মঠ


মঠ  শব্দটি কৃচ্ছতাসাধনকারী অথবা শিক্ষার্থীদের আবাসস্থল হিসেবে সংজ্ঞায়িত হয়েছে। ধর্মীয়ভাবে শৃংখলাবদ্ধ সংঘ জীবনের জন্য বুদ্ধ নির্দেশিত চার পন্থার অন্যতম বৌদ্ধবিহার হতে এর উৎপত্তি। বাংলায় মঠের সর্বপ্রথম উল্লেখ দেখা যায় প্রধান বা শ্রেষ্ঠতম মঠ উৎসর্গের বিবরণ সম্বলিত একটি খরোষ্ঠী-ব্রাহ্মী শিলালিপিতে (খ্রিস্টীয় দুই শতক)। দুর্ভাগ্যবশত মঠ সম্পর্কে শিলালিপি থেকে কোন বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় না। খ্রিস্টীয় ছয় শতক হতে মঠের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। মঠ কেবল সাধু এবং তাঁদের শিষ্যদের আবাস ভবন এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পেশাদারি দলের জাগতিক প্রয়োজন মিটানোর জন্যই গড়ে উঠেনি, এতে ব্রাহ্মবাদী এবং ভক্তিআদর্শভিত্তিক বিভিন্ন সম্প্রদায়ের দেবদেবীও স্থান পেয়েছিল। অতএব, মন্দিরসহ মঠগুলি মূলত ধর্মীয় উদ্দেশ্যেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং সেখানে কিছু মহান শিক্ষক (আচার্য) কোন দার্শনিক উপদেশ অথবা কোন সাম্প্রদায়িক মতবাদ শিষ্যদের প্রতি নির্দেশ করতেন। সুতরাং, মঠগুলি ছিল মূলত ধর্মীয় কেন্দ্র।

কোদলা মঠ, বাগেরহাট

সাত শতকে শ্রীহট্টে একটি মন্দির নির্মিত হয়, যেখানে কুবের, কিন্নর প্রভৃতিসহ ভগবান অনন্ত নারায়ণকে প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং ভগবানের প্রতি বলি, চারু এবং সত্র নিবেদন করা হয়। বৈষ্ণব মন্দিরে অনুষঙ্গ হিসেবে বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণের বসতি স্থাপন করা হয়। ব্রাহ্মণদের সেবা করার জন্য একজন পাচক এবং একজন মুখপাত্র নিয়োজিত ছিল। এরূপে শ্রীহট্টে সুভুঙ্গ জেলার (অশনাক্তীকৃত) বনাঞ্চলে মঠের মতোই আবাসিক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অনুরূপভাবে একই শতকে জলা ও বনভূমিতে (jalatavibhukhande) একটি মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ভগবান অনন্ত নারায়ণকে সেখানে প্রতিষ্ঠা করা হয়। বৈষ্ণব মন্দিরটি আবাসিক ছিল কারণ, ত্রিবেদী ব্রাহ্মণগণকে সেখানে বাস করতে দেওয়া হয়।

চন্দ্র রাজা শ্রীচন্দ্রের রাজত্বকালে (৯২৫-৭৫ খ্রিস্টাব্দ) শ্রীহট্টে আরেকটি সুবৃহৎ ধর্মীয় কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে জানা যায়। পশ্চিমভাগ তাম্রশাসন অনুসারে এ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে আটটি মঠ অন্তর্ভুক্ত ছিল যার মধ্যে অগ্নি-বৈশ্বানর, যোগেশ্বর (শিবের এক রূপ) জমনি অথবা জৈমিনি এবং মহাকাল (শিবের এক রূপ) এই চার দেবতার পূজা করা হতো। উল্লেখ্য, শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, মোক্ষ বা মুক্তি অর্জনের জন্য বৈশ্বানররূপে দেবতা অগ্নি এককভাবে পূজিত হতেন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি একটি বিরল উদাহরণ। শিলালিপি উল্লিখিত জৈমিনি এবং খ্রিস্টীয় তিন শতকের সুখ্যাত মীমাংসা দর্শনের মহান দার্শনিক জৈমিনি নিঃসন্দেহে এক ও অভিন্ন। আলোচ্য শিলালিপি হতে স্পষ্টরূপে জানা যায় যে, একজন দার্শনিক তার আবির্ভাবের সাত শতক পরও দেবতারূপে গণ্য ও পূজিত হতেন। মহাকাল শিবের এক রূপ হলেও এই দেবতা মধ্যযুগের প্রথমদিকে শৈব ও বৌদ্ধ উভয় সম্প্রদায়ের কাছেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। এটা শৈব ও বৌদ্ধদের মধ্যে একে অপরের থেকে আদর্শ গ্রহণের একটি উদাহরণ বলে মনে হয়। একটি ভিন্ন মঠে ব্রহ্মাও পূজিত হতেন। সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো এই যে, পশ্চিমভাগ তাম্রশাসনে উল্লিখিত বাংলাদেশীয় এবং দেশান্তরীয় এ দুটি ভিন্ন ধরনের মঠে চারদেবতা একই সঙ্গে পূজিত হতেন।

ব্রাহ্মণ এবং মালাকার, নাপিত, তৈলিক, রজক, কারণিক, গণক, চিকিৎসক, চেটিকা বা দাসী, বারিক প্রভৃতি পেশাগত শ্রেণিসমূহের জন্য ভূমি বন্দোবস্ত্ত প্রদান করে সমগ্র ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানটিকে আবাসিক রূপ প্রদান করা হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে উল্লেখ্য যে, ব্রহ্মার একটি মাত্র মঠের জন্য পনেরো জন বাদক ভূমিসহ নিয়োজিত ছিল; কিন্তু অপর আটটি মঠের জন্য কোন বাদক ছিল না।

উপরোল্লিখিত অপরাপর পেশাগত শ্রেণিগুলিসহ ব্রাহ্মণদের চারশত পাটক (পাটক হচ্ছে ভূমির পরিমাপ, দশ শতকে ১ পাটক ছিল ১০ দ্রোণের সমান) ভূমি বিতরণ করা হয়েছিল। অতঃপর অবশিষ্ট ভূমি ৬০০০ ব্রাহ্মণের মধ্যে বিতরণ করা হয় (পরিমাণ সুনির্দিষ্ট নয়) এবং আলোচনাধীন ধর্মীয় কমপ্লেক্সে তাদেরকে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। ৬০০০ সংখ্যাটি সম্ভবত অতিরঞ্জিত, কারণ শিলালিপিতে ৬০০০ ব্রাহ্মণের নাম উল্লেখ করা হয়নি, মাত্র ৩৮ জন ব্রাহ্মণের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাল রাজা নয়পালের (১০৪৩-৫৮খ্রি) সমসাময়িক মত্তময়ূর শৈবাচার্য মূর্তিশিব-এর বাণগড় (পশ্চিম দিনাজপুর) প্রশস্তি হতেও অনুরূপ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিষয় জানা যায়। প্রতিষ্ঠানটি গোলাগি মঠ নামে পরিচিত, যার মধ্যে একটি ভবানী মন্দির অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে জানা যায়। শৈব মূর্তি সংরক্ষণের জন্য মঠটি ছিল একটি প্রাসাদমেরু (অভিজাত প্রাসাদোপম ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান)।

বানগড় প্রশস্তি হতে জানা যায় যে, এই মঠে বেশ কয়েকজন শৈব আচার্য যেমন বিদ্যাশিব, ধর্মশিব, ইন্দ্রশিব, সর্বশিব, মূর্তিশিব, রূপশিব প্রভৃতিকে আবাসন প্রদান করা হয়েছিল। জানা যায় যে তাঁরা মত্তময়ূর শৈব উপ-সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন এবং তাঁরা শক্তির সঙ্গে শিবের উপাসনা করতেন। পৃথিবী রক্ষার জন্য দেবী চর্চিকার আবাহন হতে (ওম্ নমঃ চর্চিকায়ৈ) এ ধারণার সমর্থন পাওয়া যায়। এ থেকে মনে করা যেতে পারে যে, মঠের আচার্যগণ ব্যাপকভাবে জনকল্যাণে নিয়োজিত ছিলেন। প্রশস্তিতে লিখিত আছে যে, গোলাগি মঠ বৃহৎ জনগোষ্ঠীর কল্যাণার্থে বড় বড় পুকুর খননের মতো দাতব্যকর্মের সূচনা করেছিল। দুজন বিখ্যাত আচার্য মূর্তিশিব এবং রূপশিব-এর ধর্মীয় কৃতিত্ব বানগড় মঠের সুখ্যাতি বৃদ্ধি করেছে।

পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার বোলপুরের নিকটে  সিয়ান নামক একটি গ্রাম হতে প্রাপ্ত শিলালিপির (খ্রিস্টীয় এগারো শতক ) বক্তব্য থেকে অনুমান করা হয় যে, মন্দিরের নিকটে একটি হাসপাতালের অস্তিত্ব ছিল। মন্দিরের কাছে চিকিৎসকদের আবাসস্থল (বৈদ্য-বাস) ছিল। শুধু ধর্মীয় ব্যক্তিবর্গই নয়, জনসাধারণও এ হাসপাতালে চিকিৎসাসুবিধা পেত। মন্দিরটি একটি শৈব মন্দির ছিল এবং কৃচ্ছতা সাধনকারিগণ (তাপস) আপাত দৃষ্টিতে ছিলেন শৈব এবং তাদের আবাসনের জন্য একটি দ্বিতল মঠ নির্মিত হয়েছিল। ধারণা করা যেতে পারে যে হাসপাতালটি শৈব মন্দিরের কাছেই অবস্থিত ছিল। মন্দিরগুলির একটিতে একাদশ রুদ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ঐতিহ্যগতভাবে রুদ্র রোগপ্রশমনকারী হিসেবে পরিচিত। প্রশমনকারী গুণ ঐতিহ্যগতভাবে চলে এসেছে এবং এভাবেই ভগবান শিব বৈদ্যনাথে পরিণত হয়েছেন।

মঠগুলি প্রাথমিকভাবে ধর্মীয় কেন্দ্র হলেও এগুলি শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবেও ভূমিকা পালন করেছে বলে জানা যায়। এর উদাহরণ জ্ঞাত হওয়া খুব কষ্টকর নয়। সিলেটের মঠগুলি (পশ্চিমভাগ তাম্রলিপিতে  ব্রাহ্মপুর নামে অভিহিত) জ্ঞানদান করত এবং খ্রিস্টীয় পাঁচ ও ছয় শতকের সুখ্যাত বৌদ্ধ পন্ডিত চন্দ্রগোমীনের ব্যাকরণের উপর পাঠদান করা হতো। পশ্চিমভাগ তাম্রলিপির অন্য আটটি মঠ চতুর্বেদ অনুশীলনের প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠেছিল। বানগড় মঠেও জ্ঞানচর্চার অনুশীলন হতো বলে জানা যায়। জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র হিসেবে বাংলার বাইরেও বানগড় মঠ সুখ্যাতি অর্জন করেছিল বলে কথিত আছে।

মঠের সঙ্গে সম্পর্কিত আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক বিষয়গুলির দিকে দৃষ্টিপাত করা এক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। মঠগুলির ব্যয় নির্বাহ হতো প্রধানত কৃষি উৎপাদন থেকে। সাত শতকের সিলেটের বৈষ্ণব মঠগুলিকে কেন্দ্র করে ব্রাহ্মণ ও অন্যান্য পেশাদার শেª্রণর লোকদের বসতি প্রতিষ্ঠা করে জনপূর্ণ করা হয় এবং অকর্ষিত ভূমি (অকর্ষ) চাষের অধীনে আনা হয়। সামন্ত মরুন্দনাথের দানপত্র তথ্য প্রদান করে যে, জনবসতিহীন জলাভূমি ও বনভূমি চাষযোগ্য করা হয় এবং শ্রীহট্টে বৈষ্ণব মন্দির প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে ব্রাহ্মণদের বসতি স্থাপন করে জন অধ্যুষিত করা হয়। এভাবে কৃষি সম্প্রসারণ সংগঠিত হয় এবং যে প্রক্রিয়ায় এটা সংগঠিত হয় এর চরম  বিকাশ ঘটে শ্রীহট্টে বিশাল ব্রাহ্মণ্য বসতি স্থাপনের মাধ্যমে (ব্রহ্মপুর নামে)। প্রতীয়মান হয় যে, বসতিবিহীন এবং অনাবাদী এলাকাসমূহে কৃষি সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ স্থাপন করা হয়েছিল। এক্ষেত্রে এটা মনে রাখতে হবে যে, অনাবাদী এলাকায় বসতি স্থাপনের জন্য বাইরে থেকে বহু লোক আনার প্রয়োজন পড়ে এবং অত্যন্ত স্বাভাবিক কারণেই আবাদী এলাকায় বসতকারী জনগণ অনাবাদী এলাকায় নতুন করে বসতি স্থাপন করার ঝুঁকি গ্রহণ করতে চায়না। অপরদিকে, নতুন বসতি এলাকায় জনগণকে আকর্ষণ করার জন্য স্থানীয় লোকদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধার চেয়েও অধিকতর সুযোগ-সুবিধা প্রদানের প্রতিশ্রুতির প্রয়োজন। নতুন এলাকায় বিলিবণ্টনের সময় সাধারণত এ সকল সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা হতো ভূমি বিতরণ করে অথবা কৃষি সমাজে কৃষি উৎপাদন বণ্টনের মাধ্যমে। ব্রহ্মপুর বসতি এলাকায় বহিরাগতদের সংখ্যা এতই অধিক ছিল যে, তাদেরকে দেশান্তরীয়া বলে অভিহিত করা হয়। সম্ভবত বাংলাদেশীয়দের চেয়েও তাদেরকে অধিক সুযোগ প্রদান করা হয়েছিল। এজন্য আমরা দেখতে পাই যে, একজন মহত্তর ব্রাহ্মণ যেখানে দুই পাটক ভূমি পেয়েছেন এবং একজন কায়স্থ পেয়েছেন ২.৫০ পাটক সেখানে একজন বৈদ্য পেয়েছেন তিন পাটক ভূমি। ভু-সম্পত্তির এ ধরনের বিতরণ অসাম্যজনিত কিছু সমস্যা সৃষ্টি করে থাকতে পারে। এ বিষয়টি সম্ভবত দেশান্তরীয় এবং বঙ্গালদেশীয়দের মধ্যে কিছুটা দূরত্বও সৃষ্টি করেছিল। মধ্যযুগের প্রথমদিকে গ্রামীণ বাংলায় এটা একটা বিরল ঘটনা যে, জনগণ একই দেব-দেবীর উপাসনা এবং একত্রে বসবাস করলেও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসমূহে তারা দেশান্তরীয় মঠ এবং বঙ্গালদেশীয় মঠ এই উপ-দলীয় পার্থক্য বজায় রাখত।

মঠগুলি রাজকীয় পৃষ্ঠপোষকতা ভোগ করত বলে জানা যায়, কারণ রাজ দরবারও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলির পৃষ্ঠপোষকতার বিনিময়ে তাদের পার্থিব ক্ষমতা স্থিতিশীল করে তুলেছিল। এরূপে রাজদরবারে তাদের পার্থিব ক্ষমতাকে সমান্তরাল উল্লম্বভাবে বৈধকরণের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ উদাহরণ হচ্ছে চন্দ্ররাজা শ্রীচন্দ্র কর্তৃক ব্রহ্মপুর মঠ প্রতিষ্ঠা। প্রতিষ্ঠানটিকে তিনি নিজ নামে নামকরণ করেন এবং এটি শ্রীহট্ট অঞ্চলে চন্দ্রপুর-ব্রহ্মপুর বসতি এলাকা নামে খ্যাতিলাভ করে (চন্দ্রপুরাভিধান-ব্রহ্মপুরম)।  [কৃষ্ণেন্দু রায়]

গ্রন্থপঞ্জি R Chatterjee, Religion in Bengal during the Pala and Sena Times, Calcutta, 1985; NN Bhattacharyya, A Glossary of Indian Religious Terms and Concepts, New Delhi, 1990; H Kulke, Kings and Cults State Formation and Legitimization in India and Southeast Asia, New Delhi, 1993.