মর্লি-মিন্টো সংস্কার


মর্লি-মিন্টো সংস্কার (১৯০৯)  ভারতের স্বায়ত্তশাসন লাভ এবং শেষাবধি ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তির পথে সাংবিধানিক ক্রমবিকাশের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী অগ্রগতি। সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে ভারতের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ১৮৯২ সালে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অ্যাক্ট পাস করে। এ আইনের আওতায় গভর্নর জেনারেল ও প্রাদেশিক গভর্নরের আইন পরিষদে বেসরকারি সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে পরিষদগুলোকে শক্তিশালী করা হয়। কিন্তু ভারতের জনমত ছিল দেশের দ্রুত স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে। ভারতের সেক্রেটারি অব স্টেট জন মর্লি ভারতের স্বায়ত্তশাসনের ঘোর বিরোধী ছিলেন। কিন্তু ভারতের গভর্নর জেনারেল লর্ড মিন্টো কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের আয়তন ও কর্মপরিধি বৃদ্ধি করে তাতে সুযোগ্য ভারতীয়দের অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব করেন।

ব্রিটিশ সরকার ভারতে প্রতিনিধিত্বশীল সরকার প্রবর্তনের পরিকল্পনা করছে তা স্পষ্ট হয়ে উঠলে মুসলিম নেতৃবৃন্দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দেয়। তারা আশঙ্কা করেন যে, হিন্দুদের তুলনায় মুসলমানদের সামাজিক ও রাজনৈতিক পশ্চাৎপদতার কারণে যেকোন নির্বাচনী ব্যবস্থায় মুসলমানদের স্বার্থের সঠিক প্রতিনিধিত্ব বাধাগ্রস্ত হতে বাধ্য। এ পরিস্থিতিতে ১৯০৬ সালের অক্টোবরে আগা খানের নেতৃত্বে মুসলিম প্রতিনিধিদের একটি বৃহৎ দল সিমলায় লর্ড মিন্টোর কাছে একটি স্মারকলিপি পেশ করে। ঐ স্মারকপত্রে দাবি করা হয় যে, ভারতে মুসলমানরা আলাদা একটি জাতি এবং ভবিষ্যতে যেকোন সাংবিধানিক সংস্কারের সময় তাদের বিশেষ স্বার্থ রক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষভাবে তারা কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তন এবং মুসলিম জনসংখ্যার অনুপাতের পরিবর্তে রাজনৈতিক গুরুত্ব অনুসারে পরিষদে তাদের সদস্য সংখ্যা নির্ধারণের দাবি জানান। লর্ড মিন্টো প্রতিনিধিদলকে মুসলিম সম্প্রদায়ের জন্য পৃথক প্রতিনিধিত্বের সাংবিধানিক ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।

মর্লি ও মিন্টোর সংস্কার চিন্তাগুলো ১৯০৯ সালের ইন্ডিয়া অ্যাক্টে বাস্তবায়িত হয়েছিল। জন মর্লি ও লর্ড মিন্টোর নামানুসারেই এই সংস্কারের নামকরণ হয় মর্লি-মিন্টো সংস্কার। ইন্ডিয়া অ্যাক্টের প্রধান দিকগুলোর মধ্যে ছিল মুসলমানদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রবর্তন, কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ এবং সেক্রেটারি অব স্টেট ফর ইন্ডিয়ার পরিষদে একজন করে ভারতীয়ের অন্তর্ভুক্তি। এই সংস্কারের আদৌ কোনও প্রতিনিধিত্বশীল সরকার গঠনের উদ্দেশ্য ছিল না। প্রতিনিধিত্বশীল সরকার গঠনের লক্ষ্যে যাত্রা শুরুই ছিল এর উদ্দেশ্য। এ সংস্কারের সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য ছিল মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক নির্বাচকমন্ডলী গঠন। সংস্কারের এ ব্যবস্থা থেকেই মুসলমানদের মধ্যে পৃথক রাজনীতির উদ্ভব ঘটে।  [সিরাজুল ইসলাম]