মসজিদপাড়া মসজিদ


মসজিদপাড়া মসজিদ  কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া থানা সদর থেকে ৫ কিলোমিটার উত্তরে হোয়ার্শি গ্রামে অবস্থিত। হোয়ার্শি মসজিদ নামেও পরিচিত ইমারতটি বর্তমানে বাংলাদেশ প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ কর্তৃক সংরক্ষিত। মসজিদটির প্রধান প্রবেশদ্বারের উপরে স্থাপিত একটি ফার্সি লিপি থেকে জানা যায় যে, ১৬৭৫-৭৬ খ্রিস্টাব্দে আওরঙ্গজেব এর শাসনামলে এটি নির্মিত।

মসজিদপাড়া মসজিদ,  কিশোরগঞ্জ

ভেতরের দিকে ৫.৪৯ মিটার বাহু বিশিষ্ট বর্গাকার মসজিদটি ইটের পলেস্তারা দ্বারা নির্মিত। এর প্রাচীরগুলি ১.৩৭ মিটার পুরু। দেয়ালের চারটি বহিস্থকোণ অষ্টভুজাকৃতির বুরুজ দ্বারা মজবুত করা হয়েছে, যা প্যারাপেট ছাড়িয়ে উপরে উঠে গেছে। বুরুজগুলির উপরে রয়েছে ছত্রীসহ ছোট গম্বুজ। পূর্বের দিকে তিনটি চতুষ্কেন্দ্রিক খিলানপথ রয়েছে। উত্তর ও দক্ষিণ প্রাচীরের ঠিক মাঝখানে রয়েছে একটি মাত্র খিলানপথ। খিলানপথগুলি আয়তাকার কাঠামোয় সন্নিবেশিত। কেন্দ্রীয় প্রবেশপথটি ঐতিহ্যগতভাবে বড় এবং এর সম্মুখভাগে স্থাপিত হয়েছে প্রাচীর সন্নিবেশিত অলঙ্কৃত স্তম্ভের (pilaster) উপর খাজকৃত খিলান (cusped)। কিবলার দিকের প্রাচীরটিতে তিনটি অর্ধঅষ্টভুজাকার মিহরাব কুলুঙ্গি স্থাপিত। কেন্দ্রীয় মিহরাবটি কেন্দ্রীয় খিলানপথটির মতোই পরপর দুটি খিলান সমৃদ্ধ; বাইরেরটি বহুখাঁজ বিশিষ্ট খিলান ও ভেতরেরটি সাধারণ চতুষ্কেন্দ্রিক, এর সমস্তটাই একটি আয়তাকার কাঠামোর মধ্যে অবস্থিত। কেন্দ্রীয় মিহরাবটি পেছনের দিকে আয়তাকারে অভিক্ষিপ্ত। কেন্দ্রীয় মিহরাবটির পাশে একটি তিন-ধাপ বিশিষ্ট মিম্বার রয়েছে।

মসজিদের ছাদ একটি বড় ও মনোরম গোলাকার গম্বুজ দ্বারা আবৃত, যা একটি গোলাকৃতি ড্রাম (drum)-এর উপর স্থাপিত। গম্বুজটি ঈষৎ কন্দাকার (bulbous) এবং শীর্ষদেশ পদ্ম ও কলস (kalasa) চূড়া দ্বারা শোভিত। গম্বুজটির ভার সরাসরি চার প্রাচীর ও বিল্ডিং-এর ভিতরে চার কোণের বেশ বড় আকারের স্থানীয় পেন্ডেন্টিভ (pendentive) বহন করছে। প্যারাপেট (parapet) ও কার্নিসগুলি সরলরৈখিক।

কোণের বুরুজগুলির নিম্নাংশ কলসাকৃতির এবং বন্ধনী দ্বারা বিভক্ত। বুরুজগুলির শীর্ষে বদ্ধ-ছত্রী (kiosks), যার গায়ে ওজি (ogee) আকৃতির খিলান নকশা অংকিত। প্যারাপেট এবং গম্বুজের নিচে ড্রাম-এর নিম্নাংশ মারলোন (merlon) দ্বারা অলঙ্কৃত। মসজিদের কেন্দ্রীয় মিহরাব দেশীয় পোড়ামাটির শিল্পের পূনর্জাগরণের প্রকৃষ্ট প্রমাণ বহন করছে। মিহরাবের অপরূপ খাঁজকৃত খিলানের স্প্যান্ড্রেলে (spandrel) তিন স্তরের রোজেট (rosette) সংযুক্ত এবং খিলানের শীর্ষদেশ কলস নকশা দ্বারা শোভিত। মিহরাবের আয়তাকার কাঠামোটি নিম্নাংশের ফুলদানি থেকে উৎসারিত লতাপাতা নকশায় অলঙ্কৃত। আয়তাকার কাঠামোর ঠিক উপরেই ক্ষুদ্র পরিসরের জায়গাটি শিকলের মতো লুপ দ্বারা পরস্পর সংযুক্ত রোজেট দ্বারা শোভিত।

পূর্ব দিকে বহির্ভাগে কেন্দ্রীয় প্রবেশপথটিও কেন্দ্রীয় মিহরাবের মতো পোড়ামাটির ফলক ও নকশায় অলঙ্কৃত। অন্য তিনটি আয়তাকার স্টাকো (stucco) প্যানেল দ্বারা অলঙ্কৃত, যার উপরে পুরো প্রাচীর জুড়ে রয়েছে একটি ব্যান্ড।

মসজিদটি সুলতানি ও মুগল স্থাপত্য সমন্বয়ের এক আকর্ষণীয় উদাহরণ। সুলতানি শিল্প বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠেছে পোড়ামাটির ফলক নকশা ও বাংলার পেন্ডেন্টিভ-এর মাধ্যমে, আর মুগল নির্মাণ কৌশলের বৈশিষ্ট্য প্রতীয়মান হচ্ছে ড্রাম-এর উপর কন্দাকার গম্বুজ, অনুভূমিক প্যারাপেট ও কার্নিস, আয়তাকার প্যানেল এবং প্রাচীরের মসৃণ পলেস্তারার মাঝে।  [এম.এ বারি]