ময়নামতী, প্রাকৃতিক কাঠামো


ময়নামতী, প্রাকৃতিক কাঠামো  কম উচ্চতাবিশিষ্ট একটি বিচ্ছিন্ন পর্বতসারির ১৮ কিমি দীর্ঘ এবং ২ কিমি প্রশস্ত পার্শ্বীয় শাখা। কুমিল্লা জেলার কেন্দ্রে অবস্থিত এবং ময়নামতী-লালমাই পর্বতসারি নামে পরিচিত এই অঞ্চলে অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে ৫০টিরও অধিক বৌদ্ধ বসতি গড়ে উঠেছিল। কুমিল্লা শহর থেকে ৮কিমি পশ্চিমে অবস্থিত ময়নামতীর ভৌগোলিক অবস্থান ২৩°২০´ উত্তর থেকে ২৩°৩০´ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯১°০৫´ পূর্ব থেকে ৯১°১০´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে। ঢাকা-চট্টগ্রাম এবং কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়ক ময়নামতীর উত্তর পার্শ্ব বরাবর অবস্থিত এবং পূর্ব পার্শ্বে সমান্তরালে অবস্থিত কুমিল্লা-চাঁদপুর সড়কের মাধ্যমে ময়নামতীতে পৌঁছান যায়।

জলবায়ু  প্রধানত উষ্ণ ও আর্দ্র। গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাত পূর্বাংশের সমভূমিতে ১৯৩০ মিমি থেকে বৃদ্ধি পেতে পেতে পশ্চিমাংশের উঁচুভূমিতে ২৫৪০ মিমি-এ পৌঁছে। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিরাজমান শীতকালের পর আসে মার্চ থেকে মে মাস পর্যন্ত বিদ্যমান উষ্ণ ও আর্দ্র প্রাক-মৌসুমি ঋতু। জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ময়নামতী অঞ্চলে বৃষ্টিবহুল মৌসুমি ঋতু। এই অঞ্চল কদাচিৎ ঘূর্ণিঝড়ের শিকার হয়। সর্বোচ্চ তাপমাত্রার পরিসর ৩৭°সে থেকে ৩৯°সে এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পরিসর ৭°সে থেকে ১০°সে পর্যন্ত।

মৃত্তিকা  প্রধানত মিহি মধুপুর কর্দম দ্বারা গঠিত যা শুষ্ক ঋতুতে ফেটে চৌচির হয়ে যায়। এই মৃত্তিকা অম্লধর্মী এবং কম উদ্ভিদ পুষ্টিসমৃদ্ধ। মৃত্তিকার অবশিষ্ট অংশ ডাকাতিয়া, গোমতী এবং ফেনী নদী দ্বারা সঞ্চিত অসংহত এবং ঝুরঝুরে নবীন এবং নবীনপ্রায় পাললিক সঞ্চয়ন দ্বারা গঠিত।

কৃষি  ধান প্রধান ফসল। বেশিরভাগ এলাকায় আউস এবং রোপা আমন ধান চাষ করা হয়। গৃহস্থালি জমিতে শাকসবজি, কলা, বিভিন্ন ধরনের ফলজ গাছ, পান প্রভৃতি উৎপাদন করা হয়ে থাকে। মোট জমির ৪০% এক ফসলি, ৩৮% দুই ফসলি এবং ১০% তিন ফসলি।

ভূসংস্থান এবং ভূ-প্রকৃতি  স্বল্প উচ্চতার পাহাড় এবং প্রশস্ত উপত্যকা প্রধান ভূ-প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য। পাহাড়সমূহের সাধারণ প্রবণতা উত্তর-উত্তরপশ্চিম থেকে দক্ষিণ-দক্ষিণপূর্ব অভিমুখী। এ সকল পাহাড়ের গড় উচ্চতা প্রায় ১২ মিটার, তবে কোন কোন চূড়া ৪০ মিটার কিংবা ততোধিক উচ্চতাবিশিষ্ট। পশ্চিমে পাহাড়সারির অকস্মাৎ সমভূমিতে পতন ঘটেছে যেখানে পূর্বাংশ ধীরে ধীরে সমভূমিতে মিলিত হয়েছে।

জলনিষ্কাশন  চান্দিনা বদ্বীপভূমি দ্বারা বেষ্টিত লালমাই পাহাড়সারি তিনটি প্রধান নদী- গোমতী, ডাকাতিয়া এবং ছোট ফেনী নদী দ্বারা নিষ্কাশিত। এছাড়াও রয়েছে অসংখ্য নালা ও খাল, যেগুলো বর্ষাকালে ভারি বর্ষণের সময় সক্রিয় হয়ে ওঠে। নিষ্কাশন প্রণালীর ধরন মোটামুটি বৃক্ষসদৃশ।

ভূমিরূপ এককসমূহ  ময়নামতীকে তিনটি ভূমিরূপ এককে ভাগ করা যায়। পূর্বদিক থেকে এসকল ভূমিরূপ এককসমূহ হচ্ছে: লালমাই বদ্বীপীয় সমভূমি, চান্দিনা বদ্বীপীয় সমভূমি এবং মেঘনা প্লাবনভূমি।

লালমাই বদ্বীপীয় সমভূমি  উত্তরে শাহাজী বাজার থেকে দক্ষিণে দত্তসার পর্যন্ত বিস্তৃত। ত্রিপুরা পাহাড়ের পশ্চিম ঢাল জুড়ে রয়েছে এই সমভূমি। আনত ডুপি টিলা ভূতাত্ত্বিক স্তরসমষ্টির (Dupi Tila Formation) উপরে অসঙ্গতভাবে অবস্থিত প্লাইসটোসিন মধুপুর কর্দম (২০ লক্ষ বছর থেকে ১ লক্ষ বছর পূর্বে) দ্বারা এই সমভূমি প্রধানত গঠিত। লালচে বাদামি, হলদে বাদামি কর্দম এবং বালুময় কর্দম দ্বারা মধুপুর কর্দম গঠিত। স্থানে স্থানে লৌহময় স্ফীতি লক্ষ্য করা যায়। এই স্তরসমষ্টি অসংহত এবং সমতল।

চান্দিনা বদ্বীপীয় সমভূমি  উত্থিত লালমাই বদ্বীপীয় সমভূমি এবং মেঘনা প্লাবনভূমির মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। পলি, পলি দোঅাঁশ, পলি কর্দম এবং কর্দম দ্বারা এই সমভূমি গঠিত। চান্দিনা স্তরসমষ্টি নামে অভিহিত এই সমভূমির পলল নবীন মেঘনা প্লাবনভূমির পললের অনুরূপ। অসংখ্য অাঁকাবাঁকা ক্ষুদ্র প্রবাহ, পুরাতন কান্দা (Old Levee), অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ এই সমভূমির বৈশিষ্ট্য, যাদের অধিকাংশই বর্তমানে পলিভরাটের শিকার হয়েছে। জে. পি মর্গ্যান ও ডব্লিউ. জি ম্যাকিনটায়ার চান্দিনা বদ্বীপীয় সমভূমিকে টিপারা পৃষ্ঠ (Tippera Surface) নামে অভিহিত করেছেন।

মেঘনা প্লাবনভূমি  শক্তিশালী মেঘনা নদী এবং তার উপনদীসমূহ কর্তৃক সাম্প্রতিক কালের গঠন প্রক্রিয়ার ফলে গঠিত। মেঘনা প্রধানত একটি সর্পিলাকার নদী, তবে কোন কোন স্থানে এটি বিনুনি প্রকৃতিও প্রদর্শন করে। অসংখ্য স্রোতধারা বিস্তীর্ণ এই প্লাবনভূমিকে জালিকার ন্যায় কর্তন করে রেখেছে, যারা প্রতিনিয়ত দ্বীপচর (channel bars), বাঁকের চর (meander bars) এবং প্রাকৃতিক পাড় (levees) সৃষ্টি করে চলেছে।

ভূতত্ত্ব  লালমাই-ময়নামতী পাহাড়সারি এবং এর সন্নিহিত এলাকা বঙ্গীয় পুরঃখাতের (Bengal Foredeep) বলিত অংশের পশ্চিম পার্শ্বে (western fringe) অবস্থিত। পূর্বে লালমাই-ময়নামতী ঊর্ধ্বভঙ্গ (Lalmai-Mainamati anticline) পূর্বে কুমিল্লা অধঃভাজ এবং টিকনা ঊর্ধ্বভঙ্গ (Tichna anticline), পশ্চিমে দাউদকান্দি ও কচুয়া ঊর্ধ্বভঙ্গ, দক্ষিণে বেগমগঞ্জ ঊর্ধ্বভঙ্গ এবং উত্তরে বোখিয়া ঊর্ধ্বভঙ্গ দ্বারা বেষ্টিত। বর্ণিত ভাঁজসমূহ ভূঅভ্যন্তরে অবস্থিত এবং এগুলি হিমালীয় গিরিজনি সময়কালের প্রচন্ড ভূগাঠনিক বিচলন শক্তির সাক্ষ্য বহন করছে।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিম্নমাত্রার অসংহত বেলেপাথর দ্বারা লালমাই-ময়নামতী পাহাড়সারি গঠিত। এই বেলেপাথরের উপরের স্তরে আবরণ হিসেবে রয়েছে লালচে, অধিক মাত্রায় জারিত, কর্বুরিত কর্দম। মাঝে মাঝে কর্দম বেলেপাথর এবং নুড়িপাথর সমৃদ্ধ বেলেময় কর্দমশিলার উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। কর্বুরিত কর্দমের উপস্থিতি শুধুমাত্র উঁচু স্থানসমূহে বিদ্যমান এবং উপত্যকাসমূহে তা অনুপস্থিত। কোন প্রকার জীবাশ্মের উপস্থিতি এখানে পাওয়া যায়নি। ভূতত্ত্ববিদ এম আবু বকর উন্মুক্ত স্থানীয় পললকে বয়স অনুযায়ী চান্দিনা স্তরসমষ্টি (সাম্প্রতিক/নবীন ১ লক্ষ বছরের পুরানো), মধুপুর কর্দম স্তরসমষ্টি (প্লাইসটোসিন সময়কালের) এবং ডুপি টিলা স্তরসমষ্টিতে (প্লাইওসিন সময়কালের) বিভক্ত করেছেন।  [সিফাতুল কাদের চৌধুরী]