মউয়াল


মউয়াল  মধু সংগ্রহকারী, যারা বংশপরম্পরায় বন থেকে মধু সংগ্রহ করে এবং তা বিক্রয়ের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করে। এই শ্রেণীর মানুষ বংশানুক্রমিকভাবে বনজঙ্গলের কাছাকাছি বসবাস করে এবং মৌচাক থেকে মধু সংগ্রহকেই এরা প্রধান পেশা হিসেবে গ্রহণ করে। মউয়াল নামটি এসেছে মৌ বা মধু শব্দ থেকে। প্রাচীনকাল থেকেই প্রায় সমগ্র বঙ্গদেশ ছিল মধুময় বৃক্ষ ও অরণ্যবেষ্টিত। তাই মউয়ালরা সারা দেশেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে অবস্থান করত। কিন্তু বর্তমানে বনাঞ্চল হ্রাস পাওয়ায় এদের আবাস সুন্দরবন ও পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো কিছু জায়গায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। মউয়ালরা সাধারণত বসন্তের শেষে ব্যস্ত সময় কাটায়। কারণ, এ সময় আবহাওয়া উষ্ণ হয়ে ওঠে এবং মৌমাছিরা মধু আহরণ করে। ফুল ও বৃক্ষগুলি তখন মধুর নির্যাসে পূর্ণ হয়। সুন্দরবন এলাকায় মধু সংগ্রহ প্রায়শ উৎসবের আবহ তৈরি করে। বিভিন্ন জায়গা থেকে নদীপথে বিশেষত, নৌকায় করে দলে দলে মউয়ালরা একটা নির্দিষ্ট স্থানে এসে সমবেত হয়। দলগুলি সেখানে সাময়িক আবাস গড়ে তোলে এবং প্রতিটি দলে নয় জন করে সদস্য থাকে। এক একটি দলের সার্বিক তত্ত্বাবধানের জন্য নিজেদের মধ্য থেকে একজনকে দলনেতা বা সর্দার নির্বাচন করা হয়।

মধু আহরনরত মউয়াল

মধু সংগ্রহে যাত্রার শুরুতে মীলাদ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তারা সর্বশক্তিমান স্রষ্টার আশীর্বাদ কামনা করে। মীলাদ মুসলমানদের ধর্মীয় অনুষ্ঠান হলেও হিন্দু-মুসলমান সকলেই এতে অংশগ্রহণ করে এবং মধু সংগ্রহ শেষে তাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রার্থনা করে। কারণ প্রতি মৌসুমেই সুন্দরবনে মধু সংগ্রহ করতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে বেশ কিছুসংখ্যক মউয়ালের মৃত্যু ঘটে। মীলাদ সম্পন্ন হওয়ার পর সর্দারগণ বন বিভাগের অনুমতির জন্য সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ায়। অনুমতি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দলগুলির যাত্রা শুরু হয় এবং প্রায়ই তারা গন্তব্যস্থলে পৌঁছানোর জন্য নৌকা প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়। দ্রুততম দল ভাল অবস্থানটি দখল করে এবং অন্যরা তা মেনে নিয়ে ভিন্ন জায়গায় যায়। বনে পৌঁছেই মউয়ালরা মৌচাকের সন্ধান করতে থাকে।বন্য হেঁতাল গাছ (টাইগার ফার্ন) তাদের চলার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে এবং এ কারণে অনেক সময় তারা তাড়াহুড়োর মধ্য দিয়ে মধু সংগ্রহ করে।

একজন মউয়াল একটি মৌচাকের কাছাকাছি পৌঁছে উচ্চস্বরে ডাক দিয়ে দলের লোকদের জড়ো করে। মৌমাছিদের তাড়ানোর জন্য তারা শুকনো পাতা পুড়িয়ে ধোঁয়া তৈরি করে। ধোঁয়ার কারণে মৌমাছিরা মৌচাক ছেড়ে চলে গেলে সেই সুযোগে মউয়ালরা গাছে উঠে মধু সংগ্রহ করে। তবে মৌমাছিরা মউয়ালদের হুল ফুটিয়ে থাকে। অধিকাংশ মউয়ালই এতে অভ্যস্ত। কেউ কেউ হুলের ব্যথা কমানোর জন্য ভেষজ তেল ব্যবহার করে।

বাণিজ্যিকভাবে মৌমাছি চাষের উদ্ভাবন এবং ব্যাপকভাবে বন ধ্বংসের ফলে মউয়াল সম্প্রদায় প্রায় বিলুপ্তর পথে। এই সম্প্রদায়ের লোকদের অনেকেই বর্তমানে চাষাবাদ করছে, আবার কেউ কেউ অবৈধভাবে কাঠ সংগ্রহ এবং বন্যপ্রাণী শিকার করে এদের চামড়া, মাংস, হাড় ও দাঁত বিক্রয়ের ব্যবসায় লিপ্ত হয়েছে।  [গোফরান ফারুকী]