ভ্রমর


ভ্রমর (Bee)  Hymenoptera  বর্গের Apoidea অধিগোত্রের মৌমাছির জ্ঞাতিদের জন্য ব্যবহূত সাধারণ নাম। মেরু এলাকা ব্যতীত পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে আজ পর্যন্ত ১৯টি গোত্রের অধীনে প্রায় ২০,০০০ প্রজাতির ভ্রমর শনাক্ত করা হয়েছে। এদের শতকরা ৯৫ ভাগই একাকী, নিঃসঙ্গ জীবন কাটায়; অবশিষ্ট প্রজাতিগুলি সামাজিক, দলবদ্ধ বা কলোনিবদ্ধ হয়ে কাজের দায়দায়িত্ব ভাগবাটোয়ারা করে এক সঙ্গে বাস করে। একটি সুস্থ বড় আকারের কলোনিতে থাকতে পারে ৫০,০০০ থেকে ৬০,০০০ মৌমাছি; তবে আরও বড় চাকে এ সংখ্যা ৮০,০০০ পর্যন্ত হতে পারে। দল বেঁধে বাস করে এমন ভ্রমরদের মধ্যে মৌমাছি এবং বাম্বোল বী (bumblebee) একান্তভাবেই সামাজিক। একটি মৌচাকে থাকে তিন ধরনের মৌমাছি: একটি রানী, কয়েক শত ড্রোন এবং বহু হাজার শ্রমিক। এরা প্রত্যেকেই গঠনগত ও শারীরবৃত্তিক দিক থেকে পৃথক ধরনের। এদের সমাজ জীবনের অতি প্রয়োজনীয় কাজগুলির মধ্যে রয়েছে বাসা বানানো, শাবকদের লালন-পালন ও খাওয়ানো এবং বাসার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ। এ সবগুলি কাজই করে বন্ধ্যা স্ত্রী শ্রমিকেরা। তবে রানীই একমাত্র প্রজননক্ষম স্ত্রী সদস্য, যার প্রধান কাজ ডিম পাড়া। শ্রমিকেরা নানাভাবে কাজের দায়িত্ব ভাগবাটোয়ারা করে নেয়; কেউ সেনা হিসেবে প্রতিরক্ষার দায়িত্বে থাকে, কেউ বাসার বাইরে অথবা ভিতরে কাজ করে, আবার কেউ একান্তভাবেই বাসা তৈরিতে নিয়োজিত থাকে। বাসার দৈনন্দিন কাজকর্মে পুরুষের কোন ভূমিকা নেই। কোন খাদ্য উৎসের সন্ধান পেলে শ্রমিক মৌমাছি ফুলের নির্যাস ও পরাগ নিয়ে বাসায় ফিরে অন্যান্য শ্রমিকদের তা জানিয়ে দেয় বিশেষ ধরনের সংকেতের মাধ্যমে।

ভ্রমর

একাকী বাস করে এমন ভ্রমর (solitary bees) প্রজাতির স্ত্রী সদস্য নিজেই মাটিতে গর্ত করে নিজের বাসা বানায়। এসব ভ্রমরের কোন জাত (caste) নেই। ভ্রমরদের কতক গোত্রের সদস্য পরজীবী। তারা অন্য ভ্রমরদের চাকে ডিম পাড়ে।

খ্রিষ্টজন্মের বহু আগে থেকেই মধু ও মোমের জন্য মৌমাছির কদর। আধুনিককালে মৌমাছি পালন এক লাভজনক ব্যবসা হিসেবে চিহ্নিত। মৌমাছির শ্রমিকদের উৎপাদিত রাজকীয় জেলী (royal jelly) প্রসাধনী সামগ্রী তৈরিতে ব্যবহূত হয়। তবে এর উপকারী ভূমিকা কতুটুকু তা এখনও সন্তোষজনকভাবে প্রমাণিত হয় নি।

আজ থেকে প্রায় পাঁচ কোটি বছর আগের অম্বারে (amber) আটকে পড়া কিছু ভ্রমর প্রজাতির জীবাশ্ম সংগৃহীত হয়েছে। ভ্রমরদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ম্যাসন বী (mason bee) নামে পরিচিত Chalicodoma plito; এটি দৈর্ঘ্যে প্রায় ৩৮ মিমি। এ দলের সবচেয়ে ছোট সদস্য Trigona minima, লম্বায় মাত্র ২ মিমি। মৌমাছিদের মধ্যে সবচেয়ে বড় Giant Honeybee, প্রায় ১৯ মিমি লম্বা, এবং ক্ষুদ্রতম Dwarf bee, দৈর্ঘ্যে ১৩ মিমি।

মৌচাক

বাংলাদেশে ভ্রমরদের যেসব প্রজাতি রয়েছে তার মধ্যে ১৮টির বর্ণনা হয়েছে চট্টগ্রাম এলাকা থেকে। এদেশে মৌমাছির ৪টি প্রজাতি আছে, এর মধ্যে T. fuscobaltiata ক্ষুদ্রতম, লম্বায় মাত্র ৩.৪ মিমি। এসব ক্ষুদ্রাকার মৌমাছি গাছের ফাঁক-ফোঁকরের, শিলা বা দেয়ালের ফাটলে, এমনকি ছোট গাছের পাতায় অথবা ডালেও বাসা তৈরি করে। ফুলের নির্যাস (nectar) বহন করার জন্য মৌমাছির পাকস্থলীতে মধু থলি (honey stomach) নামে একটি আলাদা অংশ থাকে। ভ্রমরদের সব স্ত্রী সদস্যে আত্মরক্ষার জন্য একটি হুল থাকে। এরা অধিকাংশই নানান ফুলমূল ও ফসলের পরাগায়ণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ধারণা করা হয়, প্রায় ৮০% ফসলের পরাগায়ণ হয় বিভিন্ন প্রজাতির ভ্রমরের মাধ্যমে।  [বদরুল আমীন ভূঁইয়া]

বাম্বোল বী (Bee bumble)  ভ্রমরদের মধ্যে বাম্বোল বী সবচেয়ে বড় এবং রঙের বৈচিত্র্যে আকর্ষণীয়। ওড়ার সময় এদের গুঞ্জন-ধ্বনি বৈশিষ্ট্যময়। মৌমাছিদের মতো এদেরও জাতিভেদ রয়েছে, অর্থাৎ এখানেও আছে রানী, পুরুষ এবং শ্রমিক। আর এরাও দায়িত্ব ভাগাভাগি করে নেয়। তবে অনেক সময় কাজের দায়িত্ব বণ্টিত হয় তাদের দেহের মাপ অনুযায়ী।

শীতের মৌসুমে নিষ্ক্রিয় থাকা রানী বসন্তে সক্রিয় হয়ে ইঁদুর জাতীয় ছোট স্তন্যপায়ী বা অন্য কোন প্রাণীর পরিত্যক্ত বাসায় বাসা তৈরি করে ডিম পাড়ে। প্রথম প্রজন্মের সব শাবকই হয় শ্রমিক। পরে এরাই ডিম পাড়া কাজ বাদে অন্য সব কাজের দায়িত্ব পালন করে। পরবর্তীতে নতুন রানী ও পুরুষ বাম্বোল বী-এর জন্ম হয়। নতুন রানী এক পুরুষের সঙ্গে যৌন মিলনের পর পরবর্তী বসন্তের পূর্ব পর্যন্ত শীতনিদ্রায় যায়। তবে যৌন মিলনের পর পুরুষটির মৃত্যু হয়।

বাম্বোল বী ফসলের পরাগায়ণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ইউরোপীয় বাম্বোল বী Bombus terrestries গবেষণাগারে পালন করে টমেটো বাগানে পরাগায়ণের জন্য অবমুক্ত করা হয়। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বাম্বোল বী-এর প্রজাতির মধ্যে উল্লেখযোগ্য B. ignitus, B. hypocrita, B. impatiens, B. occidentalis, B. bimaculatus, B. affinis এবং B. terricola। বাংলাদেশে যে দুটি প্রজাতির কথা জানা গেছে তার একটি সিলেট এলাকার B. eximius এবং অপরটি পার্বত্য চট্টগ্রামের B. montivagus.

একান্তবাসী ভ্রমর (Bee, solitary)  সমাজবদ্ধভাবে বসবাস করে না ভ্রমরদের এমন একদল। একান্তবাসী ভ্রমরদের স্ত্রী নিজের বাসা নিজেই তৈরি করে। সেখানে ডিম পাড়ে এবং ডিম পাড়ার আগে বাসায় শাবকদের জন্য খাদ্যবস্ত্তর জোগান রাখে। সাধারণত ডিম পাড়ার পর মা ঐ বাসার প্রবেশ পথ রুদ্ধ করে দেয় এবং নতুন আরেকটি বাসা বানায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ডিম ফোটার পূর্বেই মায়ের মৃত্যু হয়। ফলে সন্তানদের সাথে মায়ের তেমন সংস্পর্শ ঘটে না। তবে অনেক প্রজাতিতে এর ব্যতিক্রম হয়। একান্তবাসী ভ্রমরদের বেশির ভাগ প্রজাতি বছরে মাত্র একবারই ডিম পাড়ে। কতকের দুটি প্রজন্ম হয় বছরে। এসব ভ্রমর মাটিতে, ফাঁপা গাছে, গাছের ফোঁকড়ে, নরম কাঠ অথবা বাঁশের মধ্যে, নল খাগড়া এবং এ ধরনের গাছপালায় বাসা বাঁধে। তবে বাসা তৈরির ধরন ও উপকরণে সীমাহীন বৈচিত্র্য রয়েছে। আজ পর্যন্ত জানা প্রায় ২০,০০০ প্রজাতির ভ্রমরের মধ্যে অধিকাংশই একান্তবাসী এবং গ্রীষ্মমন্ডল ও নাতিশীতোষ্ণমন্ডলের অধিবাসী। বাংলাদেশে যেসব প্রজাতি রয়েছে তাদের বেশির ভাগ Xylocopa, Megachile, Nomada, Nomia, Andrena, Pithitis, Sphecodes, Lasioglossum, Ceratina এবং Halictus-গণের সদস্য। সব প্রজাতিই অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং ফসলের পরাগযোগে ভূমিকা রাখে।  [মো. আবদুল হান্নান]

আরও দেখুন মৌমাছি; মৌমাছি পালন