মহাবীর


মহাবীর (আনু. ৫৯৯-৫২৭ খ্রি.পূ.)  জৈনধর্ম ও দর্শনের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি আনুমানিক ৫৯৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বর্তমান ভারতের বিহার প্রদেশের পাটনার নিকটস্থ ক্ষত্রিয়কুন্ডু গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম সিদ্ধার্থ, মাতার নাম ত্রিশালা বা প্রিয়কারিণী এবং স্ত্রীর নাম যশোধা। জৈন ধর্মবিশ্বাস অনুসারে তিনি ছিলেন এ ধর্মের ২৪তম এবং সর্বশেষ ‘তীর্থঙ্কর’ বা ধর্মগুরু।

মহাবীরের পিতৃ-প্রদত্ত নাম বর্ধমান। এছাড়া তাঁকে বীর, বীরপ্রভু, সান্মতি, অতিবীর, জ্ঞাতপুত্র, বৈশালিয় ইত্যাদি নামে অভিহিত করা হয়। তবে তিনি মহাবীর নামেই সমধিক পরিচিত। জনশ্রুতি অনুসারে মহাবীরের জন্মলাভের পর তাঁর পরিবার বিপুল ধন সম্পদের অধিকারী হয়। জনগণের বিশ্বাস জন্মের পর দেবতা ইন্দ্র তাঁকে স্বর্গীয় দুগ্ধ দ্বারা স্নান করিয়ে পবিত্র করেন। রাজার পুত্র হিসেবে তিনি রাজকীয় জীবনযাপন করতে পারতেন। কিন্তু তাঁর ৩০ বছর বয়সে পিতা-মাতার মৃত্যু হলে ভাই নন্দী বর্ধমানের অনুমতি নিয়ে তিনি সন্ন্যাস ধর্ম গ্রহণ করেন। সুদীর্ঘ ১২ বছর গঙ্গা অববাহিকায় একাগ্রচিত্তে ও একনিষ্ঠভাবে তপস্যা করে তিনি ‘কৈবল্য’ তথা চরমজ্ঞান লাভ করে ‘মহাবীর’ নামে খ্যাত হন। সিদ্ধিলাভের পর তিনি ‘জিন’ বা ‘রিপু-জয়’ নামেও পরিচিতি লাভ করেন। তিনি প্রায় ৩০ বছর ধর্ম প্রচার করে ৭২ বছর বয়সে দক্ষিণ বিহারের পবা নামক স্থানে ৫২৭ খ্রি.পূর্বাব্দে মারা যান। মৃত্যুকালে তিনি প্রায় ৪ লাখ অনুসারী রেখে যান। মহাবীর প্রচারিত ধর্ম ‘নির্গ্রন্থ’ বা ‘জৈন’ ধর্ম নামে পরিচিত। ভারতের সর্বত্র তাঁর মৃত্যু দিবসকে ‘দীপালি উৎসব’ হিসেবে পালন করা হয়।

মহাবীরের ধর্মদর্শন নিরশ্বরবাদী এবং এই ধর্মদর্শনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে কামনা-বাসনা নিয়ন্ত্রণ করে পার্থিব জীবনের উন্নতি সাধন করা। নৈতিক জীবনাচরণ ও সার্বিক জীবনধারণ অনুসরণ করে আধ্যাত্মিক মুক্তিলাভ তথা কৈবল্য লাভই তাঁর দর্শনের মূলভিত্তি। মহাবীরের দর্শনের দুটি প্রধান দিক হচ্ছে: অধিবিদ্যা ও নীতিবিদ্যা। তাঁর অধিবিদ্যার ৩টি প্রধান দিক হচ্ছে: ১.অনেকান্তবাদ অর্থাৎ বস্ত্তর অসংখ্য গুণ বিদ্যমান। একে বহুত্ববাদও বলে; ২. স্যাদবাদ অর্থাৎ কোনো কিছু চূড়ান্ত সত্য নয়, সম্ভাব্য সত্য মাত্র। একে আপেক্ষিকতাবাদও বলা হয়; এবং ৩. কর্মবাদ। তাঁর নীতিবিদ্যার ৫টি প্রধান দিক হচ্ছে: সত্য, অহিংসা, ব্রহ্মচর্য, অস্তেয় ও  অপরিগ্রহ। মহাবীরের নীতিশিক্ষামূলক অন্যতম বিষয়গুলো:

সদা সত্য কথা বলবে;

নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ;

এমন পরিমাণ সম্পদ সঞ্চয় করো না, যা তুমি তোমার জীবনে ব্যয় করতে পারবে না;

সকলের প্রতি সৎ হও;

অহিংসার পথ অনুসরণ কর; এবং

সব জীবন্তসত্ত্বার প্রতি করুণা প্রদর্শন কর।

মহাবীরের নিজের রচিত কোনো ধর্মগ্রন্থ নেই। শিষ্যগণ কর্তৃক তাঁর উপদেশাবলির সংকলনই জৈনধর্মদর্শন। এই ধর্মদর্শন অর্ধ-মাগধী, প্রাকৃত ও মহারাষ্ট্রীয় ভাষায় রচিত হয়। পরবর্তীকালের গ্রন্থসমূহ অবশ্য সংস্কৃত ভাষায় রচিত। জৈনশাস্ত্র মূলত পূর্বঃ ও অঙ্গঃ এই দুই শ্রেণিতে বিভক্ত। বলা হয় যে, মহাবীরের উপদেশসমূহ পূর্বশাস্ত্রের ১৪টি গ্রন্থে সন্নিবেশিত হয়। এই গ্রন্থসমূহের সন্ধান এখন আর পাওয়া যায় না। মহাবীরের জীবন, দর্শন ও শিক্ষা চিরন্তন সত্যের সন্ধান দেয়। তাঁর মতে, যেকোনো সমস্যা সমাধানের একমাত্র পথ শান্তিপূর্ণ উপায়ে অহিংসার পথ অনুসরণ করা।  [প্রদীপ কুমার রায়]