মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ


মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ  সচিবালয়ে শীর্ষ নীতি-ব্যবস্থাপনা বিভাগ যা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে কাজ করে। এ বিভাগ মন্ত্রিসভায় গৃহীত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন এবং বিশেষভাবে যেসব বিষয়ে একাধিক মন্ত্রণালয়/বিভাগের সহযোগিতা ও যৌথ কার্যব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন, সেসব বিষয়ে আন্ত:মন্ত্রণালয় সমন্বয় কার্যকর করে। প্রকৃতপক্ষে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সরকারের সচিবালয়ে এ ধরনের কোনো বিভাগ ছিল না। তবে মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত প্রবাসী সরকার জাতীয় সরকার পরিচালনার নীতিমালার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে এ ধরনের একটি বিভাগ সৃষ্টি করেছিল। তখন এ বিভাগটি ছিল প্রবাসী সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি অঙ্গ। স্বাধীনতার পরেও বাংলাদেশে এ বিভাগটি প্রায় অটুট রাখা হয়। প্রথমদিকে এ বিভাগ প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। তবে ১৯৭৫ সালের প্রথমদিকে রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতির সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে এ বিভাগ রাষ্ট্রপতির অধীনে ন্যস্ত হয়। অবশ্য, ১৯৯১ সালে সংসদীয় সরকারপদ্ধতি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে এ গুরুত্বপূর্ণ বিভাগটি পুনরায় প্রধানমন্ত্রীর অধীনে ন্যস্ত হয়।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রধান কাজগুলি হলো: (১) মন্ত্রিসভা ও বিভিন্ন কমিটির বৈঠক আহবান এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অনুযায়ী এসব বৈঠকের আলোচ্যসূচি প্রণয়ন করা; (২) বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগ কর্তৃক মন্ত্রিসভা/কমিটির কাছে প্রয়োজনীয় নীতিপত্র ও আনুষঙ্গিক তথ্য যথাযথভাবে উপস্থাপনের বিষয় নিশ্চিত করা; (৩) মন্ত্রিসভা/কমিটির বৈঠকের কার্যবিবরণী ও সিদ্ধান্তসমূহ লিপিবদ্ধ করা এবং সেগুলি সংশ্লিষ্ট সকলের মধ্যে বিলি করা; (৪) সিদ্ধান্ত ও নীতিনির্দেশনার বাস্তবায়ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করা এবং এ সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভা ও মন্ত্রিসভার কমিটিগুলির নিকট প্রতিবেদন উপস্থাপন করা; (৫) বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগ এবং তৎসংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর/কার্যালয়ের কার্যাবলির ওপর নির্দিষ্ট সময় অন্তর প্রতিবেদন গ্রহণ এবং সেগুলি যাচাই ও পরীক্ষা করে প্রাসঙ্গিক তথ্যাদি প্রধানমন্ত্রী/মন্ত্রিসভা সমীপে উপস্থাপন করা। তদুপরি, প্রধানমন্ত্রী/মন্ত্রিপরিষদ কর্তৃক মাঝে মাঝে গঠিত কমিটিসহ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগই রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী ও অপরাপর মন্ত্রীর জন্য সাচিবিক কাজ সম্পন্ন করে। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রীদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধাদি সম্পর্কিত কাজও এ বিভাগ সম্পাদন করে থাকে।  কার্যবিধি  প্রণয়ন এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগের মধ্যে কার্যবন্টনের দায়িত্বও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ পালন করে।

কার্যবিধি স্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ করে যে, কোনো মন্ত্রণালয়/বিভাগ মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সঙ্গে পূর্বে আলোচনা/পরামর্শ না করে কোনো আদেশ জারি বা আদেশ দানের ক্ষমতা প্রদান করবে না, যেগুলির অন্তর্ভুক্ত থাকে (১) কার্যবিধির ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, (২) মন্ত্রণালয়/বিভাগ পুনর্গঠন, (৩) বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগের মধ্যে বর্তমান কর্মবণ্টনে পরিবর্তন, এবং (৪) রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রীর বেতন ও সুযোগ-সুবিধা সংক্রান্ত বিষয়।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আনুষ্ঠানিক প্রধান। তিনি শীর্ষপদের সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে মনোনীত হন। পদমানক্রমে তাঁর পদমর্যাদা অন্যান্য সচিবের পদের চার ধাপ ঊর্ধ্বে। তিনি আন্তঃমন্ত্রণালয় আলোচনা বিষয়ক কয়েকটি সচিব পর্যায়ের কমিটিরও প্রধান। তিনি প্রশাসন উন্নয়ন সংক্রান্ত সচিব কমিটি ও সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডেরও চেয়ারম্যান। বস্ত্তত মন্ত্রিপরিষদ সচিব প্রধানমন্ত্রী/মন্ত্রিসভার প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। তার অবস্থান অনেকটা সিভিল সার্ভিস ও স্থায়ী আমলাতন্ত্রের প্রধানের অনুরূপ। কেননা, সকল সচিব তাঁর পরামর্শ ও নির্দেশনার মুখাপেক্ষী।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও তার ঊর্ধ্বতন সহযোগিবৃন্দ মন্ত্রিসভার প্রায় সকল বৈঠকে উপস্থিত থাকেন। তিনি নৈর্ব্যক্তিকভাবে এসব বৈঠকের সংক্ষিপ্ত বিবরণ লিপিবদ্ধ করে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য তার কাছে পেশ করেন। তিনি প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন লাভের পর মন্ত্রিসভার বৈঠকের কার্যবিবরণীর অনুলিপি মন্ত্রীদের মধ্যে বিলি করেন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের উদ্ধৃতাংশ বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিবের নিকট পাঠান। এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রতি অবিরত নজর রাখাও তার দায়িত্ব।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থানা/উপজেলা, জেলা ও বিভাগের সার্বিক প্রশাসন তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পালন করে। এই বিভাগ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) ও বিভাগীয় কমিশনারদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে।

সকল মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যাবলি সারসংক্ষেপ আকারে মাসিক প্রতিবেদন তৈরি করে  মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপনের দায়িত্ব মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ পালন করে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়/বিভাগের কার্যকলাপের ওপর বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরি ও মন্ত্রিসভা সমীপে পেশ করে। এমনিভাবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সার্বিক সরকারি কার্যাবলি সমন্বিত করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।   [মোহাম্মদ আইউব মিয়া]