মন্দা


মন্দা  বিশ শতকের ত্রিশের দশকে বাংলাসহ ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে সৃষ্ট ভয়াবহ অর্থনৈতিক সঙ্কট। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯২৯ সালে মহামন্দা শুরু হয় এবং দ্রুত পৃথিবীর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। এটি ছিল ধনতান্ত্রিক দেশসমূহ ও এশিয়া-আফ্রিকায় তাদের উপনিবেশগুলির অর্থনৈতিক ইতিহাসে সবচেয়ে মারাত্মক বিপর্যয়। মন্দার ফলে ভারতসহ কাঁচামাল উৎপাদনকারী দেশগুলিতে এসব পণ্যের দাম হঠাৎ করে কমে যায় এবং বিভিন্ন শ্রেণীর কৃষকদের উপর এর বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। আকস্মিকভাবে কৃষিপণ্যের দাম কমে যাওয়ায় ভারতের রপ্তানি আয় হ্রাস পায়। এর ফলে উপমহাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের ধরনটাই পাল্টে যায়। এতদিন পর্যন্ত কাঁচামাল রপ্তানি করে ভারত বহির্বাণিজ্যের ক্ষেত্রে উদ্বৃত্ত অর্জন করে আসছিল এবং স্বর্ণ ছিল গুরুত্বপূর্ণ আমদানি পণ্য। কিন্তু এখন উদ্বৃত্ত অর্জিত হয় (যদিও অপেক্ষাকৃত কম পরিমাণে) ব্যাপকহারে স্বর্ণ রপ্তানি করে। ভারত যদি স্বাধীন দেশ হতো তাহলে সরকার হয়তো মন্দার মোকাবেলার জন্য কর্মসংস্থান, মুদ্রামান হ্রাস, দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল ও ঋণ সংগ্রহ করার নীতি অনুসরণ করত। কিন্তু ভারতের অর্থনীতির স্বার্থে এরূপ পদক্ষেপ নেওয়ার স্বাধীনতা সরকারের ছিল না। এমতাবস্থায় এদেশে মন্দা অনিবার্যভাবে অনেক বেশি ভয়াবহ ও দীর্ঘস্থায়ী হয়েছিল।

ঊনবিংশ শতকের শেষ দিকে শুরু হওয়া কৃষিপণ্যের ঊর্ধ্বগতি দু’একটা সাময়িক ব্যতিক্রমসহ ১৯২০-এর দশক পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। বাংলার প্রধান অর্থকরী ফসল পাটের দাম সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে ১৯২৫/২৬ মৌসুমে। পরের মৌসুমে হঠাৎ করে এর দাম হ্রাস পায়। এভাবে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক সঙ্কট শুরু হওয়ার আগেই পাটের দামে অধোগতি দেখা দেয়। মহামন্দা শুরু হলে পাটের মূল্যে আর এক দফা ধ্বস নামে। বস্ত্তত, পাটজাত দ্রব্য অপেক্ষা কাঁচা পাটের দাম বেশি হারে হ্রাস পায়। আমন ও আউশ ধান, আখ ও অন্যান্য ফসলের দামও কমে যায়, তবে তা ছিল পাটের দামের হ্রাসের হার অপেক্ষা অনেক কম। ১৯৩৪/৩৫ সালে চালের এবং পরের বছর পাটের দাম আবার বৃদ্ধি পায়। কিন্তু বৃদ্ধির হার ছিল খুব কম এবং ১৯৩৯/৪০-এর আগে কৃষিপণ্যের দাম মন্দা পূর্ববর্তী পর্যায়ে পৌঁছেনি।

পাটের দাম হ্রাস পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পাট চাষ দারুণভাবে সঙ্কুচিত হয়। যে সমস্ত জমিতে পাটের আবাদ বন্ধ হয় তার প্রায় সবটাই আউশ ও আমন ধান চাষের আওতায় আনা হয়। ১৯৩০/৩১ সালে পাটের দাম যা ছিল ১৯৩৫/৩৬ সালেও প্রায় তাই থাকে। তাছাড়া পাটচাষীরা যাতে স্বেচ্ছায় পাটের আবাদ কমিয়ে দেয় সে জন্যও সরকারের তরফ থেকে প্রচারণা চালানো হয়, আর তা করা হয় এ আশায় যে এর ফলে পাটের দাম বাড়বে। কিন্তু এ দুটি নেতিবাচক পরিস্থিতি সত্ত্বেও পাটের আবাদি জমির পরিমাণ ১৯৩৫/৩৬ সালের সাময়িক বিরতিসহ বাড়তে থাকে। এর ফলে আইন করে পাট চাষ কমানোর দাবি ওঠে। ১৯৩৪ সালে প্রাদেশিক সরকার ফিন্ল (Finlaw)-এর নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করে (এ জন্য এ কমিটি ফিন্ল কমিটি নামে পরিচিত)। পাট চাষি ও মিল মালিকদের সমস্যা নিরসন করার লক্ষ্যে সুপারিশ প্রণয়ন ছিল এ কমিটির উদ্দেশ্য। ১৯৩৮ সালে ফকাস (Fawcus) কমিটি নামে (কারণ ফকাস ছিলেন এর প্রধান) অপর একটি কমিটি গঠিত হয়। পাটের দাম কমার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে পাটের আবাদ কমেনি কেন এ প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে কমিটিদ্বয় মত প্রকাশ করে যে, পাটের আবাদ না কমার কারণ হচ্ছে পাটের বিকল্প কোন লাভজনক অর্থকরী ফসলের অনুপস্থিতি। ফিন্ল কমিটি পাটের আবাদের উপর বাধ্যতামূলক নিয়ন্ত্রণের বিরোধিতা করলেও অপর কমিটি এ প্রস্তাবনার প্রতি জোরালো সমর্থন জানায়। ফকাস কমিটির সুপারিশ অনুসারে সরকার ১৯৪০ সালে পাট নিয়ন্ত্রণ আইন (Jute Regulation Act) পাস করে। ইতোমধ্যে আমন ও আউশ ধানের আবাদ মোটামুটি মন্দা পূর্ববর্তী অবস্থানেই রয়ে যায়। এভাবে প্রদেশের মোট আবাদি জমির শতকরা নববই ভাগে আমন, আউশ ও পাট চাষের প্রথা মহামন্দাকালেও অব্যাহত থাকে। আখ, গম, কলাই প্রভৃতি ফসলের আবাদ কিছুটা বাড়লেও তা সামগ্রিক অবস্থার উপর তেমন কোন প্রভাব ফেলেনি।

মন্দার বছরগুলিতে মোট আবাদের পরিমাণ কিছুটা বৃদ্ধি পায়। সুতরাং মোট আবাদি জমির পরিমাণকে যদি উৎপাদনের সূচক হিসেবে ধরা হয়, তা হলে বলতে হবে যে কৃষি পণ্যের দাম কমা সত্ত্বেও মোট উৎপাদনের পরিমাণ বেড়েছিল। এর অবশ্য একটা সহজ ব্যাখ্যা রয়েছে। প্রথমত, মোট আবাদি জমির শতকরা ৮০ ভাগে ধান চাষ করা হতো এবং বেশির ভাগ উৎপাদনই ব্যবহূত হতো কৃষক পরিবারের সদস্যদের খাদ্য হিসেবে এবং বিনিময়ের প্রয়োজনে। বলা নিষ্প্রয়োজন যে, এতদুদ্দেশ্যে উৎপাদনের উপর দাম হঠাৎ পড়ে যাওয়ার কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয়নি। দ্বিতীয়ত, এমনকি প্রান্তিক চাষিরও জমিদারের খাজনা ও মহাজনের সুদ পরিশোধ এবং বস্ত্র, কেরোসিন ইত্যাকার প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি কেনার জন্য কিছু নগদ অর্থের প্রয়োজন হতো। মধ্যম ও ধনী শ্রেণীর কৃষকদের অবশ্য নগদ অর্থের প্রয়োজন হতো বেশি। এ সকল প্রয়োজন মেটানো হতো পাটের মত অর্থকরী ফসল এবং কোন কোন ক্ষেত্রে খাদ্যশস্যের অংশবিশেষ বিক্রি করে। মন্দার সময় এসবের কোন কোনটিতে অর্থের প্রয়োজন একেবারেই কমেনি, এবং কোন কোন ক্ষেত্রে কমলেও কৃষিপণ্যের দামের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কমেনি। এভাবে জীবন ধারণের তাগিদ এবং নগদ টাকার প্রয়োজন উৎপাদন বৃদ্ধির তাগিদ কমায়নি বরং তা বাড়িয়ে দিয়েছিল। প্রসঙ্গত, যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিতে, যেখানে উৎপাদন হয় প্রধানত বিক্রির জন্যে, মহামন্দাকালে উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছিল।

সুতরাং মূল সমস্যা ছিল কৃষকের নগদ আয়ের পরিমাণ দারুণভাবে কমে যাওয়া। জনৈক সমসাময়িক পর্যবেক্ষক যথার্থই মন্তব্য করেছেন, ‘‘এমন নয় যে কৃষকের ফলন কমে গেছে, কিন্তু আগে এক মণ পাট বিক্রি করে সে যে পরিমাণ অর্থ পেত তা এখন তিন মণ বিক্রি করেও পায় না, এক মণ ধান বিক্রি করে যা পেত তা পেতে তাকে তিন মণ ধান বিক্রি করতে হচ্ছে।’’ এর ফলে কৃষককে বাস্তব কারণেই খাজনা প্রদান, পারিবারিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠান, কৃষি উপকরণ সংগ্রহ, খাদ্য ক্রয় এবং সর্বোপরি ঋণ পরিশোধের জন্য নগদ অর্থের ব্যয় কমিয়ে দিতে হয়েছিল। কৃষি মজুরি মাত্রাতিরিক্ত হারে কমে যাওয়ায় এবং/অথবা মজুরদের একাংশ ধনী কৃষকদের খামারের কাজ হারানোর ফলে কৃষক-মজুরদের মধ্যে খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ হ্রাস পায়।

এক্ষেত্রে ঋণ সমস্যাটাও বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে। প্রথমত মোট ঋণের পরিমাণ বেড়ে যায়। বঙ্গীয় প্রাদেশিক ব্যাঙ্কিং তত্ত্বতালাশ কমিটির (Bengal Provincial Banking Enquiry Committee) মতে ১৯২৯ সালে মোট ঋণের (সুদাসলের) পরিমাণ ছিল একশত কোটি টাকা, অপরপক্ষে বোর্ড অব ইকনমিক ইনক্যোয়ারির হিসাবে দেখা যায় যে, ১৯৩৪ সালে শুধু ঋণের আসল অংশের পরিমাণই ছিল ৯৬ কোটি টাকা। দ্বিতীয়ত এবং অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কৃষি আয় কমে গেলে স্বভাবতই ঋণের বোঝা বেড়ে যায়। বোর্ড অব ইকনমিক ইনক্যোয়ারির হিসেব মতে ঋণের বোঝা বৃদ্ধি পাওয়ায় গ্রামীণ পরিবারগুলির তিন-চতুর্থাংশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর এ সমস্যা সর্বাপেক্ষা প্রকট ছিল ১৭ লক্ষ পরিবারের (মোটের এক-তৃতীয়াংশ) ক্ষেত্রে। ঋণ পরিশোধের অক্ষমতা ঋণগ্রস্ত পরিবারগুলির ক্ষেত্রে অন্যান্য অসুবিধারও সৃষ্টি করে। এমতাবস্থায় অতীতে অর্থনৈতিক সঙ্কটের সময় যে পেশাদার মহাজনরা সঙ্কট থেকে রক্ষা করার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতো, তারা আর এ দায়িত্ব পালনে সক্ষম ছিল না। কেননা মহাজনদের লগ্নীকৃত ঋণের সুদ আদায় হচ্ছিল না, আসল পরিশোধের পরিমাণ ছিল আরও কম। তাছাড়া বিভিন্ন কারণে পেশাদার মহাজনরা তাদের তহবিলের উদ্বৃত্ত অর্থ লগ্নী অব্যাহত রাখতে অনীহা প্রকাশ করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। প্রথমত, কিষাণ আন্দোলন ও কিষাণ সমিতিগুলির নেতৃত্বে জমিদার ও মহাজন বিরোধী আন্দোলন ও প্রচারণা শুরু হলে খাজনা প্রদান ও ঋণ পরিশোধ বাধাগ্রস্ত হয়। দ্বিতীয়ত, ১৯৩৫ সালের কৃষি দেনাদার আইন (Agricultural Debtors Act) অনুসারে সরকার গঠিত ঋণ সালিশী বোর্ডসমূহ ১৯৩৭ সালের এপ্রিল মাসে কাজ শুরু করে। বোর্ডগুলির উদ্দেশ্য ছিল ঋণের পরিমাণ এমন পর্যায়ে নামিয়ে আনা যাতে ঋণগ্রহীতারা তা পরিশোধ করতে পারে। কিন্তু নানা কারণে পেশাদার মহাজন শ্রেণি এ সকল বোর্ডের কাজকর্মে ক্ষোভ প্রকাশ করে। সুতরাং সার্বিকভাবে কিছুটা অপারগতা এবং কিছুটা অনীহার কারণে মহাজনরা ঋণদান বহুল পরিমাণে কমিয়ে দেয়। একথা সত্য যে, কৃষক মহাজনরা কিছু ঋণ প্রদান করেছিল এবং এর ফলে ঋণদানক্ষেত্রে মহামন্দার কালে তাদের অবস্থান অপেক্ষাকৃত দৃঢ় হয়। কিন্তু তাদের ঋণ কৃষকদের প্রয়োজনের সামান্যই পূরণ করতে সক্ষম হয়েছিল। কারণ, কৃষিপণ্যের দাম ভয়াবহভাবে হ্রাস পাওয়ার অর্থই ছিল তাদের ঋণ দেওয়ার মতো মূলধনের অপর্যাপ্ততা। তাছাড়া আগের দেওয়া ঋণও তারা আদায় করতে পারেনি।

মন্দাকালে কত জমি কি দামে হস্তান্তরিত হয়েছিল সে সম্পর্কে পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না, কতগুলি বিক্রি এবং বন্ধকের দলিল রেজিস্ট্রি হয়েছিল তার হিসাব পাওয়া যায়। শেষোক্ত তথ্য থেকে সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, জমি বিক্রি করা ও বন্ধক রাখার সংখ্যা হ্রাস পেয়েছিল। সম্ভবত কৃষিপণ্যের মূল্যহ্রাস ছিল এর কারণ। বিক্রয় সম্পর্কিত তথ্যের ক্ষেত্রে ১৯২৮ সালের বঙ্গীয় প্রজাসত্ত্ব আইন (Bengal Tenancy Act, 1928)-এর প্রভাব উল্লেখ করা হয়েছে। কেননা এ আইনে জমির মূল্যের ২৫% জমিদারকে হস্তান্তর ফি বাবদ প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল। মহামন্দাকালে হস্তান্তরিত জমির পরিমাণ বেড়েছিল বা হ্রাস পেয়েছিল কিনা সে প্রশ্নে সঠিক কিছু বলা না গেলেও একথা নিশ্চয় করে বলা যায় যে, এ সময় খুব বেশি জমি বেচা-কেনা হয়নি। বঙ্গীয় ভূমি রাজস্ব কমিশন, ১৯৩৮ (Bengal Land Revenue Commission, 1938) সংগৃহীত তথ্য এ ধারণা দেয়। এ কমিশনের জরিপ অনুসারে দেখা যায়, প্রদেশের মোট জমির মাত্র শতকরা সাত ভাগ বারো বছরের মধ্যে (১৯২৮-১৯৪০) হস্তান্তরিত হয়েছিল। এ কথা সত্য যে, একটা ছোট নমুনা এ জরিপের ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। তাছাড়া ক্রেতা-বিক্রেতাগণ তথ্য গোপনও করে থাকতে পারেন। কিন্তু এসব তথ্যের ওপর নির্ভর করে জমি হস্তান্তরের পরিমাণ সম্পর্কে ধারণা করার প্রয়াস খুব অযৌক্তিক হবে বলে মনে হয় না। প্রসঙ্গত ঐ একই কমিশন থেকে প্রাপ্ত তথ্য এমন ইঙ্গিত দেয় যে, মন্দার বছরগুলিতে ভাগচাষীদের দ্বারা আবাদকৃত জমির পরিমাণ বৃদ্ধি পায়নি।

মোট শিল্পজাত পণ্যের উৎপাদনের উপর মন্দার কি প্রভাব পড়েছিল সে সম্পর্কে সঠিক কিছু বলা যায় না। এ সম্পর্কিত কোন সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণ নেই। তবে বস্ত্র উৎপাদন (তাঁত ও মিল উভয় জাত) বৃদ্ধি পায়। নতুন চিনির কল প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় চিনির উৎপাদনও বেড়েছিল। কিন্তু প্রদেশের শিল্পখাতে সর্ববৃহৎ সেক্টর পাটকলগুলিতে উৎপাদন হ্রাস পেয়েছিল। এর কারণ ছিল পাটকলগুলির পূর্বোল্লিখিত উৎপাদন সঙ্কোচন প্রক্রিয়া অনুসরণ।

সারসংক্ষেপ হিসেবে বলা যায়, বিশ্ব অর্থনৈতিক সঙ্কট শুরু হলে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মতো বাংলায়ও কৃষিপণ্যগুলির দাম হঠাৎ করে কমে যায়। এতদ্সত্ত্বেও খুব সামান্য পরিমাণে হলেও কৃষিপণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। দ্বিতীয়ত, মন্দার প্রথম পর্যায়ে পাট চাষের পরিমাণ বহুলাংশে হ্রাস পেলেও অচিরেই আবাদের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় মন্দা পূর্ববর্তী পর্যায়ে উন্নীত হয়। তৃতীয়ত, বিক্রি ও বন্ধকের মাধ্যমে জমি হস্তান্তরের পরিমাণ ছিল খুব সামান্য। চতুর্থত, মুদ্রার হিসেবে আয় কমে যাওয়ায় কৃষকগণ অত্যন্ত অসুবিধার মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। পঞ্চমত, মন্দার একটা রাজনৈতিক তাৎপর্যও ছিল। প্রদেশের হিন্দু ও মুসলমানগণ তাদের স্বতন্ত্র সাম্প্রদায়িক সত্ত্বা সম্পর্কে মন্দার বহু আগে থেকেই সচেতন ছিল। কিন্তু এখন এই মন্দা তাদের সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে আরও তীব্র করে দেয়। একথা সর্বজনবিদিত যে, রায়তদের বিরাট অংশ ছিল মুসলমান আর ভূস্বামী ও পেশাদার মহাজনগণের অধিকাংশই ছিল হিন্দু। মুসলমান রায়তগণ যেহেতু তাদের জমির খাজনা ও ঋণের সুদ দিতে অপারগ হয়ে পড়েছিল, সেহেতু মুসলমান নেতাদের পক্ষে কৃষকদেরকে হিন্দু শোষক শ্রেণীর বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ করা সহজতর হয়ে উঠেছিল। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের আওতায় ভোটাধিকার সম্প্রসারিত হয় এবং সম্প্রসারিত ভোটাধিকারের ভিত্তিতে প্রাদেশিক আইন পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। [এম মোফাখখারুল ইসলাম]