদের জন্য নৈশ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। মহিলাদের উন্নত ধ্যান-ধারণার জন্য তিনি স্থাপন করেন ধর্ম ও নীতিশিক্ষা কেন্দ্র। পরবর্তী সময়ে তাঁর মাধ্যমে এবং তাঁর উৎসাহ-অনুপ্রেরণায় উত্তর প্রদেশের লক্ষ্ণৌসহ অবিভক্ত বাংলার বিভিন্ন স্থানে অনেক বিহার ও পাঠাগার প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দের ৩০ এপ্রিল কৃপাশরণ কলকাতার ধর্মাঙ্কুর বিহারে মৃত্যুবরণ করেন।  [সুকোমল বড়ুয়া]